বাংলাদেশের উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থার সংকট এবার আর আড়াল করার সুযোগ নেই। ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ১১টি শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার নেমে এসেছে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশে। অর্থাৎ পরীক্ষায় অংশ নেওয়া প্রতি ১০০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় ৪৮ জনই উত্তীর্ণ হতে পারেননি। জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও গত বছরের তুলনায় প্রায় ৪২ শতাংশ কমেছে, যদি উভয় বছরের প্রথম প্রকাশিত ফলাফল তুলনা করা হয়। এক বছরে ২৯ হাজার ১৩ জন কম শিক্ষার্থী সর্বোচ্চ ফল অর্জন করেছেন। আরও উদ্বেগজনক হলো, দেশের ২৯৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেননি। বিপরীতে শতভাগ পাস করেছে মাত্র ১৩৯টি প্রতিষ্ঠান। প্রশ্ন হলো, এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী কেন ব্যর্থ হচ্ছে? এটি কি শুধু তাদের মেধা, পরিশ্রম ও প্রস্তুতির ঘাটতি, নাকি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা ব্যর্থতারই প্রকাশ? শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতার হিসাব নেওয়া হচ্ছে, কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষক, শিক্ষা প্রশাসন এবং নীতিনির্ধারকদের জবাবদিহি কোথায়?
দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন ফল, পরিসংখ্যান কী বলছে?
২০২৬ সালের ফলাফলকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে এর ঐতিহাসিক অবস্থান। বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশিত ফলাফলের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৪ সালে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার ছিল প্রায় ৪৭ দশমিক ৭৩ থেকে ৪৭ দশমিক ৭৪ শতাংশ। এরপর ২০২৬ সালের আগে এত নিচে পাসের হার আর দেখা যায়নি। অর্থাৎ ২০২৬ সালের ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ পাসের হার গত ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। ২০০৫ সালে পাসের হার ছিল ৫৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। ফলে এবারের ফলাফল শুধু গত এক দশকের নয়, দীর্ঘ সময়ের শিক্ষাগত পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
একজন শিক্ষার্থীর ব্যর্থতার দায় কি শুধু তার নিজের? যে শিক্ষক পাঠদান করেছেন, যে প্রতিষ্ঠান তাকে সনদ দেওয়ার জন্য প্রস্তুত করেছে, যে শিক্ষা বোর্ড মূল্যায়ন করেছে এবং যে মন্ত্রণালয় পুরো ব্যবস্থার নীতিনির্ধারণ করেছে – তাদের দায় কোথায়?
—এফ.আর ইমরান, সিটিজেন্স ভয়েস-এর নির্বাহী সম্পাদক
এই চার বছরের পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে পাসের হার কমেছে ২৬ দশমিক ৫২ শতাংশ পয়েন্ট। আর জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ৫২ হাজার ৫১১ জন, অর্থাৎ প্রায় ৫৬ দশমিক ৭ শতাংশ। বিশেষ করে ২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে পাসের হার একবারে ১৮ দশমিক ৯৫ শতাংশ পয়েন্ট কমে যায়। ২০২৬ সালেও সেই নিম্নমুখী প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। ২০২৫ সালের প্রথম প্রকাশিত ফলের সঙ্গে ২০২৬ সালের ফল তুলনা করলে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ২৯ হাজার ১৩ জন, অর্থাৎ প্রায় ৪২ শতাংশ। তবে ২০২৫ সালের পুনর্নিরীক্ষণ-পরবর্তী ৭২ হাজার ১৭৬ জনের সঙ্গে তুলনা করলে ব্যবধান ৩২ হাজার ৯২ জন, অর্থাৎ প্রায় ৪৪ দশমিক ৫ শতাংশ। (এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখতে হবে, ২০২৪ সালের ফলাফল স্বাভাবিক পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষা পদ্ধতির ফল ছিল না। জুলাইয়ের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পরীক্ষা বাতিল হওয়ার পর অবশিষ্ট বিষয়গুলোর ফল আগের পরীক্ষার নম্বর ও বিষয়ভিত্তিক ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়েছিল। ফলে চার বছরের ফল তুলনা করতে গেলে পরীক্ষার ধরন ও মূল্যায়ন পদ্ধতির পার্থক্যও বিবেচনায় নিতে হবে।)

শিক্ষার্থীদের দায়, নাকি শিক্ষাব্যবস্থার ব্যর্থতা?
