দেশে যখন বিদ্যুৎ সংকট ও লোডশেডিং নিয়ে ভোগান্তি বাড়ছিল, ঠিক সেই সময়ে নবায়নযোগ্য ও অন্যান্য জ্বালানিভিত্তিক ৩৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্র বাতিল হয়ে যায়। এসব কেন্দ্রের একটি বড় অংশ ছিল সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প, যেগুলো ২০২৫ ও ২০২৬ সালের মধ্যে উৎপাদনে আসার সম্ভাবনা ছিল। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব প্রকল্পের কিছু অংশ সময়মতো চালু হলে দিনের বেলায় বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় সহায়ক হতে পারত।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, দায়মুক্তি আইনের আওতায় অনুমোদিত এসব প্রকল্প পর্যালোচনার পর বাতিল করা হয়। বাতিল হওয়া প্রকল্পগুলোর সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা ছিল ৩ হাজার ২৮৭ মেগাওয়াট। এর মধ্যে অধিকাংশ প্রকল্পই ছিল সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র, পাশাপাশি কিছু গ্যাসভিত্তিক, বায়ু ও বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পও ছিল।
নথি অনুযায়ী, এসব প্রকল্পের অনেকগুলোতে জমি অধিগ্রহণ, প্রাথমিক অবকাঠামো প্রস্তুতি এবং বিভিন্ন ধরনের বিনিয়োগ কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। অন্তত ১৫টি কোম্পানি জমি কেনা, সরকারি কর ও ফি প্রদানসহ বিভিন্ন প্রস্তুতিমূলক কাজে অর্থ ব্যয় করেছিল।
বাতিল হওয়া প্রকল্পগুলোর বড় অংশ ছিল সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র। এর মধ্যে রহিমআফরোজ ও চীনের শানফেং লিমিটেডের যৌথ উদ্যোগে পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে ২০ মেগাওয়াট সৌর পার্ক, প্যারামাউন্ট গ্রুপের মৌলভীবাজারে ১০ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র, পদ্মা সোলারের পঞ্চগড়ে ৫০ মেগাওয়াট সৌর পার্ক এবং সোনাগাজীতে ৫০ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র উল্লেখযোগ্য।
এ ছাড়া খুলনার তেরখাদা, চুয়াডাঙ্গা, জামালপুরের মাদারগঞ্জ, পাবনার ঈশ্বরদী, ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা, নীলফামারীর ডিমলা, কক্সবাজার, বান্দরবানের লামা, ফেনীর সোনাগাজীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বড় আকারের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল হয়েছে।
এসব প্রকল্পের অনেকগুলো ২০২৫ সালের শেষ থেকে ২০২৭ সালের মধ্যে উৎপাদনে আসার পরিকল্পনা ছিল। ফলে নির্ধারিত সময়ে এগুলো চালু হলে জাতীয় গ্রিডে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের সরবরাহ বাড়তে পারত।
সম্প্রতি জ্বালানি সংকটের কারণে দেশে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি কঠিন হয়ে পড়ে। বিভিন্ন সময়ে দুই থেকে তিন হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হয়েছে।
সংকটের সময় জাতীয় গ্রিডে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ সরবরাহ ছিল ৬৫০ মেগাওয়াট। সংশ্লিষ্টদের মতে, বাতিল হওয়া প্রকল্পগুলোর একটি অংশও যদি সময়মতো উৎপাদনে আসত, তাহলে দিনের সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি কিছুটা স্বস্তিদায়ক হতে পারত।
সূত্র অনুযায়ী, দায়িত্ব গ্রহণের এক মাসের মধ্যে দায়মুক্তি আইনের আওতায় অনুমোদিত প্রকল্পগুলো পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তৎকালীন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এসব প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
বাতিল হওয়া প্রকল্পগুলোর পরিবর্তে নতুন করে ৫৫টি গ্রিড সংযুক্ত সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়। এসব প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ৫ হাজার ২৩৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।
