ভ্যাল কিলমারের এআই-নির্মিত প্রতিরূপ যখন নতুন একটি ওয়েস্টার্ন ছবিতে অভিনয় করছে এবং কৃত্রিম অভিনেতা টিলি নরউড তার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে অভিনয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন চলচ্চিত্রশিল্পে এআইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র হচ্ছে। এই প্রযুক্তির মূলধারায় প্রবেশ এখনো অনেক দূরের বিষয়, নাকি তা একেবারে দোরগোড়ায়- এ নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
নতুন ওয়েস্টার্ন চলচ্চিত্র ‘অ্যাজ ডিপ অ্যাজ দ্য গ্রেভ’-এর ট্রেলারে তরুণ ভ্যাল কিলমারের একটি হুবহু প্রতিরূপকে বলতে শোনা যায়, “মৃতদের ভয় পেয়ো না- আর আমাকেও ভয় পেয়ো না।” চরিত্রটি পুরোপুরি মৃতও নয়, আবার পুরোপুরি জীবিতও নয়। পরিচালক কোয়ের্টে ভুরহিস জানেন, এই দৃশ্যের মাধ্যমে তিনি কী ধরনের বিতর্কের জন্ম দিচ্ছেন।
এটি প্রয়াত অভিনেতা কিলমারের এআই-নির্মিত সংস্করণ। তার পরিবারের অনুমোদন নিয়ে তৈরি করা হলেও এই প্রতিরূপকে ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে- এআই প্রযুক্তি কি একসময় জীবন্ত অভিনেতাদের অপ্রয়োজনীয় করে তুলবে?
চলচ্চিত্রটির বর্ধিত ঝলক দেখে আপাতত তেমন সম্ভাবনা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। এআইয়ের তৈরি কিলমারকে দেখতে অনেকটা তার ত্রিশোর্ধ্ব বয়সের মতো মনে হলেও অভিনয়ের স্বাভাবিকতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তার চলাফেরা কিছুটা অনমনীয় এবং কণ্ঠস্বরেও সেই পরিচিত বৈশিষ্ট্য পুরোপুরি ফুটে ওঠেনি। কিলমারের পরিবার গল্প বলার পরিধি বাড়াতে নতুন প্রযুক্তির প্রতি তার আগ্রহের কথা উল্লেখ করে এই উদ্যোগে সম্মতি জানিয়েছে। তবে এই প্রতিরূপের অভিনয় দেখে তিনি নিজে কতটা সন্তুষ্ট হতেন, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
গত বছর এআই-নির্মিত ‘তারকা’ টিলি নরউডের আত্মপ্রকাশও ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। একটি পরিচিতিমূলক কমেডি স্কেচে তার উপস্থিতির পর অভিনেত্রী এমিলি ব্লান্ট তাকে ‘সত্যিই, সত্যিই ভীতিকর’ বলে বর্ণনা করেন। তার মন্তব্যে কৃত্রিম অভিনয়শিল্পীদের মাধ্যমে প্রকৃত অভিনেতাদের প্রতিস্থাপনের আশঙ্কা প্রতিফলিত হয়।
এআইয়ের মাধ্যমে এমন কিছু চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা দর্শক বা শিল্পীরা নিজেরা চাননি- এই মনোভাবও বিতর্ককে আরও তীব্র করেছে। সম্প্রতি টিলি নরউড ‘মিসঅ্যালাইনড’ নামের একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে অভিনয় করতে যাচ্ছে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
ব্রিটিশ ভিজ্যুয়াল ইফেক্টস প্রতিষ্ঠান ফ্রেমস্টোরের প্রধান সৃজনশীল কর্মকর্তা টিম ওয়েবার অবশ্য মনে করেন, পুরোপুরি এআই-নির্মিত অভিনেতাদের পক্ষে মানুষের আবেগের জটিলতা যথাযথভাবে প্রকাশ করা এখনো কঠিন।
তিনি বলেন, “এআই মডেলগুলো কোনো কিছুর বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে প্রশিক্ষিত হয়। যেমন, ছবি তৈরির মডেলগুলো ইন্টারনেটে থাকা ছবির পিক্সেল থেকে শেখে। প্রকৃত আবেগসম্পন্ন মানবিক অভিনয়ের পর্যায়ে পৌঁছাতে এখনো অনেক পথ বাকি।”
এই দৃষ্টিকোণ থেকে এআইয়ের অভিনয় মেথড অ্যাক্টিংয়ের প্রায় বিপরীত। মেথড অ্যাক্টিংয়ে অভিনেতারা চরিত্রের বাস্তবতা ফুটিয়ে তুলতে নিজেদের অভ্যন্তরীণ মনস্তত্ত্ব ও আবেগের গভীরে প্রবেশ করেন।
