বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্ত ছয় লাখের বেশি শিক্ষক-কর্মচারীর নতুন বেতন কাঠামো কার্যকরের নির্দিষ্ট সময় এখনো ঠিক করতে পারেনি সরকার। সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন শুরু হলেও এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের ক্ষেত্রে কবে থেকে তা কার্যকর হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি। তবে চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন কাঠামো অনুযায়ী বেতন-ভাতা দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।
সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো গত ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে কার্যকরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চলতি মাসে সংশোধিত বেতন ও বকেয়া পাওনা দেওয়ার কথা রয়েছে। অন্যদিকে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামোর আওতায় আনতে অতিরিক্ত ১৩ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, নতুন বেতন কাঠামোর আওতায় আসবেন ৬ লাখ ২ হাজার ৩৫৯ জন এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারী। তাঁদের বেতন ও ভাতা বাবদ প্রয়োজন হবে ১২ হাজার ৫১৮ কোটি টাকা। বাকি অর্থ ব্যয় হবে পেনশন-সংক্রান্ত সহায়তায়।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নিউ এজকে জানিয়েছেন, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামোর সুবিধা ডিসেম্বরের মধ্যে দেওয়ার লক্ষ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ চলছে। তবে কবে আনুষ্ঠানিক আদেশ জারি হবে, তা নিশ্চিত করে বলতে পারেননি তিনি।
ওই কর্মকর্তা জানান, ২০১৫ সালে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের সংশোধিত বেতন কাঠামোর আওতায় আনতে প্রায় ছয় মাস সময় লেগেছিল। এবারও এ প্রক্রিয়ার জন্য প্রশাসনিক ও আর্থিক প্রস্তুতি প্রয়োজন।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক খান মঈনউদ্দীন আল মাহমুদ সোহেল শুক্রবার নিউ এজকে বলেন, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা যাতে যত দ্রুত সম্ভব নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী বেতন-ভাতা পান, সে বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণার পর শিক্ষামন্ত্রী এ এন এম এহছানুল হক মিলন জানিয়েছিলেন, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরাও এর সুবিধা পাবেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাঁদের বেতন সমন্বয়ের জন্য আলাদা একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে। ২০১৫ সালে অষ্টম জাতীয় বেতন কাঠামো কার্যকরের সময়ও পৃথক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এমপিওভুক্তদের নতুন কাঠামোর আওতায় আনা হয়েছিল।
নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী, সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডে মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা হবে। সর্বোচ্চ প্রথম গ্রেডে মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়াবে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা।
এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য আলাদা কোনো বেতন কাঠামো করা হবে না। তাঁদের বর্তমান গ্রেড অনুযায়ী সংশোধিত মূল বেতন নির্ধারণ করা হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া গ্রেডভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী, চতুর্থ গ্রেডের ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষের মূল বেতন ৫০ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ টাকা হবে। ষষ্ঠ গ্রেডের সহকারী অধ্যাপকের বেতন ৩৫ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বেড়ে ৭১ হাজার টাকা হবে।
নবম গ্রেডের কলেজ প্রভাষকদের মূল বেতন ২২ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৪৪ হাজার টাকা হবে। মাধ্যমিক পর্যায়ে দশম গ্রেডের সহকারী শিক্ষক এবং বিএড ডিগ্রিধারী সহকারী শিক্ষকদের বেতন ১৬ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৩২ হাজার টাকা হবে। বিএডবিহীন একাদশ গ্রেডের সহকারী শিক্ষকদের মূল বেতন ১২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বেড়ে ২৫ হাজার টাকা হবে। আর ২০তম গ্রেডের অফিস সহায়কসহ চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা হবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ৩০ হাজার ৯৩২টি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক রয়েছেন ৪ লাখ ৪৪ হাজার ৬২৮ জন এবং কর্মচারী ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭৩১ জন।
এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ সরকার বছরে ১৯ হাজার ২২৭ কোটি টাকা ব্যয় করে। এর মধ্যে মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজের জন্য ১২ হাজার ৯৩০ কোটি টাকা, মাদ্রাসার জন্য ৫ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা এবং কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য ৭৬৭ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে।
এমপিও ব্যবস্থায় যোগ্য বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের মূল বেতনের শতভাগ সরকার অনুদান হিসেবে দেয়। পাশাপাশি চিকিৎসা ও অন্যান্য ভাতাও দেওয়া হয়।
নবম জাতীয় বেতন কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী নন বলে তাঁরা কমিশনের সরাসরি আওতাভুক্ত ছিলেন না। তবে বেসরকারি শিক্ষা খাতের ব্যাপকতা বিবেচনায় তাঁদের বেতন কাঠামোর বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করার সুপারিশ করেছে কমিশন।
কমিশনের মতে, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য নিয়মিত বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়। তাই আন্তমন্ত্রণালয় আলোচনার মাধ্যমে তাঁদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করা উচিত।
গত ৩১ আগস্ট মন্ত্রিসভা নবম জাতীয় বেতন কাঠামো-২০২৬ অনুমোদন করে। এটি ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সরকারি কর্মচারীদের জন্য সংশোধিত মূল বেতন ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০২৭ সালের মধ্যে তিন ধাপে কার্যকরের পরিকল্পনা রয়েছে। আর নতুন কাঠামো অনুযায়ী ভাতা কার্যকর হওয়ার কথা ২০২৮ সালের জানুয়ারি থেকে।
তবে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের ক্ষেত্রে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকরের নির্দিষ্ট সময়সূচি এখনো ঘোষণা করা হয়নি। ফলে বেতন বৃদ্ধির অপেক্ষায় রয়েছেন দেশের ছয় লাখের বেশি শিক্ষক-কর্মচারী।