তবে নতুন দরপত্রে প্রত্যাশিত সাড়া পাওয়া যায়নি। তথ্য অনুযায়ী, মাত্র ১১টি প্রকল্পের জন্য দরপত্র জমা পড়ে, যেগুলোর সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৯০০ মেগাওয়াট।
খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন প্রকল্পগুলোতে সরকারি নিশ্চয়তা না থাকায় অনেক বিনিয়োগকারী আগ্রহ দেখাননি। আন্তর্জাতিক অর্থায়নের ক্ষেত্রে এ ধরনের নিশ্চয়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে তারা মনে করেন।
২০০৯-১০ সালে দেশে তীব্র বিদ্যুৎ সংকট ও ব্যাপক লোডশেডিংয়ের সময় দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে ২০১০ সালে ‘দ্রুত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০’ প্রণয়ন করা হয়।
এই আইনের মাধ্যমে সরকার প্রচলিত ক্রয় প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে বিশেষ পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রকল্প অনুমোদনের সুযোগ পায়। পাশাপাশি আইনের একটি ধারায় এসব সিদ্ধান্ত আদালতে চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ সীমিত করা হয়েছিল। এ কারণেই এটি পরবর্তীতে দায়মুক্তি আইন নামে পরিচিতি পায়।
এই আইনের আওতায় কুইক রেন্টাল ও রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র, জ্বালানি আমদানি এবং বিভিন্ন বিদ্যুৎ অবকাঠামো প্রকল্প অনুমোদন করা হয়েছিল। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, এসব উদ্যোগের মাধ্যমে দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব হয়েছে।
তবে শুরু থেকেই আইনটি নিয়ে বিতর্ক ছিল। সমালোচকদের অভিযোগ ছিল, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়া প্রকল্প অনুমোদনের কারণে অনেক ক্ষেত্রে ব্যয় বেড়েছে এবং জবাবদিহি কমেছে। এছাড়া উৎপাদন না করেও কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্রকে বিপুল পরিমাণ সক্ষমতা বাবদ অর্থ দেওয়ার বিষয় নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ১৪ নভেম্বর হাইকোর্ট আইনের দুটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা ৬(২) ও ৯ অসাংবিধানিক ঘোষণা করে। এরপর ২৮ নভেম্বর অধ্যাদেশ জারি করে আইনটি বাতিল করা হয়। তবে এর আগে সম্পাদিত চুক্তিগুলো কার্যকর থাকবে বলে জানানো হয়।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) বাতিল হওয়া নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক প্রকল্পগুলো পুনর্মূল্যায়নের সুপারিশ করেছে। সংস্থাটির মতে, এসব প্রকল্পে প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের সম্ভাবনা ছিল।
সিপিডি মনে করে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে কার্যকর নীতি ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শামসুল আলম বলেন, দায়মুক্তি আইনের আওতায় এসব প্রকল্প অনুমোদন পেলেও আইন বাতিলের পর সেগুলো বন্ধ হয়ে যায়। তার মতে, প্রকল্পগুলোর ব্যয় ও চুক্তির বিষয়গুলো পুনরায় আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের সুযোগ ছিল।
তিনি বলেন, যেসব প্রতিষ্ঠান জমি কেনা ও অন্যান্য প্রস্তুতিমূলক কাজে অর্থ ব্যয় করেছে, তারা ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারে।
অন্যদিকে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের আইপিপি সেলের প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুল হক জানান, যেসব কেন্দ্রের সঙ্গে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চুক্তি হয়নি, সেগুলো স্বাভাবিকভাবেই উৎপাদনে যেতে পারবে না। তবে কিছু প্রকল্পের জন্য নতুন করে উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে এবং কিছু প্রস্তাবও জমা পড়েছে।
বিদ্যুৎ খাতে বর্তমান পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, বিনিয়োগকারীদের আস্থা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ—সবকিছু সমন্বয় করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

