নেক্সটজবজ লিমিটেডের চিফ বিজনেস অফিসার শোয়েব হাসানের লেখা একটি বিশ্লেষণাত্মক নিবন্ধে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস), ইউজিসি এবং বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্যের ভিত্তিতে দেশের উচ্চশিক্ষিত বেকারত্ব ও শ্রমবাজারের গভীর বাস্তবতার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে যে, দেশে বর্তমান মোট ২৬ লাখ ২৪ হাজার বেকারের মধ্যে ৮ লাখ ৮৫ হাজার জনই স্নাতক ডিগ্রিধারী। অর্থাৎ দেশের প্রতি তিনজন বেকারের একজনই উচ্চশিক্ষিত, যা আট বছর আগের চিত্র থেকে দ্বিগুণেরও বেশি। স্নাতক পাস করা তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার বর্তমানে ১৩.৫ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে, যেখানে ২০১০ সালে এই হার ছিল মাত্র ৪.৯ শতাংশ। এমনকি চাকরিপ্রার্থী এসব মেধাবী তরুণের অন্তত ১৭ শতাংশের বেশি দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে কোনো কাজ না পেয়ে চরম হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন।
বিশ্লেষণে বেকারত্ব ও শ্রমবাজারের সংকটের পেছনে তিনটি মূল স্তরকে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রথম সমস্যাটি হলো কাজের সুনির্দিষ্ট ঘাটতি। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) হিসাব মতে প্রতি বছর প্রায় সাত লাখ শিক্ষার্থী স্নাতক সম্পন্ন করলেও স্বাভাবিক বিনিয়োগ পরিবেশে বড়জোর তিন লাখ তরুণের কর্মসংস্থান সম্ভব। বিশ্বব্যাংকের ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ অনুযায়ী সাম্প্রতিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩.৪ শতাংশে নেমে আসায় নিট কর্মসংস্থান তৈরি হবে মাত্র ৬ লাখ ৩০ হাজার, যা নতুন ডিগ্রিধারীদের চাহিদার তুলনায় খুবই অপ্রতুল। দ্বিতীয় সংকটটি হলো স্কিল মিসম্যাচ বা দক্ষতার অমিল। টাস্কফোর্সের তথ্য অনুযায়ী, পাস করা স্নাতকদের প্রায় ৬০ শতাংশই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ কলেজগুলোর মানবিক বা সামাজিক বিজ্ঞান বিষয়ের শিক্ষার্থী; অথচ কর্পোরেট নিয়োগকর্তারা খোঁজেন সেলস, হিসাববিজ্ঞান, ডেটা অ্যানালাইসিস বা প্রযুক্তির মতো হাতে-কলমে ব্যবহারিক দক্ষতা। বিআইডিএসের গবেষণায় দেখা গেছে যে নিয়োগকর্তাদের কাঙ্ক্ষিত দক্ষতার অন্তত ৩০ শতাংশই বর্তমানে আমাদের শ্রমবাজারে অনুপস্থিত।
তৃতীয় বড় জটিলতাটি হলো চাকরিপ্রার্থী ও নিয়োগকর্তাদের মধ্যে তথ্যের প্রবাহ বা সংযোগের অভাব। কোনো বড় ব্র্যান্ড বা সুনির্দিষ্ট মানবসম্পদ বা এইচআর বিভাগ না থাকা ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলো শত শত জীবনবৃত্তান্ত বা সিভি যাচাইয়ের সময় না পেয়ে শেষ পর্যন্ত ব্যক্তিগত পরিচিতি বা সুপারিশের ভিত্তিতেই কর্মী নিয়োগ দিতে বাধ্য হয়। ফলে কোনো চেনা লোক বা সুপারিশ করার অভিভাবক না থাকা জেলা শহরের মেধাবী বা পরিবারের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় পার করা তরুণেরা কোনো পরীক্ষা দেওয়ার আগেই প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে পড়েন। এর পাশাপাশি অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করা কর্মীবাহিনীর সুরক্ষা না থাকা এবং আরও প্রায় ৬৪ থেকে ৬৭ লাখ মানুষ ছদ্মবেশী বা আংশিক বেকারত্বের শিকার হওয়ায় দেশের প্রকৃত শ্রমবাজারের অবস্থা আরও নাজুক রূপ নিয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী সামষ্টিক অর্থনৈতিক মন্দার কারণে সার্ভিস ও ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে কাজ হারানো বহু নারী পুনরায় শ্রমবাজারে আর ফিরে আসতে পারেননি। এক বছরে শ্রমশক্তি থেকে প্রায় সাড়ে ১৬ লাখ নারীর বাদ পড়া বা শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের বাইরে তরুণদের সংখ্যা দ্বিগুণ হওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক সংকেত দেয়। এই সংযোগের সংকট দূর করতে সম্প্রতি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই চালিত প্ল্যাটফর্ম ‘নেক্সটজবজ’-এর মতো ডিজিটাল নিয়োগব্যবস্থার আগমন ঘটছে, যা একই জায়গায় চাকরি খোঁজা, লার্নিং ল্যাবের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ এবং প্রার্থীর সিভির অগ্রগতির তথ্য স্পষ্ট করে নিয়োগ প্রক্রিয়া সহজ করার চেষ্টা করছে। তবে প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্মার্টফোন বা ইন্টারনেট না থাকা প্রার্থীদের বিষয়টি মাথায় রেখে চূড়ান্ত যাচাইয়ের কাজ প্রযুক্তির পাশাপাশি মানুষকেই করতে হবে।
উচ্চশিক্ষিত বেকারত্বের এই জটিল অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে নিয়োগকর্তা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকার তিন পক্ষকেই একযোগে কাজ করতে হবে। নিয়োগকর্তাদের উচিত স্পষ্ট বেতনের স্কেল ও দক্ষতার বিবরণ উল্লেখ করে সার্কুলার দেওয়া এবং বাদ পড়া প্রার্থীদের নোটিফিকেশনের মাধ্যমে কারণ জানানো। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোর পাঠ্যক্রমে কারিগরি প্রশিক্ষণ ও ইন্টার্নশিপ বাধ্যতামূলক করা এখন সময়ের দাবি, কারণ সনদের চেয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রার্থীর বাস্তব কর্মসংস্থানই সফলতা মাপার আসল মাপকাঠি হওয়া উচিত। সর্বাপরি, দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা, এনবিআর ও ব্যাংকিং খাত সংস্কারের মাধ্যমে অর্থনীতিতে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করা এবং শ্রমবাজারের শূন্য পদগুলোর নিয়মিত সঠিক ডেটা প্রকাশ করা গেলে দেশের শিক্ষিত তরুণদের প্রতিভার সঠিক মূল্যায়ন সম্ভব হবে।