একটি পরীক্ষায় খারাপ ফল হলেই শিক্ষার্থীদের অযোগ্য বলে আখ্যায়িত করা সহজ। কিন্তু একই সঙ্গে এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ব্যর্থ হলে শুধু ব্যক্তিগত অযোগ্যতার ব্যাখ্যা যথেষ্ট নয়। শিক্ষার্থীরা যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বছরের পর বছর পড়াশোনা করেছে, সেখানে তাদের শেখার পরিবেশ কেমন ছিল? নিয়মিত ক্লাস হয়েছে কি না, শিক্ষকরা পাঠ্যসূচি যথাযথভাবে শেষ করেছেন কি না, দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত সহায়তা দেওয়া হয়েছে কি না, শ্রেণিকক্ষে বিষয়ভিত্তিক বোঝাপড়া তৈরি হয়েছে কি না – এসব প্রশ্নের উত্তরও খুঁজতে হবে।
দেশের বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকের দায়িত্ব কেবল পাঠ্যবই শেষ করা এবং পরীক্ষার আগে সাজেশন দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কোথাও নিয়মিত ক্লাসের ঘাটতি, কোথাও বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষকের অভাব, আবার কোথাও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিক্ষকদের কার্যকর যোগাযোগ নেই। শ্রেণিকক্ষে পাঠদান দুর্বল হলে শিক্ষার্থীরা স্বাভাবিকভাবেই প্রাইভেট টিউশন ও কোচিংয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। তখন শিক্ষা আর বিদ্যালয় বা কলেজের মূল শ্রেণিকক্ষকেন্দ্রিক থাকে না; বরং পরিবারের আর্থিক সামর্থ্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে ওঠে।
ক্যাম্পেইন ফর পপুলার এডুকেশন বা ক্যাম্পের (CAMPE) Education Watch 2023 গবেষণায় দেখা যায়, মাধ্যমিক পর্যায়ের ৭৬ দশমিক ৬ শতাংশ শিক্ষার্থী ব্যক্তিগত শিক্ষকের সহায়তা নেয় এবং ৯৩ শতাংশ শিক্ষার্থী বাণিজ্যিক গাইডবই ব্যবহার করে। গবেষণায় প্রাথমিক পর্যায়েও ব্যক্তিগত শিক্ষক ও গাইডবইয়ের ওপর উল্লেখযোগ্য নির্ভরতার তথ্য পাওয়া গেছে। এর আগের Education Watch 2022 গবেষণাতেও শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট টিউশন ও কোচিংয়ের ওপর ব্যাপক নির্ভরতার চিত্র উঠে এসেছিল।
অবশ্যই সব শিক্ষককে একই অভিযোগে অভিযুক্ত করা যাবে না। অনেক শিক্ষক সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু যাঁদের অবহেলা, অনিয়ম কিংবা বাণিজ্যিক স্বার্থের কারণে শ্রেণিকক্ষের শিক্ষা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তাঁদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করে শুধু শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতার জন্য দায়ী করা ন্যায়সংগত নয়।
প্রাইভেটমুখী শিক্ষা, কোচিং বাণিজ্য ও শিক্ষকদের জবাবদিহিতা
শিক্ষাব্যবস্থার আরেকটি বড় সংকট হলো শ্রেণিকক্ষের শিক্ষার জায়গা ক্রমেই প্রাইভেট টিউশন ও কোচিংনির্ভর হয়ে পড়া। অনেক পরিবারের কাছে এখন সন্তানের ভালো ফলের জন্য স্কুল-কলেজের পাশাপাশি আলাদা শিক্ষক, কোচিং সেন্টার ও অনলাইন কোর্সের পেছনে অর্থ ব্যয় করা প্রায় বাধ্যতামূলক হয়ে উঠেছে। এতে আর্থিকভাবে সচ্ছল পরিবারের শিক্ষার্থীরা অতিরিক্ত প্রস্তুতির সুযোগ পাচ্ছে, অথচ নিম্ন আয়ের পরিবারের শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়ছে। ফলে একই শিক্ষাব্যবস্থার অধীনে থেকেও শিক্ষার্থীদের শেখার সুযোগ ও মানে বিভিন্ন ধরণের বৈষম্য সৃষ্টি করে।

