দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থান ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের লক্ষ্যে চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে দেশের পঞ্চাশটি বিশ্ববিদ্যালয়ে তৃতীয় ভাষা শিক্ষা চালু করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের একজন সদস্য। সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে তিনি জানান।
আজ শনিবার রাজধানীর একটি কনভেনশন সেন্টারে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও চীনের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউটের উন্মোচন অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ইউজিসির ওই সদস্য এ কথা বলেন। তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্ব ক্রমেই আন্তঃসংযুক্ত হয়ে উঠছে, এবং এমন পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত একটি ভাষার জ্ঞান শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ও পেশাগত সুযোগ সম্প্রসারণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক যোগাযোগেও সক্ষম করে তুলতে পারে।
তিনি জানান, চলতি বছরের নির্বাচনী ইশতেহারে চীনা, জাপানি, জার্মান, কোরীয় ও আরবিসহ তৃতীয় ভাষা শিক্ষার সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল, যার মূল লক্ষ্য শিক্ষার্থীদের শিক্ষাগত ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে তৃতীয় ভাষা শেখার সুযোগ তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে ইউজিসি।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তৃতীয় ভাষা কেন্দ্র স্থাপনের বিষয়ে তিনি জানান, দেশের প্রতিটি বিভাগীয় অঞ্চলের বিশ্ববিদ্যালয়কে অন্তর্ভুক্ত করে এসব কেন্দ্র গড়ে তোলা হবে, এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এই কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউটের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এই উদ্যোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে কাজ করবে। ভাষা শিক্ষা কার্যক্রম বাস্তবায়নে বিদেশি ও স্থানীয় ভাষা বিশেষজ্ঞ এবং শিক্ষণ উপকরণের প্রয়োজন হবে জানিয়ে তিনি বলেন, এ জন্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর দূতাবাসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবে ইউজিসি, বিশেষ করে চীনা ভাষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হওয়ায় চীনা দূতাবাসের সহযোগিতা এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
তিনি আরও জানান, তৃতীয় ভাষা শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা শিক্ষার্থী বিনিময়, বৃত্তি, যৌথ একাডেমিক কর্মসূচি, গবেষণা ফেলোশিপ, সামার স্কুল এবং শিক্ষক-গবেষক বিনিময়ের মতো নানা সুযোগ পেতে পারেন। বাংলাদেশকে উচ্চশিক্ষার আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যৌথ ও দ্বৈত ডিগ্রির সুযোগ তৈরির বিষয়েও কাজ করছে ইউজিসি, এবং চীনা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে এমন সহযোগিতা দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আন্তর্জাতিকীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কর্মসংস্থানের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বাণিজ্য, উৎপাদন, অবকাঠামো, প্রযুক্তি, লজিস্টিকস, প্রকৌশল ও তথ্যপ্রযুক্তিসহ বিভিন্ন খাতে বিস্তৃত, এবং নিজ নিজ বিষয়ের জ্ঞানের পাশাপাশি ভাষা ও আন্তঃসাংস্কৃতিক দক্ষতা থাকা স্নাতকদের জন্য আন্তর্জাতিক কর্মক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তাই তৃতীয় ভাষা শিক্ষাকে কর্মসংস্থানযোগ্যতা বৃদ্ধির একটি বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
গবেষণা সহযোগিতা প্রসঙ্গে তিনি জানান, বাংলাদেশ ও চীনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে সহযোগিতা শুধু ভাষা ও সংস্কৃতিতে সীমাবদ্ধ না থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উদীয়মান প্রযুক্তি, কৃষি, জলবায়ু, প্রকৌশল ও জনস্বাস্থ্যের মতো ক্ষেত্রেও বিস্তৃত হতে পারে, এবং কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট এসব একাডেমিক সম্পর্ক জোরদার করার একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠতে পারে।
মেধা পাচার থেকে মেধার আন্তর্জাতিক প্রবাহের দিকে এগিয়ে যাওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি শিক্ষাবিদ, গবেষক ও পেশাজীবীদের দেশের শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রমে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি করতে হবে। ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, যৌথ তত্ত্বাবধান এবং একাডেমিক বিনিময়ের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক জ্ঞান নেটওয়ার্ককে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।
বাংলাদেশ ও চীনের জনগণের মধ্যে যোগাযোগে ভাষার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, একটি ভাষা অন্য একটি সমাজকে বোঝার প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করে। কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা চীনা ভাষা, ইতিহাস, সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানার সুযোগ পাবেন, আর একই সঙ্গে চীনা শিক্ষার্থী ও শিক্ষাবিদরাও বাংলাদেশের ভাষা, সংস্কৃতি ও সমাজ সম্পর্কে জানতে পারবেন।
তিনি মন্তব্য করেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এই কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট শুধু ভাষা শিক্ষার কেন্দ্র না থেকে শিক্ষার্থী-শিক্ষক বিনিময়, গবেষণা সহযোগিতা, বৃত্তি এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের একটি বৃহত্তর প্ল্যাটফর্মে পরিণত হতে পারে, এবং বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য চীনা ভাষা শেখার সুযোগ সহজলভ্য করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। তার ভাষায়, এই ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ভাষার সঙ্গে শিক্ষা, শিক্ষার সঙ্গে গবেষণা এবং দক্ষতার সঙ্গে আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থানের সুযোগকে যুক্ত করার একটি নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চীনের ইউনান প্রাদেশিক কমিটির একজন শীর্ষ কর্মকর্তা। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, চীনের সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা এবং বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালকসহ শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

