শিক্ষা একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। কিন্তু সেই ভিত্তি শক্তিশালী করতে শুধু অর্থ বরাদ্দ বাড়ালেই হয় না, প্রয়োজন সঠিক ব্যবস্থাপনা, দক্ষ নেতৃত্ব, জবাবদিহি এবং কার্যকর নজরদারি। বাংলাদেশে শিক্ষার পরিধি বিস্তৃত হলেও দীর্ঘদিনের সুশাসনের দুর্বলতা এখন এই খাতের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষার মান উন্নয়নের পথে প্রধান বাধাগুলোর একটি হলো প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় দুর্বলতা। শিক্ষক নিয়োগ, প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা, মাঠপর্যায়ের তদারকি, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং জবাবদিহির ঘাটতির কারণে শিক্ষার্থীরা কাঙ্ক্ষিত মানের শিক্ষা থেকে পিছিয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার একটি পরিচালনা করছে। কিন্তু এই বিশাল ব্যবস্থার ভেতরে রয়েছে বড় ধরনের শিক্ষক সংকট। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের ৫২ দশমিক ১৮ শতাংশ পদ এখনো শূন্য। অনুমোদিত ৬৫ হাজার ৪৫৭টি প্রধান শিক্ষক পদের বিপরীতে খালি রয়েছে ৩৪ হাজার ১৫৯টি পদ।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন না, তিনি একটি প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দেন। দীর্ঘদিন ধরে এই পদগুলো খালি থাকায় বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা, শিক্ষক সমন্বয় এবং শিক্ষার পরিবেশে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
শুধু শিক্ষক সংকট নয়, শিক্ষার্থীদের শেখার মান নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। জাতীয় শিক্ষার্থী মূল্যায়ন প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে তৃতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের মধ্যে বাংলায় ৫১ শতাংশ এবং গণিতে ৩৯ শতাংশ শিক্ষার্থী শ্রেণি অনুযায়ী কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা অর্জন করতে পেরেছে।
পঞ্চম শ্রেণীর ক্ষেত্রে বাংলায় এই হার ছিল ৫০ শতাংশ এবং গণিতে মাত্র ৩০ শতাংশ। অর্থাৎ অনেক শিক্ষার্থী প্রাথমিক স্তর শেষ করার পরও মৌলিক ভাষাগত ও গাণিতিক দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এক দশকের বেশি সময়ে প্রাথমিক শিক্ষায় বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও শিক্ষার্থীদের দক্ষতা অর্জনের চিত্র সব ক্ষেত্রে উন্নত হয়নি। ২০১১ সালের জাতীয় শিক্ষার্থী মূল্যায়নের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, তৃতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের বাংলায় দক্ষতা অর্জনের হার ৬৭ শতাংশ থেকে কমে ৫১ শতাংশ হয়েছে। গণিতে এই হার ৫০ শতাংশ থেকে কমে ৩৯ শতাংশে এসেছে।
এতে বোঝা যায়, শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন বা অর্থ ব্যয় নয়, শিক্ষার মূল লক্ষ্য—শিক্ষার্থীর শেখার সক্ষমতা বৃদ্ধি—নিশ্চিত করতে কার্যকর ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।
বাংলাদেশে ২০১০ সাল থেকে প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এটি শিক্ষার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা তৈরি করলেও সময়ের সঙ্গে বই মুদ্রণ ও সরবরাহ প্রক্রিয়া নিয়ে নানা অভিযোগ সামনে এসেছে।
শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের একটি নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ ও সরবরাহ কার্যক্রমে ২ হাজার ৭১১ কোটির বেশি টাকার আর্থিক অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে। প্রতিবেদনে এনসিটিবির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং ৫০টি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি অর্থ ব্যবহারের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
প্রাথমিকের মতো মাধ্যমিক স্তরেও রয়েছে নেতৃত্ব ও তদারকির ঘাটতি। দেশে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৭০২টি। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রধান শিক্ষকের অনুমোদিত পদ রয়েছে ৫৭২টি। এর মধ্যে ৩৭৯টি পদই শূন্য, যা মোট পদের প্রায় ৬৬ শতাংশ।