এখানে শিক্ষকদের ভূমিকা ও দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলা জরুরি। ২০১২ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য বন্ধে নীতিমালা প্রণয়ন করেছিল। পরবর্তী সময়ে ২০১৯ সালে হাইকোর্টও ওই নীতিমালার বৈধতা বহাল রাখেন। নীতিমালায় নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের বাণিজ্যিকভাবে প্রাইভেট পড়ানো এবং বাণিজ্যিক কোচিং সেন্টারের সঙ্গে শিক্ষকদের সম্পৃক্ততার ওপর বিধিনিষেধ রয়েছে।
কিন্তু বাস্তবে এই নীতিমালা কতটা কার্যকর হয়েছে? কতজন শিক্ষক নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে পাঠদান না করে শিক্ষার্থীদের কোচিং বা ব্যক্তিগত পড়াশোনার দিকে নির্ভরশীল করে তুলছেন, তার নিরপেক্ষ মূল্যায়ন কোথায়? কোনো শিক্ষক যদি শ্রেণিকক্ষে যথাযথভাবে না পড়িয়ে একই বিষয় ব্যক্তিগতভাবে পড়ানোর মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করেন, তাহলে সেটি শুধু পেশাগত নৈতিকতার প্রশ্ন নয়; এটি শিক্ষার্থীর প্রতি দায়িত্বহীনতা এবং শিক্ষার সমান সুযোগের পরিপন্থী।
অন্যদিকে, শিক্ষকদের কম বেতন, অতিরিক্ত কর্মভার, বড় শ্রেণিকক্ষ ও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের অভাবের মতো কাঠামোগত সমস্যাও বিবেচনায় নিতে হবে। সব ব্যর্থতার দায় শিক্ষকদের ওপর চাপিয়ে দিলেও সমাধান আসবে না; বরং ব্যক্তিগত অবহেলা ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা আলাদা করে চিহ্নিত করতে হবে।
আন্দোলন, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও শিক্ষার ধারাবাহিকতা
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক শিক্ষাবর্ষগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, শিক্ষার্থীরা বারবার বিভিন্ন আন্দোলন, রাজনৈতিক সংঘাত ও সামাজিক অস্থিরতার মধ্যে পড়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলন এবং পরবর্তী পরিস্থিতিতে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষাও ব্যাহত হয়েছিল। সাতটি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার পর বাকি পরীক্ষাগুলো প্রথমে স্থগিত করা হয়। পরে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে অবশিষ্ট পরীক্ষাগুলো বাতিল করে আগের পরীক্ষার ফল ও এসএসসির ফলের ভিত্তিতে বিষয় ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে ফল প্রকাশ করা হয়। ফলে ওই বছরের ফলাফলকে স্বাভাবিক পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষার ফলের সঙ্গে সরাসরি তুলনা করা যায় না।
একটি বহুল প্রচলিত কথা রয়েছে, ‘একটি জাতিকে মেধাশূন্য করতে হলে শিক্ষার্থীদের জ্ঞানচর্চা থেকে সরিয়ে আন্দোলন ও সংঘাতের দিকে ঠেলে দাও। কারণ, মেধাহীন জাতিকে শোষণ করা সহজ।’ তাই দেশি-বিদেশি স্বার্থান্বেষী মহলের অপতৎপরতা থেকে শিক্ষার্থীদের রক্ষা করতে সতর্ক থাকাও প্রয়োজন।
তবে, বিশ্বের ইতিহাসে ছাত্র আন্দোলন বহু ইতিবাচক পরিবর্তনের পথ তৈরি করেছে। কিন্তু আন্দোলনের পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান, গবেষণা, পরীক্ষা ও শিক্ষার পরিবেশ সচল রাখার দায়িত্বও রাষ্ট্রের। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম বিঘ্নিত হলে তার ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার জন্য কার্যকর পরিকল্পনা কতটা নেওয়া হয়? কয়েক মাসের শিক্ষাক্ষতি কি শুধু নতুন পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করে পূরণ করা সম্ভব?
