চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে একটি উচ্চবিদ্যালয় ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে। প্রায় দুই হাজার শিক্ষার্থীর এই প্রতিষ্ঠানের প্রায় সব বৈদ্যুতিক কার্যক্রম—ফ্যান, বাতি, কম্পিউটার এমনকি একটি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষ পর্যন্ত—চলছে সৌরশক্তির মাধ্যমে। জোরারগঞ্জ বাজার এলাকার এই বিদ্যালয়টি প্রমাণ করেছে, সীমিত বিনিয়োগেও দীর্ঘমেয়াদে বড় সাশ্রয় সম্ভব।
মিরসরাই উপজেলা সদর থেকে প্রায় দশ কিলোমিটার দূরে মুহুরী প্রজেক্ট সড়কের ধারে বিদ্যালয়টির অবস্থান। প্রশস্ত মাঠ ঘিরে গড়ে ওঠা তিনটি ভবনের মধ্যে দুটির ছাদজুড়ে বসানো হয়েছে সৌর প্যানেলের সারি। বারো কিলোওয়াট সক্ষমতার এই ব্যবস্থা দিয়ে চলে শতাধিক ফ্যান, প্রায় একশ বিশটি বাতি এবং প্রয়োজনীয় সব কম্পিউটার।
তিন বছর আগে সৌর প্যানেল বসানোর পর থেকে বিদ্যালয়টির বিদ্যুৎ খরচে বড় পরিবর্তন এসেছে। আগে যেখানে মাসে গড়ে ত্রিশ হাজার টাকার কাছাকাছি বিল আসত, এখন তা নেমে এসেছে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকায়। শুধু খরচ কমাই নয়, ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের যে ভোগান্তি আগে ছিল, তা থেকেও অনেকটাই মুক্তি পেয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি।
বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ও বর্তমান প্রধান শিক্ষক জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ বিলের চাপ কমানোর তাগিদ থেকেই তিন বছর আগে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিদ্যালয়ের নিজস্ব তহবিল থেকে চব্বিশ লাখ টাকা ব্যয়ে ঢাকাভিত্তিক একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই ব্যবস্থা বসানো হয়েছিল। তাঁর ভাষ্যে, সৌরবিদ্যুৎ না থাকলে বর্তমান ব্যবহারের হিসাবে মাসে পঞ্চাশ থেকে ষাট হাজার টাকা বিল গুনতে হতো তাঁদের।
বিদ্যালয়টির যাত্রা শুরু হয়েছিল আরও অনেক আগে। ১৯৮৮ সালে জোরারগঞ্জ বাজারের কাছে পারিবারিক এক একর জমিতে ছোট পরিসরে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়। এলাকাবাসী ও অভিভাবকদের চাহিদার প্রেক্ষিতে ১৯৯২ সালে সেটি পূর্ণাঙ্গ উচ্চবিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়। প্রায় চার দশকের পথচলায় প্রতিষ্ঠানটি এখন দুই হাজার শিক্ষার্থী, আটান্ন জন শিক্ষক ও দশজন কর্মচারী নিয়ে পরিচালিত একটি পরিপূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। প্রায় পঁয়তাল্লিশটি কক্ষে এখন নিয়মিত বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হয়, যার সিংহভাগই সৌরশক্তিনির্ভর।
তবে সৌরবিদ্যুৎ পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য নয় বলে স্বীকার করেছেন বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। কম্পিউটার ল্যাবে একসঙ্গে অনেক শিক্ষার্থী উপস্থিত হলে সৌরশক্তির জোগান পর্যাপ্ত না-ও হতে পারে। এ ছাড়া মেঘলা আবহাওয়া কিংবা বর্ষা ও শীতকালে সূর্যালোকের ঘাটতির সময় পল্লী বিদ্যুতের সংযোগের ওপর নির্ভর করতে হয়। এসব সময়ে বাড়তি খরচ হলেও তা সামগ্রিক হিসাবে এখনো অনেকটাই কম বলে জানাচ্ছেন শিক্ষকেরা।
বিদ্যালয়ের এক সহকারী শিক্ষক জানান, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের ফলে গরমের দিনেও ক্লাস পরিচালনায় সমস্যা হয় না, আর শিক্ষার্থীরাও স্বস্তির পরিবেশে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারছে। এর সুফলও মিলেছে হাতেনাতে—চলতি বছরের মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফলে উপজেলার মধ্যে সেরা ফল অর্জন করেছে এই প্রতিষ্ঠান।
স্থানীয় প্রশাসনও এই উদ্যোগকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছে। উপজেলা প্রশাসনের এক কর্মকর্তা মন্তব্য করেছেন, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা একদিকে যেমন সাশ্রয়ী, অন্যদিকে তেমনি নির্ভরযোগ্যও। সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে বিভিন্ন প্রণোদনা দিয়ে যাচ্ছে, আর এই বিদ্যালয় পুরো প্রতিষ্ঠানকে সৌরশক্তির আওতায় এনে একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে জ্বালানি সংকট দীর্ঘদিনের একটি চ্যালেঞ্জ। বিশেষত গ্রামীণ ও মফস্বল এলাকার বিদ্যালয়গুলোতে ঘন ঘন লোডশেডিং পাঠদানে ব্যাঘাত ঘটায়। এই প্রেক্ষাপটে জোরারগঞ্জ বৌদ্ধ উচ্চবিদ্যালয়ের অভিজ্ঞতা অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য একটি বাস্তবসম্মত মডেল হয়ে উঠতে পারে। প্রাথমিক বিনিয়োগ কিছুটা বেশি হলেও তিন থেকে চার বছরের মধ্যেই তা পুষিয়ে ওঠার সম্ভাবনা থাকে, যা দীর্ঘমেয়াদে প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