এছাড়া সহকারী প্রধান শিক্ষকের ৭০৩টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ১৭৫ জন। শূন্য রয়েছে ৫২৮টি পদ, যা মোট পদের প্রায় ৭৫ শতাংশ।
শুধু শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষকের পদ নয়, শিক্ষা তদারকির গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতেও রয়েছে বড় ধরনের শূন্যতা। বিদ্যালয় পরিদর্শক ও সহকারী বিদ্যালয় পরিদর্শকের ১৬টি করে সব পদই খালি রয়েছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের শিক্ষা কর্মকর্তাদের অনেক পদও দীর্ঘদিন ধরে শূন্য।
ফলে মাঠপর্যায়ে শিক্ষার মান পর্যবেক্ষণ, বিদ্যালয়ের সমস্যা চিহ্নিত করা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
ব্যবস্থাপনা ও নজরদারির দুর্বলতার প্রভাব শিক্ষার্থীদের ফলাফলেও দেখা যাচ্ছে। ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় গড় পাসের হার ছিল ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ, যা গত ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
বিশ্বব্যাংকের মানবসম্পদ সূচক অনুযায়ী, বাংলাদেশে একজন শিক্ষার্থী প্রায় ১০ বছর দুই মাস শিক্ষাজীবন শেষ করার পর যে দক্ষতা অর্জন করে, আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী তা প্রায় ছয় বছরের শিক্ষার সমতুল্য।
এটি শিক্ষা ব্যবস্থার গুণগত মান নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করছে।শিক্ষার সমস্যা শুধু প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে সীমাবদ্ধ নয়। উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও প্রশাসনিক দুর্বলতা রয়েছে।
দেশে বর্তমানে ৫৬টি সরকারি ও ১১৭টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। কিন্তু অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদ খালি রয়েছে। বেসরকারি ৩০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য এবং ৮৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ে সহ-উপাচার্যের পদ শূন্য রয়েছে। এছাড়া ৪০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে কোষাধ্যক্ষ নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ নেতৃত্বের পদ খালি থাকলে একাডেমিক পরিকল্পনা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা তৈরি হয়।
উচ্চ শিক্ষার আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো গবেষণার মান ও স্বচ্ছতা। বিভিন্ন সময়ে শিক্ষক নিয়োগ, গবেষণায় অনিয়ম এবং চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ সামনে এসেছে।
এছাড়া সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, অনেক সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হিসাবমান অনুসরণ করে পূর্ণাঙ্গ আর্থিক বিবরণী তৈরি করছে না। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকৃত আর্থিক অবস্থার পূর্ণ চিত্র পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।t
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন শুধু কত টাকা বিনিয়োগ করা হচ্ছে তা নয়, বরং সেই বিনিয়োগ কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
শিক্ষার মান উন্নয়নে প্রয়োজন নিয়মিত শিক্ষক নিয়োগ, প্রতিষ্ঠানপ্রধানের পদ পূরণ, শক্তিশালী তদারকি ব্যবস্থা, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং স্বচ্ছ প্রশাসন। কারণ একটি বিদ্যালয় বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবন নয়, মূল শক্তি হলো দক্ষ শিক্ষক, কার্যকর নেতৃত্ব এবং জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনা।
শিক্ষাবিদদের মতে, নতুন প্রকল্প গ্রহণের পাশাপাশি বিদ্যমান কাঠামোকে কার্যকর করাই এখন সবচেয়ে জরুরি। শিক্ষা ব্যবস্থার প্রকৃত উন্নয়ন তখনই সম্ভব হবে, যখন শিক্ষার্থীরা বাস্তবে ভালোভাবে শিখতে পারবে এবং প্রতিষ্ঠানগুলো স্বচ্ছ ও দক্ষভাবে পরিচালিত হবে।
বাংলাদেশের শিক্ষার ভবিষ্যৎ তাই নির্ভর করছে শুধু অর্থ বরাদ্দের ওপর নয়, বরং সুশাসন প্রতিষ্ঠার ওপর। কারণ একটি জাতির উন্নয়নের ভিত্তি তৈরি হয় শ্রেণিকক্ষে, আর সেই শ্রেণিকক্ষের মান নির্ধারণ করে পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার পরিচালনা পদ্ধতি।

