চলতি বছরের উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষায় বগুড়ার পাঁচটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরীক্ষার্থীদের কেউই পাস করতে পারেননি। শিক্ষকদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, গ্রুপিং, পরিচালনা কমিটির বিরোধ এবং নিয়মিত পাঠদান না হওয়াকেই এই ফল বিপর্যয়ের প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। ঘটনার পর বগুড়া জেলা প্রশাসন সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের তদন্ত প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দিয়েছে।
শতভাগ অকৃতকার্য হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো হলো গাবতলী উপজেলার তসলিম উদ্দিন তরফদার কলেজ ও বাগবাড়ী মডেল মহিলা কলেজ, ধুনটের গোসাইবাড়ী মহিলা কলেজ এবং কাহালুর দুর্গাপুর আইডিয়াল মহিলা কলেজ ও আল্লামের তাকিয়া হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ। এর মধ্যে চারটি প্রতিষ্ঠান নন-এমপিওভুক্ত। বাকি একটি সরকারি বেতন-ভাতা পাওয়া শতভাগ এমপিওভুক্ত কলেজ।
সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আছে গাবতলীর তসলিম উদ্দিন তরফদার কলেজ। এই কলেজ থেকে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৪৬ শিক্ষার্থীর একজনও পাস করতে পারেননি। অথচ কলেজটিতে শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন ৩৭ জন। কলেজ সূত্র জানায়, শিক্ষার্থীরা মূলত ইংরেজি, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি), বাংলা এবং ভূগোল বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছেন।
এই ফলের প্রতিবাদে গত রোববার কলেজসংলগ্ন সোনাদহ বাজারে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেন ক্ষুব্ধ অভিভাবক ও এলাকাবাসী। তাঁদের অভিযোগ, শিক্ষকেরা নিয়মিত ক্লাস না নিয়ে অভ্যন্তরীণ দলাদলি ও স্থানীয় রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। শিক্ষার্থীরা নিয়মিত কলেজে আসেন কি না, সে খোঁজও রাখেন না তাঁরা। স্থানীয়দের এসব অভিযোগ শিক্ষকেরাও সরাসরি অস্বীকার করেননি। এ নিয়ে কলেজ কর্তৃপক্ষ ও পরিচালনা কমিটির তরফ থেকে কোনো কার্যকর উদ্যোগও দেখা যায়নি। বরং দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা একে অপরকে দোষারোপ করছেন।
কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আবুল কালাম আজাদ মনে করেন, ম্যানেজিং কমিটির বিরোধ ও শিক্ষকদের গ্রুপিংই এই বিপর্যয়ের মূল কারণ। সদ্য সাবেক ও বহিষ্কৃত অধ্যক্ষ জহুরুল ইসলাম কামালের দাবি, স্থানীয় কিছু বিষয়ের দ্বন্দ্বে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা ঠিকমতো ক্লাসে মনোযোগ দিতে পারেননি। তাঁর ভাষ্য, ব্যবস্থাপনা কমিটির দ্বন্দ্বের সুযোগ নিয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা ক্লাস ফাঁকি দিয়েছেন।
এক মাস আগে দায়িত্ব পাওয়া ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আমিনুল ইসলামও পরিচালনা কমিটির বিরোধের কথা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, এর আগে কখনো এমন ঘটনা ঘটেনি। এবার ইংরেজি ও আইসিটিতে শিক্ষার্থীরা ফেল করেছেন, কারণ আইসিটির শিক্ষক ছিলেন না আর ইংরেজির শিক্ষক পরীক্ষার কিছুদিন আগে যোগ দিয়েছেন। গ্রামের কলেজ হওয়ায় শিক্ষার্থীদের ডেকে এনে ক্লাস করাতে হয় এবং ফরম পূরণও একইভাবে করাতে হয় বলে জানান তিনি। ব্যবস্থাপনা কমিটি নিয়ে স্থানীয়দের অসন্তোষও প্রভাব ফেলেছে বলে তাঁর মত। এই ফলকে তিনি ‘দুর্ঘটনা ছাড়া কিছু নয়’ বলে মন্তব্য করেন।
বাকি চারটি প্রতিষ্ঠানের চিত্র আরও করুণ। ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত বাগবাড়ী মডেল মহিলা কলেজ থেকে এবার তিনজন পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন, কিন্তু কেউ পাস করতে পারেননি। কলেজ প্রাঙ্গণে গিয়ে দেখা যায়, টিনের ছাউনি দেওয়া ছয়টি কক্ষই তালাবদ্ধ। ক্যাম্পাসে সাজ্জাদ হোসেন নামের এক যুবককে ছাগলকে ঘাস খাওয়াতে দেখা যায়। তিনি জানান, শিক্ষকদের মধ্যে দ্বন্দ্ব থাকায় এখানে কেউ আসেন না, ফরম পূরণও হয় বাইরে। স্থানীয় যুবক এমরান হোসেনও বলেন, কলেজটি সব সময় বন্ধ থাকে।
প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষের দায়িত্বে থাকা আব্দুল্লাহ হেল বাকী মুঠোফোনে জানান, ১২ বছরের বেশি সময় ধরে চারজন শিক্ষক কোনো বেতন-ভাতা ছাড়াই কলেজে আছেন। তাঁর দাবি, কলেজের জমিদাতা একজনের সন্তান নিজেকে অধ্যক্ষ বলে দাবি করেন। এই নিয়ে দ্বন্দ্বের কারণে শিক্ষকেরা কলেজে যেতে চান না। বেতন না থাকায় শিক্ষক-কর্মচারীদের আগ্রহও কম। তিনি আগামীতে সবকিছু ঠিক করে কলেজ গুছিয়ে তোলার কথা জানান। কলেজের অফিস সহকারী রোকসানা খাতুন প্রায় এক বছর ক্যাম্পাসে যাননি। তাঁর মতে, অধ্যক্ষ নিয়ে দ্বন্দ্বের অবসান না হলে নতুন শিক্ষার্থী পাওয়াও কঠিন হবে।
ধুনটের গোসাইবাড়ী মহিলা কলেজ ও কাহালুর দুর্গাপুর আইডিয়াল মহিলা কলেজ থেকে দুজন করে এবং আল্লামের তাকিয়া হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন। তাঁদের সবাই অকৃতকার্য হয়েছেন। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধানেরা তীব্র আর্থিক সংকট ও এমপিওভুক্ত না হওয়াকে এই পরিণতির কারণ বলে দাবি করেছেন।
বগুড়ার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) সালমা আক্তার জানান, শতভাগ অকৃতকার্য হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে বিস্তারিত খোঁজ নিয়ে প্রতিবেদন দিতে সংশ্লিষ্ট উপজেলার ইউএনওদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হবে।
পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের চিত্র একরকম নয়। কোথাও শিক্ষকসংকট, কোথাও বেতনহীন শিক্ষক, কোথাও আবার ব্যবস্থাপনা কমিটির বিরোধ মূল সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে সব ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা। এমপিওভুক্ত একটি কলেজেও একই বিপর্যয় ঘটায় শুধু আর্থিক সংকটকে একমাত্র কারণ বলা কঠিন। এখন তদন্ত প্রতিবেদনে কী উঠে আসে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়, সেদিকেই নজর থাকবে। একই সঙ্গে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, এসব প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত তদারকি কেন হয়নি এবং ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

