উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে ছেলেদের পড়াশোনার ফল ক্রমেই খারাপ হচ্ছে। চলতি বছরের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষায় ছেলেদের পাসের হার নেমে এসেছে ৪৭ দশমিক ১৪ শতাংশে। অর্থাৎ পরীক্ষায় অংশ নেওয়া অর্ধেকের বেশি ছাত্র উত্তীর্ণ হতে পারেনি। বিপরীতে ছাত্রীদের পাসের হার ৫৫ দশমিক ৪৫ শতাংশ। শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, পড়াশোনায় অমনোযোগিতা, মুঠোফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, মাদকাসক্তি এবং কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা ছেলেদের শিক্ষাজীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
চলতি বছর এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় মোট ১০ লাখ ৪৮ হাজার ৫৩০ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। তাদের মধ্যে ছাত্র ছিল ৪ লাখ ৮৩ হাজার ১৯১ জন। উত্তীর্ণ হয়েছে ২ লাখ ২৭ হাজার ৭৮৯ জন। ফলে ছেলেদের পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৪৭ দশমিক ১৪ শতাংশে। অন্যদিকে ছাত্রীদের পাসের হার ৫৫ দশমিক ৪৫ শতাংশ। গত বছরও ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা ভালো ফল করেছিল। ২০২৫ সালে ছেলেদের পাসের হার ছিল ৫৪ দশমিক ৬০ শতাংশ এবং মেয়েদের ৬২ দশমিক ৯৭ শতাংশ।
মানবিক বিভাগে ছেলেদের ফল সবচেয়ে খারাপ
এবারের ফলাফলে সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে রয়েছে মানবিক বিভাগের ছাত্ররা। সারা দেশে এ বিভাগে ছেলেদের পাসের হার মাত্র ৩৫ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ। নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে রাজশাহী বোর্ডে মানবিক বিভাগের ছাত্রদের ফল সবচেয়ে খারাপ। সেখানে ছেলেদের পাসের হার ২৮ দশমিক ১১ শতাংশ। একই বোর্ডে মানবিক বিভাগের ছাত্রীদের পাসের হার ৪৬ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ।
অন্যান্য বোর্ডের মধ্যেও মানবিক বিভাগে ছেলেদের ফল আশাব্যঞ্জক নয়। যশোর বোর্ডে এ বিভাগের ছাত্রদের পাসের হার ৩০ দশমিক ৬৫ শতাংশ, বরিশালে ৩০ দশমিক ৯৫, চট্টগ্রামে ৩২ দশমিক ৮৯, দিনাজপুরে ৩৩ দশমিক ১৯ এবং কুমিল্লায় ৩৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ। ময়মনসিংহ বোর্ডে এ হার ৩৯ দশমিক ৩৭ এবং সিলেটে ৪১ দশমিক ৯২ শতাংশ। তুলনামূলকভাবে ঢাকা বোর্ডে মানবিক বিভাগের ছাত্রদের ফল ভালো, সেখানে পাসের হার ৪৩ দশমিক ৩৪ শতাংশ।
চট্টগ্রাম সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মোহাম্মদ মোজাহেদুল ইসলাম চৌধুরী মনে করেন, বর্তমানে ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা পড়াশোনায় বেশি মনোযোগী। নারীশিক্ষায় সরকারের বিশেষ গুরুত্বের পাশাপাশি পরিবার থেকেও মেয়েদের পড়াশোনার বিষয়ে বেশি তদারকি করা হয়। বিশেষ করে কলেজ পর্যায় পর্যন্ত মেয়েদের পড়াশোনায় পরিবারের নজরদারি তুলনামূলক বেশি থাকে। এসব কারণে পরীক্ষার ফলেও মেয়েরা এগিয়ে থাকছে।
ছেলেদের ফল খারাপ হওয়ার পেছনে করোনাকালের প্রভাবও রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। তাঁর মতে, ওই সময় দেশের অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতির বিষয়ে শিথিলতা তৈরি হয়েছিল। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে কোচিংনির্ভরতা বাড়তে থাকে। পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও শিক্ষাঙ্গনে আন্দোলনের কারণে নিয়মিত পড়াশোনার পরিবেশও ব্যাহত হয়েছে। এসব পরিস্থিতির প্রভাব ছেলেদের ওপর তুলনামূলক বেশি পড়েছে।
তিনি আরও বলেন, উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের ওপর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকদের আগের মতো নিয়ন্ত্রণ নেই। ফলে অনেক ছাত্র নিয়মিত পড়াশোনার পরিবর্তে আড্ডা ও কোচিংয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। সহজে পরীক্ষায় পাস করার প্রবণতা তৈরি হওয়ায় পাঠ্যবইয়ের প্রতি আগ্রহও কমছে। কৈশোরের বিভিন্ন নেতিবাচক প্রভাব ছেলেদের মধ্যে তুলনামূলক বেশি দেখা যাচ্ছে বলেও মনে করেন তিনি।
বিজ্ঞান বিভাগে ছেলেদের ফল তুলনামূলক ভালো
মানবিক বিভাগের তুলনায় বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রদের ফল ভালো হলেও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে তাদের সাফল্য কম। চলতি বছর ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ছেলেদের পাসের হার ৪৫ দশমিক ৯৪ শতাংশ। অন্যদিকে বিজ্ঞান বিভাগে এ হার ৭৩ দশমিক ১২ শতাংশ।
