কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের এই যুগে প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা অত্যন্ত অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। জনকল্যাণে নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ করার পাশাপাশি এর অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার যেন মানুষের মেধা ও সৃজনশীলতাকে স্থবির করে না দেয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে বঙ্গভবন থেকে।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬) বঙ্গভবনে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মাছুদের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে গেলে এই অভিমত ব্যক্ত করা হয়। সাক্ষাৎকালে দেশের সার্বিক প্রযুক্তিগত গবেষণা এবং উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সুফল সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের মূল হাতিয়ারগুলোকে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয় এই আলোচনায়।
বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ন্যানোটেকনোলজি, বায়োটেকনোলজি এবং সেমিকন্ডাক্টর খাতের মতো বিকাশমান ক্ষেত্রে মৌলিক গবেষণা ও নতুন উদ্ভাবনে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করার আহ্বান জানানো হয়। বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হলে দেশীয় গবেষণার পরিধি বাড়ানো ছাড়া কোনো বিকল্প নেই বলে বৈঠকে উল্লেখ করা হয়।
প্রযুক্তির যথেচ্ছ ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার মানুষের স্বাভাবিক চিন্তাশক্তি ও সৃজনশীল প্রতিভাকে সংকুচিত করে তুলতে পারে বলে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। রাষ্ট্রপতির বক্তব্যে উঠে আসে যে, এআই প্রযুক্তি যেন কোনোভাবেই মানুষের স্বাধীন চিন্তাধারাকে প্রতিস্থাপিত না করে, বরং মানুষের কর্মক্ষমতা বাড়ানোর একটি সহায়ক মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা দীর্ঘমেয়াদে তরুণ প্রজন্মের বিশ্লেষণাত্মক ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে। তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গবেষণা সংস্থাগুলোতে এআইয়ের দায়িত্বশীল ও পরিমিত ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য নীতিগত কড়াকড়ি ও সচেতনতার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়।
বৈঠকে দেশের উচ্চশিক্ষার ভৌগোলিক বৈষম্য দূর করার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়। মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থাকে কেবল ঢাকাকেন্দ্রিক সীমানায় আবদ্ধ না রেখে তা সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো আঞ্চলিক শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে জাতীয় পর্যায়ের গবেষণা ও উন্নয়ন (আর অ্যান্ড ডি) কার্যক্রমে আরও সক্রিয়ভাবে যুক্ত হতে পারে, তার ওপর আলোকপাত করা হয়। শিল্প খাতের সাথে একাডেমিক গবেষণার মেলবন্ধন ঘটিয়ে আঞ্চলিক কেন্দ্রগুলো থেকেই জাতীয় সমস্যার প্রযুক্তিভিত্তিক সমাধান বের করার ওপর তাগিদ দেওয়া হয়।
সাক্ষাৎকালে কুয়েট উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মাছুদ বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক একাডেমিক অবকাঠামো, চলমান গবেষণা প্রকল্প এবং ভবিষ্যৎ শিক্ষা কার্যক্রম সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে অবহিত করেন।
একই সঙ্গে কুয়েটের আসন্ন সমাবর্তন অনুষ্ঠানে আচার্য বা চ্যান্সেলর হিসেবে উপস্থিত থাকার জন্য রাষ্ট্রপতিকে আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়। রাষ্ট্রপতি আন্তরিকভাবে এই আমন্ত্রণ গ্রহণ করেন এবং সমাবর্তনে উপস্থিত থেকে তরুণ গ্র্যাজুয়েটদের উৎসাহিত করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বঙ্গভবনে অনুষ্ঠিত এই গুরুত্বপূর্ণ সৌজন্য সাক্ষাৎকালে রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব, সচিব ও প্রেস সচিবসহ খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপকেরা উপস্থিত ছিলেন।
প্রযুক্তিভিত্তিক নতুন বাংলাদেশের রূপরেখা তৈরিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর যে কেন্দ্রীয় ভূমিকা রয়েছে, এই আলোচনা তারই একটি বড় প্রতিফলন। প্রযুক্তিকে মানবকল্যাণে নিবেদিত রেখে এবং মানুষের মৌলিক মেধা ও প্রজ্ঞাকে সুরক্ষিত রেখে কীভাবে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া যায়, বঙ্গভবনের এই আলোচনা থেকে সেই গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনাই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

