অস্ট্রেলিয়ার কঠোর অভিবাসন নীতির কারণে সে দেশে উচ্চশিক্ষা নিতে ইচ্ছুক আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার এখন রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য পরিস্থিতি বেশ উদ্বেগজনক হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশটির হোম অ্যাফেয়ার্স বিভাগের সর্বশেষ মূল্যায়নে বাংলাদেশ এখনো সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ টায়ার ৩ ক্যাটাগরিতে অবস্থান করছে। এর ফলে অস্ট্রেলিয়ায় পড়তে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছেন এমন হাজারো বাংলাদেশি শিক্ষার্থী সরাসরি ঝুঁকির মুখে পড়েছেন এবং তাদের ভিসা পাওয়ার হার তলানিতে এসে ঠেকেছে।
হঠাৎ করে ভিসা প্রত্যাখ্যানের এই বিশাল বৃদ্ধির পেছনে মূলত অর্থনৈতিক এবং আর্থিক সক্ষমতার বিষয়গুলো সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে। অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসন মন্ত্রী টনি বার্ক জানিয়েছেন যে তাদের এই কড়াকড়ির মূল উদ্দেশ্য হলো আবেদনকারীদের পর্যাপ্ত আর্থিক সক্ষমতা আছে কি না সেটি নিশ্চিত করা। অনেক সময় শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার নাম করে মূলত কাজের উদ্দেশ্যে সেখানে পাড়ি জমান। তাই সরকার এখন দেখতে চাইছে যে একজন শিক্ষার্থীর টিউশন ফি এবং সেখানে থাকার খরচ মেটানোর মতো প্রকৃত তরল অর্থ বা লিকুইড ফান্ড রয়েছে কি না। আর্থিক কাগজপত্রে স্বচ্ছতা আনা এবং ইংরেজি ভাষার দক্ষতার ওপর জোর দেওয়ার কারণেই মূলত এই কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষা বিষয়ক সাময়িকী টাইমস হায়ার এডুকেশনের একটি বিশ্লেষণে এই ভিসা প্রত্যাখ্যানের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। মূলত ২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ভিসা আবেদনের ফলাফল নিয়ে এই মূল্যায়নটি করা হয়েছে। সাময়িকীটির তথ্য বলছে গত আগস্ট মাসে অস্ট্রেলিয়ার বাইরে থেকে উচ্চশিক্ষার জন্য আবেদন করা বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের মাত্র ২৪ শতাংশের ভিসা অনুমোদন পেয়েছে। সবচেয়ে অবাক করার মতো বিষয় হলো গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বাংলাদেশ থেকে ভিসা আবেদনের হার ৮৩ শতাংশ কমে গেছে এবং ভিসা অনুমোদনের হার কমেছে ৯৩ শতাংশ।
অবশ্য শুধু বাংলাদেশ নয় বরং ভারত নেপাল পাকিস্তান ফিলিপাইন এবং কলম্বিয়ার মতো দেশগুলোও উচ্চ ঝুঁকির এই টায়ার ৩ তালিকায় রয়েছে। প্রধান ১০টি দেশের মধ্যে কেবল চীন সবচেয়ে কম ঝুঁকির টায়ার ১ তালিকায় জায়গা পেয়েছে। অন্যদিকে সরকারের এই কঠোর নীতির কারণে অস্ট্রেলিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও বেশ বড় ধরনের বিপাকে পড়েছে। তারা আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দকৃত কোটা কোনোভাবেই পূরণ করতে পারছে না। এমনকি খোদ প্রতিষ্ঠানগুলোর ঝুঁকি মূল্যায়নেও পরিবর্তন এসেছে যেখানে লেভেল ২ বা দ্বিতীয় স্তরের বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১৩টি থেকে বেড়ে ২২টিতে দাঁড়িয়েছে।
ভিসা প্রত্যাখ্যানের এই অস্বাভাবিক হার নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ভেতরেই সমালোচনা শুরু হয়েছে। দেশটির বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা এই প্রত্যাখ্যানের বিষয়টিকে সম্পূর্ণ অস্বচ্ছ এবং ব্যাখ্যার অতীত বলে মন্তব্য করেছেন। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন টায়ার ৩ ক্যাটাগরিতে থাকার অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের আবেদন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে। বরং এর মানে হলো আবেদনপত্রে আর্থিক সক্ষমতা এবং ইংরেজি ভাষার দক্ষতার পক্ষে অনেক বেশি নিখুঁত ও শক্তিশালী প্রমাণ যুক্ত করতে হবে। তবে এতে কোনো সন্দেহ নেই যে এই নতুন এবং কঠোর নিয়মের কারণে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য অস্ট্রেলিয়ার উচ্চশিক্ষার পথ আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন এবং চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠেছে।