বোর্ডভিত্তিক হিসাবে বিজ্ঞান বিভাগে ছেলেদের পাসের হার সবচেয়ে বেশি ঢাকা বোর্ডে, ৮০ দশমিক ৯৭ শতাংশ। চট্টগ্রামে ৭৩ দশমিক ৫৪, ময়মনসিংহে ৭৩ দশমিক ৩৯ এবং সিলেটে ৭০ দশমিক ৬৪ শতাংশ। যশোর বোর্ডে ৬৮ দশমিক ২৬, দিনাজপুরে ৬৫ দশমিক শূন্য ৯, রাজশাহীতে ৬৪ দশমিক ২৫ এবং কুমিল্লায় ৬১ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ ছাত্র উত্তীর্ণ হয়েছে। বিজ্ঞান বিভাগে সবচেয়ে কম পাসের হার বরিশাল বোর্ডে, ৫২ দশমিক ৬৭ শতাংশ।
রাজনীতি ও মুঠোফোনে ব্যস্ততা, পড়ায় মনোযোগ নেই
পড়াশোনায় অমনোযোগিতার বাস্তব চিত্র পাওয়া যায় মাদারীপুরের এক শিক্ষার্থীর ঘটনায়। জেলার একটি বেসরকারি কলেজ থেকে চলতি বছর মানবিক বিভাগে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়ে অকৃতকার্য হয়েছে জহিরুল ইসলাম। তার মা রেবেকা আকতার জানান, কলেজে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই ছেলে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। পড়াশোনার চেয়ে রাজনীতি ও মুঠোফোন ব্যবহারেই তার বেশি সময় কাটত।
ছেলেকে পড়াশোনায় ফেরাতে পরিবার থেকে বিভিন্ন চেষ্টা করা হলেও তাতে সফলতা আসেনি। বাড়িতে শিক্ষক নিয়োগ করেও নিয়মিত পড়ার অভ্যাস তৈরি করা যায়নি। শেষ পর্যন্ত ছেলেকে দেশের বাইরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তাঁরা। রেবেকা আকতারের মতে, নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ এবং মুঠোফোন ব্যবহারের বিষয়ে কঠোর নিয়ন্ত্রণ থাকা প্রয়োজন।
করোনার প্রভাব ও শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. আকতার বানু মনে করেন, করোনাকালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকা এবং অনলাইননির্ভর শিক্ষার বিস্তার শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার অভ্যাসে পরিবর্তন এনেছে। পরবর্তী সময়ে সংক্ষিপ্ত পাঠ্যসূচি ও স্বয়ংক্রিয়ভাবে উত্তীর্ণ হওয়ার সংস্কৃতিও বই পড়ার আগ্রহ কমিয়েছে। তাঁর মতে, সৃজনশীল পদ্ধতিতে অতিরিক্ত নম্বর দেওয়ার প্রবণতার কারণে অনেক শিক্ষার্থীর মধ্যে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়াই ভালো ফল করার ধারণা তৈরি হয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন ও শিক্ষাঙ্গনের আন্দোলন শিক্ষার্থীদের মনোযোগে প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে ছেলে শিক্ষার্থীদের জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা তুলনামূলক বেশি। পাশাপাশি নিয়মিত শ্রেণি কার্যক্রম না হওয়া, কোচিং সেন্টারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম শিক্ষার মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
অধ্যাপক আকতার বানুর মতে, পরিস্থিতি পরিবর্তনে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে কোচিংনির্ভরতা কমিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদানের মান বাড়ানো জরুরি। শুধু পরীক্ষার ফলের দিকে নজর না দিয়ে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পড়াশোনা, পাঠ্যবই পড়ার অভ্যাস এবং শেখার আগ্রহ তৈরিতে গুরুত্ব দিতে হবে।
কিশোর গ্যাং, মাদকাসক্তি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিও শিক্ষার্থীদের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয় বলে মনে করেন তিনি। এসব সমস্যা মোকাবিলায় মাদকের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ, সীমান্তে নজরদারি বৃদ্ধি এবং পুলিশের টহল জোরদার করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, মাদকের সহজলভ্যতা শুধু কিশোর বা তরুণদের নয়, সমাজের সব শ্রেণির মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
শিক্ষার্থীদের প্রতি নজরদারি বাড়ানোর উদ্যোগ
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল বলেন, কয়েক বছর ধরেই ছেলেদের পরীক্ষার ফল নিম্নমুখী। এর পেছনে পড়াশোনায় অমনোযোগিতা এবং অভিভাবক ও শিক্ষকদের পর্যাপ্ত নজরদারির অভাবসহ একাধিক কারণ রয়েছে।
তিনি জানান, শিক্ষার সামগ্রিক মান উন্নয়নে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে। শিক্ষার্থীদের নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতি নিশ্চিত করা, দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ এবং শিশু-কিশোরদের খেলাধুলা ও সহশিক্ষামূলক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে মাদকাসক্তি ও অন্যান্য নেতিবাচক প্রবণতা প্রতিরোধেরও চেষ্টা চলছে।
শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, শুধু পরীক্ষার আগে প্রস্তুতি নেওয়া কিংবা কোচিংয়ের মাধ্যমে ভালো ফল করার প্রবণতা থেকে শিক্ষার্থীদের বের করে আনতে হবে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া কিশোরদের পড়াশোনায় আগ্রহ ফিরিয়ে আনা কঠিন। একই সঙ্গে শিক্ষার পরিবেশ উন্নত করা এবং কৈশোরের ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ থেকে শিক্ষার্থীদের দূরে রাখাও জরুরি।