২৯৩টি প্রতিষ্ঠানে পাসের হার শূন্য: দায় নেবে কে?
এবারের ফলাফলের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকগুলোর একটি হলো, দেশের ২৯৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেননি। অথচ গত বছর এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ২০২টি এবং ২০২৪ সালে ছিল ৬৫টি। অর্থাৎ দুই বছরের ব্যবধানে শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা চার গুণেরও বেশি হয়েছে।
অন্যদিকে, শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা মাত্র ১৩৯টি। গত বছর এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ৩৪৫টি। এই বিপরীত চিত্র বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রতিষ্ঠানভেদে শিক্ষার মান ও সুযোগের বৈষম্য কতটা প্রকট, তারই প্রতিচ্ছবি উঠে এসেছে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে ঢাকা বোর্ডে পাসের হার ৬১ দশমিক ৮০ শতাংশ হলেও বরিশালে তা মাত্র ৪৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ। চট্টগ্রাম বোর্ডে পাসের হার ৫২ দশমিক ০৭ শতাংশ, যা ওই বোর্ডের গত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন বলে প্রকাশিত হয়েছে। একই পরীক্ষার প্রশ্নপত্র, একই জাতীয় মূল্যায়নব্যবস্থা এবং একই শিক্ষাক্রমের অধীনে বিভিন্ন বোর্ডের ফলাফলে এত বড় পার্থক্য কেন? প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকসংকট, বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষকের অভাব, দুর্বল অবকাঠামো, আর্থিক অসচ্ছলতা ও শিক্ষার্থীদের বাড়তি সহায়তার অভাব কি এই ব্যবধানের পেছনে ভূমিকা রাখছে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বোর্ডভিত্তিক নয়, প্রতিষ্ঠান ও অঞ্চলভিত্তিক গবেষণাও প্রয়োজন।
প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের কাছে জানতে চাওয়া উচিত, তাঁরা সারা বছর কীভাবে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করেছেন? নিয়মিত পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা শনাক্ত করা হয়েছিল কি না? যদি করা হয়ে থাকে, তাহলে তা দূর করতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল? রাষ্ট্র কি শুধু ফলাফল প্রকাশের পর ব্যর্থতার সংখ্যা গণনা করবে, নাকি ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়ও নির্ধারণ করবে?
পরীক্ষার কঠোরতা, নাকি প্রকৃত শিক্ষার সংকট?
