২০২৭ শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন পাঠ্যবই তুলে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। তবে এখনো পরিকল্পিত বইয়ের এক-তৃতীয়াংশের বেশি ছাপার জন্য কোনো মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানের কাছে বরাদ্দ দেওয়া হয়নি।
এনসিটিবির ২৪ সেপ্টেম্বরের মনিটরিং প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোট ৬৭২টি লটের মধ্যে ৩৪৬টি লটের জন্য এখনো কোনো মুদ্রণকারী প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করা হয়নি। এসব লটে রয়েছে প্রায় ১০ কোটি ৪৪ লাখ বই, যা আগামী শিক্ষাবর্ষের মোট পরিকল্পিত ৩০ কোটি ২৯ লাখ বইয়ের এক-তৃতীয়াংশের বেশি।
এনসিটিবির নতুন চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা জানিয়েছেন, নতুন বছরের শুরুতেই শিক্ষার্থীরা বই পাবে। তিনি বলেন, এ বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে কাজ চলছে এবং অধিকাংশ কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।
চলতি বছরের পাঠ্যবই মুদ্রণের পাশাপাশি নতুন শিক্ষাবর্ষে বেশ কিছু বড় পরিবর্তন আনা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণির নতুন বই, ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ এবং রাজনৈতিক ঘটনাবলির বিষয়বস্তু সংশোধন।
এখন পর্যন্ত ৩২৬টি লট মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানের কাছে দেওয়া হয়েছে। এসব কাজ করছে ১৭২টি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান। তবে বাকি ৩৪৬টি লটের বইয়ের জন্য এখনো মুদ্রণকারী নির্ধারণ হয়নি।
বাকি থাকা লটগুলোর মধ্যে অষ্টম ও নবম-দশম শ্রেণির সাধারণ, মাদ্রাসা, কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষার বই রয়েছে। এছাড়া চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণির ১১টি ছোট লটও এখনো বরাদ্দ হয়নি।
এনসিটিবির তথ্য অনুযায়ী, বরাদ্দ দেওয়া বইয়ের মধ্যে এখন পর্যন্ত ১৯ দশমিক ০৩ শতাংশ মুদ্রণের ফরমা সম্পন্ন হয়েছে। প্রায় ৫ কোটি ৩১ লাখ বই বাঁধাই শেষ হয়েছে এবং ২ কোটি ২৭ লাখ বই সরবরাহের আগে পরিদর্শন সম্পন্ন হয়েছে।
এখন পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের জন্য ১ কোটি ৯৯ লাখ বই সরবরাহ করা হয়েছে, যা মোট লক্ষ্যমাত্রার ৬ দশমিক ৫৭ শতাংশ।
আগামী শিক্ষাবর্ষে প্রাক-প্রাথমিক থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় ৩১ কোটি পাঠ্যবই দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিক্ষার্থী ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ বইও রয়েছে।
মাধ্যমিক পর্যায়ের জন্য ২২ কোটির বেশি এবং প্রাথমিক পর্যায়ের জন্য প্রায় ৮ কোটি ২০ লাখ বই প্রস্তুত করা হবে। এসব বই মুদ্রণে আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা।
নতুন শিক্ষাবর্ষে কিছু নতুন বিষয়ও যুক্ত হচ্ছে। চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য খেলাধুলা ও বাংলাদেশের সংস্কৃতিবিষয়ক দুটি নতুন বই যুক্ত করা হচ্ছে।
খেলাধুলার বইয়ে ফুটবল, ক্রিকেট, কাবাডি, সাঁতার ও মার্শাল আর্টসহ আটটি খেলা সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হবে।
ষষ্ঠ শ্রেণিতে যুক্ত হচ্ছে ‘আনন্দের সঙ্গে শেখা’ এবং কারিগরি শিক্ষাবিষয়ক নতুন বই। এসব বিষয়ের জন্য আলাদা বার্ষিক পরীক্ষা থাকবে না; ধারাবাহিক মূল্যায়নের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করা হবে।
বাংলা এবং বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ের বিষয়বস্তুতেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে। ষষ্ঠ শ্রেণির বাংলা বইয়ে অতিরিক্ত ভাষা শেখার গুরুত্ব নিয়ে ‘তৃতীয় ভাষা’ নামে নতুন অধ্যায় যুক্ত হবে।
একই শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ে সাত বীরশ্রেষ্ঠের জীবনী যুক্ত করা হবে। অষ্টম শ্রেণির বাংলা বইয়ে মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন ব্রিগেড বাহিনী সম্পর্কে তথ্য যুক্ত হবে।
অষ্টম ও নবম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ে ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানে বেগম খালেদা জিয়ার ভূমিকা সংক্রান্ত বিষয় যুক্ত করা হচ্ছে।
এ ছাড়া ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনাবলি যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নবম-দশম শ্রেণির বাংলা বইয়ে জিয়াউর রহমানের ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতিচারণ’ অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
শিক্ষাবিদরা বলছেন, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের বিষয় পাঠ্যবইয়ে থাকা প্রয়োজন, তবে তা অবশ্যই তথ্যনির্ভর ও নির্ভুলভাবে উপস্থাপন করতে হবে।
শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, ১৯৫২, ১৯৬৯, ১৯৭১ বা ২০২৪ সালের মতো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে, তবে সেগুলো সঠিকভাবে উপস্থাপন করতে হবে।
তিনি বলেন, ইতিহাসকে কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শ চাপিয়ে দেওয়ার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এস এম হাফিজুর রহমান বলেন, বর্তমান শিক্ষাক্রম পুরোপুরি বাতিল করা হচ্ছে না; বরং এটিকে আরও কার্যকর ও বাস্তবভিত্তিক করার চেষ্টা চলছে।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের বোঝার সুবিধা এবং তথ্যের যথার্থতার দিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমেদ বলেন, শুধু পাঠ্যবই পরিবর্তন করলেই শিক্ষার মান উন্নত হবে না। শ্রেণিকক্ষে এর কার্যকর প্রয়োগ এবং শিক্ষকদের প্রস্তুতিও গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, অনেক সময় শিক্ষার্থীরা পাঠ্যবইয়ের বিষয় মুখস্থ করে, কিন্তু শেখার প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে যুক্ত হয় না। তাই ঘন ঘন পরিবর্তনের পাশাপাশি বাস্তবায়নের বিষয়টিও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
নতুন শিক্ষাবর্ষে পাঠ্যবই সময়মতো পৌঁছে দেওয়াই এখন এনসিটিবির বড় চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে নতুন বিষয়বস্তু কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

