প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার পর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রবেশ করতে পারছে না। কেউ পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে পড়াশোনা ছেড়ে কাজে যোগ দিচ্ছে, আবার কেউ প্রাথমিক পর্যায়ে দুর্বল শিক্ষার ভিত্তি নিয়ে মাধ্যমিকে গিয়ে নতুন পরিবেশ ও পাঠ্যক্রমের সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পেরে ধীরে ধীরে শিক্ষার মূল ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে দেশের প্রাইমারি-পরবর্তী স্তরে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ১৬ লাখ ৫১ হাজার ৯৪৮ জন। একই সময়ে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রবেশের হারও কমে দাঁড়িয়েছে ৮১ দশমিক ২৯ শতাংশে।
শিক্ষাবিদদের মতে, এই পরিস্থিতির পেছনে শুধু একটি কারণ নয়, বরং দারিদ্র্য, শিশুশ্রম, শিক্ষার বাড়তি ব্যয়, শিক্ষক সংকট, প্রাথমিক শিক্ষার দুর্বল ভিত্তি এবং ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে একটি বড় সংকট তৈরি হয়েছে।
ব্যানবেইসের ‘বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান-২০২৫’ অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দেশের প্রাইমারি-পরবর্তী স্তরে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৩ লাখ ৮৩ হাজার ৬০ জন। ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১ কোটি ৯৬ লাখ ৭৩ হাজার ৫৯১ জনে। এরপর ২০২৫ সালে আরও কমে হয়েছে ১ কোটি ৮৭ লাখ ৩১ হাজার ১১২ জন।
অর্থাৎ মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে এই স্তরে শিক্ষার্থী কমেছে প্রায় ৮ দশমিক ১ শতাংশ।
শুধু মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের হিসাবেও একই ধরনের চিত্র দেখা যাচ্ছে। ২০২৩ সালে মাধ্যমিক স্কুলে শিক্ষার্থী ছিল প্রায় ৯৪ লাখ ৫ হাজার। ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮৬ লাখ ৩৮ হাজারে। অর্থাৎ দুই বছরে মাধ্যমিক পর্যায়েই শিক্ষার্থী কমেছে প্রায় ৭ লাখ ৬৭ হাজার।
প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিকে উত্তরণের হারেও ধারাবাহিক ওঠানামা দেখা যাচ্ছে। ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিকে প্রবেশের হার ছিল ৯৬ দশমিক ৫৩ শতাংশ। ২০২০ সালে তা ছিল ৯৬ দশমিক ২২ শতাংশ।
২০২১ সালে এই হার কমে দাঁড়ায় ৯৩ দশমিক ৫৩ শতাংশে। ২০২২ সালে বড় পতন ঘটে, যখন হার নেমে আসে ৭৪ দশমিক ৯৯ শতাংশে। এরপর ২০২৩ সালে কিছুটা বেড়ে ৮৩ দশমিক ০৮ শতাংশ এবং ২০২৪ সালে ৮৪ দশমিক ২০ শতাংশ হলেও ২০২৫ সালে আবার কমে দাঁড়িয়েছে ৮১ দশমিক ২৯ শতাংশে।
অর্থাৎ ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিকে উত্তরণের হার কমেছে ১৫ দশমিক ২৪ শতাংশীয় পয়েন্ট।
দারিদ্র্য ও শিশুশ্রম বড় কারণ
শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার পেছনে আর্থসামাজিক সংকটকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) একটি গবেষণা।
গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক—উভয় পর্যায়েই শিক্ষার্থী সংখ্যা কমছে। ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা কমেছে ৭ শতাংশ। অন্যদিকে ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে প্রাথমিক শেষ করা শিক্ষার্থীদের তুলনায় মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা ২১ দশমিক ৫ শতাংশ কম ছিল।
গবেষণায় দেখা গেছে, আর্থিক চাপের কারণে অনেক পরিবার সন্তানকে স্কুলে রাখার পরিবর্তে কাজে পাঠাতে বাধ্য হচ্ছে। শিশুশ্রমের কারণে ঝরে পড়ার হার ৯ দশমিক ২ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে।
অন্যদিকে মেয়েদের শিক্ষাজীবন ব্যাহত হওয়ার পেছনে বাল্যবিবাহ একটি বড় কারণ। গবেষণায় বাল্যবিবাহের সঙ্গে সম্পর্কিত ঝরে পড়ার হার ৩৮ দশমিক ৯ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও স্বীকার করা হয়েছে যে, শুধু ভর্তি বাড়ানো নয়, শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষা ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি কম হলেও ঝরে পড়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। শিক্ষার্থীদের স্কুলে আগ্রহ বাড়াতে স্কুল ইউনিফর্ম এবং খাবার কর্মসূচির মতো উদ্যোগ নেওয়ার কথা তিনি উল্লেখ করেন।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারে ধাপে ধাপে পরীক্ষামূলক প্রকল্প চালু করা হচ্ছে। সফল উদ্যোগগুলো পরে সারা দেশে বাস্তবায়ন করা হবে।