এবারের ফলাফল নিয়ে আলোচনায় মূল্যায়ন পদ্ধতির বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। আগের কয়েক বছরে উচ্চ পাসের হার এবং বিপুলসংখ্যক জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের প্রকৃত জ্ঞান ও দক্ষতার প্রতিফলন কতটা ছিল, সেই প্রশ্নও এখন সামনে আসছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালে বিষয় ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে ফল প্রকাশ এবং ২০২৫ সালে তুলনামূলক কম পাসের হার দেখিয়েছে, পরীক্ষার ধরন ও মূল্যায়ন পদ্ধতির পরিবর্তন ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, শিক্ষার্থীদের প্রকৃত শিখন-দক্ষতা যাচাইয়ের জন্য আমাদের মূল্যায়নব্যবস্থা কতটা নির্ভরযোগ্য? প্রশ্নপত্রের কঠিনতা, উত্তরপত্র মূল্যায়নের মান, পরীক্ষকদের প্রশিক্ষণ এবং বোর্ডভিত্তিক মূল্যায়নের সামঞ্জস্য কি নিয়মিত পরীক্ষা করা হয়? ফলাফল খারাপ হলেই কঠোর মূল্যায়নকে দায়ী করা যাবে না; আবার শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা যাচাই না করে শুধু পাসের হার বাড়ানোর জন্য নম্বর দেওয়াও গ্রহণযোগ্য নয়।
বিশ্বব্যাংক ও ইউনেসকোর ২০২৪ সালের লার্নিং পোভার্টি প্রতিবেদনে বাংলাদেশের প্রাথমিক পর্যায়ের শিশুদের পাঠদক্ষতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের সংজ্ঞা অনুযায়ী, ১০ বছর বয়সেও বয়সোপযোগী একটি লেখা পড়ে বুঝতে না পারা শেখার দারিদ্র্যের গুরুত্বপূর্ণ সূচক। এই পরিমাপ দেখায়, বাংলাদেশের শিক্ষার সংকট উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার আগেই শুরু হয়। প্রাথমিক স্তরে ভাষা ও গণিতের ভিত্তি দুর্বল থাকলে পরবর্তী সময়ে বিজ্ঞান, হিসাববিজ্ঞান, ইংরেজি কিংবা অন্যান্য জটিল বিষয় বোঝার ক্ষেত্রে তার প্রভাব পড়া স্বাভাবিক।
অর্থাৎ শিক্ষার্থীরা এইচএসসিতে এসে হঠাৎ দুর্বল হয়ে পড়ছে- এমনটা নয়। বরং, তাদের শিক্ষাজীবনের আগের স্তরগুলোতে যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, সেটি সময়মতো শনাক্ত বা খতিয়ে দেখে তা সমাধান করা হয়নি।
শিক্ষা সংস্কারের আগে প্রয়োজন জবাবদিহিতা
এইচএসসি ফলাফলকে কেন্দ্র করে এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্বাধীন শিক্ষাব্যবস্থা পর্যালোচনা। কোন বিষয়ে কত শিক্ষার্থী ফেল করেছে, কোন অঞ্চলে ফল সবচেয়ে খারাপ, কোন ধরনের প্রতিষ্ঠানে শূন্য পাস বেশি, শিক্ষকসংকটের সঙ্গে ফলাফলের সম্পর্ক কী, কত শিক্ষার্থী নিয়মিত ক্লাসের বাইরে কোচিংয়ের ওপর নির্ভরশীল এবং পরীক্ষার মূল্যায়নে কী ধরনের পরিবর্তন এসেছে – এসব তথ্য প্রকাশ করা প্রয়োজন।

প্রতিটি শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠানের জন্য পৃথক তদন্ত ও উন্নয়ন পরিকল্পনা থাকা উচিত। শিক্ষকদের নিয়মিত উপস্থিতি, পাঠদানের মান, শিক্ষার্থীদের বিষয়ভিত্তিক দুর্বলতা এবং প্রতিষ্ঠানপ্রধানের দায়িত্ব পালনের বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ করতে হবে। শিক্ষকদের অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নিতে হবে, আবার প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা না পাওয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে শুধু শাস্তি না দিয়ে সহায়তাও দিতে হবে।
প্রাইভেট টিউশন ও কোচিংনির্ভরতা কমাতে শ্রেণিকক্ষের পাঠদানকে কার্যকর করতে হবে। শিক্ষার্থীরা যেন স্কুল-কলেজেই প্রয়োজনীয় শিক্ষা পায়, সে নিশ্চয়তা তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়ন, নিয়োগে স্বচ্ছতা, নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষা প্রশাসনের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে পাঠদান ব্যাহত হলে ক্ষতিপূরণমূলক শিক্ষাপরিকল্পনাও থাকতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে শুধু ফলাফল প্রকাশকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হলে চলবে না; শিক্ষার মান নিশ্চিত করার দায়িত্বও নিতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে কী ব্যর্থতা রয়েছে, তার তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন ও সংস্কার প্রয়োজন।
একটি প্রজন্মের ব্যর্থতার দায় কার?
একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার শিক্ষার্থীদের জ্ঞান, চিন্তাশক্তি, দক্ষতা ও সৃজনশীলতার ওপর। যে শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের শুধু পরীক্ষায় পাস করাতে ব্যস্ত থাকে, কিন্তু তাদের প্রকৃত জ্ঞান অর্জন করাতে পারে না, সেই ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে ব্যর্থ হবে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এখন সেই আশঙ্কাই ক্রমে বড় হয়ে উঠছে।
এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় ১২ লাখের বেশি শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় অর্ধেকের ব্যর্থতা শুধু একটি পরীক্ষার ফলাফল নয়; এটি শিক্ষাব্যবস্থার সামগ্রিক সক্ষমতা নিয়ে বড় প্রশ্ন। যে শিক্ষার্থী বছরের পর বছর বিদ্যালয় ও কলেজে পড়াশোনা করেছে, তার ব্যর্থতার দায় কি শুধু তার নিজের? যে শিক্ষক পাঠদান করেছেন, যে প্রতিষ্ঠান তাকে সনদ দেওয়ার জন্য প্রস্তুত করেছে, যে শিক্ষা বোর্ড মূল্যায়ন করেছে এবং যে মন্ত্রণালয় পুরো ব্যবস্থার নীতিনির্ধারণ করেছে – তাদের দায় কোথায়?
আমরা এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা তৈরি করেছি, যেখানে শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে যথাযথ শিক্ষা না দিয়ে কোচিংয়ের ওপর নির্ভরশীল করা হচ্ছে!? যেখানে অভিভাবকদের বাড়তি অর্থ ব্যয় না করলে সন্তানের ভালো ফল অনিশ্চিত হয়ে পড়ে!? যেখানে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক হয়, কিন্তু তাদের হারানো শিক্ষাসময় পূরণের কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায় না!? যেখানে একটি প্রতিষ্ঠানের সবাই ফেল করলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয় না!?
রাষ্ট্রের কাছে প্রশ্ন, প্রতি বছর কতজন শিক্ষার্থী পাস করল, কতজন জিপিএ-৫ পেল, শুধু এই হিসাব প্রকাশ করেই কি শিক্ষার দায়িত্ব শেষ হয়? শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতার পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হচ্ছে, কিন্তু শিক্ষকদের পাঠদানের মান, প্রতিষ্ঠান পরিচালনার দক্ষতা এবং শিক্ষা প্রশাসনের ব্যর্থতার পরিসংখ্যান কোথায়?
একটি প্রজন্মকে শুধু সনদ দিয়ে শিক্ষিত করা যায় না; তাদের চিন্তা করতে শেখাতে হয়, প্রশ্ন করতে শেখাতে হয়, জ্ঞান অর্জনের সুযোগ দিতে হয়। তাই এবারের এইচএসসি ফলাফলকে শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতার তালিকা হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থার একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা উচিত। কারণ আজ যে প্রজন্ম শিক্ষার মানহীনতা ও অব্যবস্থাপনার শিকার হচ্ছে, আগামী দিনে তারাই দেশের অর্থনীতি, প্রশাসন, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও নেতৃত্বের দায়িত্ব নেবে। তাদের শিক্ষার ঘাটতির মূল্য শেষ পর্যন্ত শুধু তাদের পরিবার নয়, পুরো বাংলাদেশকেই দিতে হবে।
- ফজলে রাব্বি (ইমরান), সিটিজেন্স ভয়েস-এর নির্বাহী সম্পাদক

