মায়ের জন্য খাবার নিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার পথে রাজধানীর মগবাজার রেলক্রসিংয়ের কাছে এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজে ব্যবহৃত ক্রেনের ধাক্কায় প্রাণ হারিয়েছেন প্রকৌশলী এবিএম আহসান উল্লাহ আরিফ। গত ১৮ অক্টোবর সকাল আটটার দিকে রাইড শেয়ারের মোটরসাইকেলে যাওয়ার সময় ঘটে দুর্ঘটনাটি। চার দিন আইসিইউতে চিকিৎসাধীন থাকার পর ২২ অক্টোবর মারা যান তিনি। পেছনে রেখে গেছেন আট বছরের ছেলে ও স্ত্রীকে।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, আরিফের মা সেলিনা বেগম নিউমোনিয়া নিয়ে ইউনিভার্সেল হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। মুগদার বাসা থেকে মায়ের নাশতার খাবার নিয়ে সেখানেই যাচ্ছিলেন তিনি। ধাক্কায় মোটরসাইকেল থেকে ছিটকে সড়কে পড়লে ক্রেনের লোহার চাকা তাঁর কোমরের নিচের অংশের ওপর দিয়ে চলে যায়। পথচারীরা গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। দুর্ঘটনায় রাইড শেয়ার চালক ফারুক মিয়াও মারাত্মক জখম হন, তবে তিনি প্রাণে বেঁচে গেছেন।
ঘটনার পর পথচারীরা ক্রেনচালক মেহেদী হাসান সানিকে আটক করে পুলিশে দেন। হাতিরঝিল থানা পুলিশ ক্রেনটি জব্দ করেছে। ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিনোহাইড্রো জেভি। দুর্ঘটনার পর প্রতিষ্ঠানটির নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
আরিফের ছোট ভাই চিকিৎসক এবিএম ইয়াসিন উল্লাহ জানান, চার দিন পর মা সুস্থ হয়ে উঠলেও বড় ছেলেকে বাঁচানো যায়নি। ছেলের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর মায়ের শারীরিক অবস্থা এখন খুবই খারাপ। আরিফের বয়স ছিল ৩৭ বছর। মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল ও নটর ডেম কলেজে পড়াশোনা শেষে স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পুরকৌশলে স্নাতক সম্পন্ন করেন তিনি। পরে নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন।
নিহতের ফুফাতো ভাই সাদেক হোসেন ভুঁইয়া বাদী হয়ে ১৯ অক্টোবর হাতিরঝিল থানায় মামলা করেছেন। পরিবারের সদস্যরা বলছেন, সকাল আটটার দিকে সড়কে তেমন ভিড় ছিল না। ওই সময় রেললাইন দিয়ে কোনো ট্রেন চলাচলের খবরও তাঁরা পাননি। তাঁদের মতে, চালকের অবহেলা ছাড়া এমন দুর্ঘটনার কোনো কারণ দেখা যায় না। সাদেক হোসেন বলেন, আরিফের স্ত্রী ও সন্তানের সামনে এখন অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হাতিরঝিল থানার উপপরিদর্শক মো. সুমন জানান, তদন্ত চলছে এবং সাক্ষীদের সঙ্গে কথা বলা হচ্ছে। অভিযোগপত্র দিতে কিছুটা সময় লাগবে। এ বিষয়ে এক্সপ্রেসওয়ের প্রকল্প পরিচালক মো. মোরতোজা ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাহমুদুর রহমানের সঙ্গে ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁদের পাওয়া যায়নি। গত সোমবার গুলশানে সিনোহাইড্রো জেভির কার্যালয়ে গেলে সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। অভ্যর্থনায় দায়িত্বরতরা জানান, সাংবাদিক এলে প্রবেশ ও কোনো কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া যাবে না বলে তাঁদের নির্দেশ দেওয়া আছে।
এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজে এমন দুর্ঘটনা এবারই প্রথম নয়। ২০২৩ সালের ২৯ মে মহাখালীতে নির্মাণকাজ চলার সময় ওপর থেকে রড পড়ে ১২ বছরের এক শিশু ঘটনাস্থলেই মারা যায়। এর আগে ২০২২ সালের ১৫ আগস্ট উত্তরায় বিআরটি প্রকল্পের নির্মাণকাজের সময় ক্রেনের তার ছিঁড়ে একটি গার্ডার প্রাইভেটকারের ওপর পড়ে। সেই ঘটনায় গাড়িতে থাকা পাঁচজনের সবাই ঘটনাস্থলেই মারা যান। তাঁরা এক আত্মীয়ের বৌভাতের দাওয়াত থেকে ফিরছিলেন। গাড়িতে একজন পুরুষ, দুজন নারী ও দুটি শিশু ছিল।
এসব দুর্ঘটনার মধ্যে প্রথম দুটিতে সিনোহাইড্রো জেভি শ্যাংডং হাই স্পিড লিমিটেডের নাম এসেছে। উত্তরার বিআরটি দুর্ঘটনার ঠিকাদার ছিল চীনা প্রতিষ্ঠান গাজুবা গ্রুপ করপোরেশন। উচ্চ পর্যায়ের তদন্তে প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি ও ঝুঁকিপূর্ণভাবে কাজ করার বিষয়টি উঠে এসেছে। তবে এ পর্যন্ত কারও শাস্তি হয়নি। আদালতে একটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে বলে জানা গেছে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী খন্দকার মাহবুব আলম বলেন, নির্মাণকাজে নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিস্তারিত নির্দেশিকা আছে এবং ঠিকাদারদের তা মানা বাধ্যতামূলক। কোন ধরনের কাজে কী ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখতে হবে, তাও সেখানে বলা আছে। নির্মাণশ্রমিকের জীবন বীমা থাকাও বাধ্যতামূলক। কিন্তু বাস্তবে শ্রমিকের বীমা তো থাকেই না, কাজের সময় চারপাশ ঘিরে রাখার নিয়মও অনেক ঠিকাদার মানেন না। তাঁর মতে, এ কারণেই বারবার দুর্ঘটনা ঘটছে।
আরিফের মৃত্যু তাই একটি পরিবারের ব্যক্তিগত ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি রাজধানীর বড় নির্মাণ প্রকল্পগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও জবাবদিহির দুর্বলতাকেও সামনে এনেছে। নিয়ম থাকা সত্ত্বেও তা মানা হচ্ছে কি না, তদারকি কতটা কার্যকর এবং আগের দুর্ঘটনাগুলোর বিচার কেন এগোয়নি, এসব প্রশ্নের উত্তর না মিললে একই ধরনের প্রাণহানির ঝুঁকি থেকেই যাবে। এখন নজর থাকবে মামলার তদন্ত ও অভিযোগপত্রের দিকে।