তিনি বলেন, সরকারি প্রাথমিক পর্যায়ে ঝরে পড়ার হার তুলনামূলক কম হলেও প্রাথমিক শেষ করে মাধ্যমিকে যাওয়ার সময় ১৬ থেকে ১৭ শতাংশ শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে। বর্তমানে ১৫০টি উপজেলায় মধ্যাহ্নভোজ কর্মসূচি চালু রয়েছে এবং আগামী বছরে এটি সারা দেশে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
দুর্বল ভিত্তি ও শিক্ষার খরচও বড় সমস্যা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান মনে করেন, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় মূল সমস্যা হচ্ছে প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার ভিত্তি যথেষ্ট শক্তিশালী না হওয়া।
তার মতে, শিক্ষার মান উন্নয়নের পরিবর্তে অনেক সময় নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরিতে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ফলে অনেক শিক্ষার্থী প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করলেও প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না।
তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে পঞ্চম শ্রেণি শেষ করা শিক্ষার্থীদের শেখার দক্ষতা দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণির পর্যায়ে থেকে যায়। ফলে মাধ্যমিকের তুলনামূলক কঠিন পাঠ্যক্রমের সঙ্গে মানিয়ে নিতে তাদের সমস্যা হয়।
অধ্যাপক মজিবুর রহমান আরও বলেন, প্রাথমিক শিক্ষা আইন অনুযায়ী বিনামূল্যে হলেও বাস্তবে একটি শিশুর শিক্ষার জন্য পরিবারের নানা ধরনের খরচ থাকে। খাতা-কলম, পোশাক, যাতায়াত এবং খাবারের খরচ অনেক দরিদ্র পরিবারের জন্য বড় চাপ হয়ে দাঁড়ায়।
তিনি বলেন, কোনো শিশু স্কুলে না গিয়ে কৃষিকাজ বা দোকানে কাজ করলে পরিবার একটি নির্দিষ্ট আয় পায়। কিন্তু শিশুকে স্কুলে পাঠালে সেই আয় হারাতে হয়। অর্থনীতিতে এটিকে সুযোগ ব্যয় বলা হয়। দরিদ্র পরিবারগুলো অনেক সময় এই ক্ষতি পূরণের মতো সহায়তা না পাওয়ায় সন্তানকে কাজে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়।
তিনি আরও বলেন, শিক্ষক সংকট, শূন্য পদ পূরণে বিলম্ব, প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাব এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাতের সমস্যাও শিক্ষার মানকে প্রভাবিত করছে।
তার মতে, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে কার্যকর সম্পর্ক তৈরি না হলে অনেক শিক্ষার্থীর মধ্যে পড়াশোনার আগ্রহ কমে যেতে পারে। তাই বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের পরিবর্তে পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে পুনর্গঠন করা প্রয়োজন।
সব শিক্ষার্থী কমে যাওয়া মানেই ঝরে পড়া নয়
চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জের ইসলামগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. নিজাম উদ্দিন শেখ বলেন, প্রাথমিকের পর সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার পেছনে বিভিন্ন কারণ রয়েছে।
তিনি জানান, অনেক শিক্ষার্থী পঞ্চম শ্রেণি শেষ করার পর কওমি, হাফেজি বা আলিয়া মাদ্রাসার মতো বিকল্প শিক্ষাধারায় চলে যায়। এসব শিক্ষার্থী সব সময় সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থার পরিসংখ্যানে একইভাবে প্রতিফলিত হয় না।
তাই সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষার্থী কমে যাওয়াকে সব ক্ষেত্রেই সরাসরি ঝরে পড়া হিসেবে দেখা ঠিক নয় বলে তিনি মনে করেন।
তবে তিনি স্বীকার করেন, আর্থিক সংকট অনেক পরিবারের জন্য বড় বাধা। অনেক অভিভাবক মনে করেন, সন্তান পঞ্চম শ্রেণি পাস করার পর কাজে যুক্ত হলে পরিবারে আয় বাড়বে।
এছাড়া অভিভাবকের অশিক্ষা, সচেতনতার অভাব এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত আসক্তিও শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষার্থী সংখ্যা কমে যাওয়ার এই প্রবণতা ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু বিদ্যালয়ে ভর্তি বাড়ানো নয়, শিক্ষার্থীদের ধরে রাখা, শিক্ষার মান উন্নয়ন এবং দরিদ্র পরিবারের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