তবে এআইয়ের অভিনয় যে আরও বাস্তবসম্মত হয়ে উঠছে, সেটিও অস্বীকার করা যাচ্ছে না। এআই ভিডিও প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান হিগসফিল্ড দাবি করেছে, তারা কৃত্রিমভাবে তৈরি মানুষের মধ্যে অস্বস্তিকর সাদৃশ্যের যে প্রভাব দেখা যায়, সেই ‘আনক্যানি ভ্যালি’ সমস্যা অনেকটাই কাটিয়ে উঠেছে।
এই সমস্যা সাম্প্রতিক সময়ের অত্যাধুনিক কম্পিউটার-নির্মিত দৃশ্যেও দেখা গেছে। উদাহরণ হিসেবে ‘ইন্ডিয়ানা জোন্স অ্যান্ড দ্য ডায়াল অব ডেস্টিনি’ চলচ্চিত্রে বয়স কমিয়ে দেখানো ইন্ডিয়ানা জোন্সের চরিত্রের কথা উল্লেখ করা যায়।
হিগসফিল্ডের কনটেন্ট বিভাগের প্রধান আদিল আলিমঝানভ এআই চলচ্চিত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে বেশ আশাবাদী। এ বছর দুটি সম্পূর্ণ এআই-নির্মিত পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র প্রকাশের পর তিনি মনে করেন, এই প্রযুক্তি শিল্পীদের নতুন স্বাধীনতা দিচ্ছে এবং হলিউডের প্রচলিত ব্যয়বহুল নির্মাণপ্রক্রিয়া সংক্ষিপ্ত করছে।
অনলাইনে প্রকাশিত চলচ্চিত্র দুটি হলো ‘হেল গ্রাইন্ড’, ৯৫ মিনিটের একটি অ্যাকশন ফ্যান্টাসি এবং ‘দ্য কালি হিল বয়েজ’, ১১৫ মিনিটের একটি অপরাধনির্ভর কমেডি, যার নির্মাণশৈলীতে গাই রিচির প্রভাব রয়েছে। চিত্রনাট্য লেখার সময় বাদ দিলে প্রথমটির শুটিং ও পোস্ট-প্রোডাকশন দুই সপ্তাহে এবং দ্বিতীয়টির এক মাসের মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।
২৩ বছর বয়সী আলিমঝানভ ‘হেল গ্রাইন্ড’-এর প্রধান চরিত্রে নিজের মুখ ব্যবহার করেছেন। তার মতে, অভিনেতাদের আপত্তি থাকলেও প্রযুক্তির অগ্রগতি থামানো সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, “নতুন সরঞ্জামগুলো শিল্পকে বদলে দিচ্ছে বলে আমরা সেগুলোর বিরুদ্ধে লড়তে পারি না। প্রথম গাড়ি আবিষ্কারের সময় যদি আমরা তার বিরোধিতা করতাম, তাহলে আজও সবাই ঘোড়ায় চড়ত।”
এআই অভিনয়ের অগ্রগতি ও সীমাবদ্ধতা
‘হেল গ্রাইন্ড’ ও ‘দ্য কালি হিল বয়েজ’ মূলত হিগসফিল্ডের এআই কনটেন্ট তৈরির সরঞ্জামগুলোর সক্ষমতা প্রদর্শনের কাজও করছে। তবে দুটি চলচ্চিত্রেই কৃত্রিম অভিনয়ের অগ্রগতির পার্থক্য স্পষ্ট।
মে মাসে প্রকাশিত ‘হেল গ্রাইন্ড’-এ চরিত্রগুলো প্রতি ১৫ সেকেন্ডের দৃশ্যে মূলত একটি আবেগ প্রকাশ করছে বলে মনে হয়। ব্যবহৃত চীনা ভিডিও এআই মডেল সিড্যান্স ২.০-এর সীমাবদ্ধতা এর একটি কারণ।
তিন মাস পর প্রকাশিত ‘দ্য কালি হিল বয়েজ’ তুলনামূলকভাবে বেশি আকর্ষণীয়। এতে কথোপকথন অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য এবং কমেডির সময়জ্ঞানও যথেষ্ট কার্যকর।
চলচ্চিত্রটির তিন প্রধান পলাতক গ্রাইম র্যাপারের চরিত্রে ব্যবহার করা হয়েছে বাস্তব জীবনের স্ট্রিটবল খেলোয়াড় ম্যাট কিয়াটিপিস, মিক্সড মার্শাল আর্টস (এমএমএ) যোদ্ধা ইসরায়েল আদেসানিয়া এবং লাইভস্ট্রিমার এন৩ওনের এআই-নির্মিত প্রতিরূপ। এর মাধ্যমে হিগসফিল্ড তরুণ প্রজন্মের কাছে এআইনির্ভর স্বল্পদৈর্ঘ্য কনটেন্ট তৈরির সম্ভাবনা তুলে ধরছে।
তবে এআইয়ের যুগে ‘অভিনেতা’ ধারণাটিই নতুন প্রশ্নের মুখে পড়েছে। প্রতিটি চলচ্চিত্রের জন্য যদি আলাদাভাবে চরিত্র তৈরি করা যায়, তাহলে সেই চরিত্রে অভিনয়ের জন্য একজন মধ্যস্থতাকারী মানুষের প্রয়োজন কতটা- এ প্রশ্ন উঠছে।
টিম প্লানাগানের লেখা ‘দ্য কালি হিল বয়েজ’ ৩০ সেকেন্ডের বিভিন্ন অংশে নির্মিত হয়েছে। এ বছরের গ্রীষ্মে সিড্যান্স ২.৫ প্রকাশের ফলে এই প্রক্রিয়া সহজ হয়েছে।

তবে নাটকীয়ভাবে বিশ্বাসযোগ্য দৃশ্য তৈরি করতে এআইকে নির্দেশনা দেওয়ার কাজ এখনো বেশ শ্রমসাধ্য। প্রথমে চরিত্রগুলোর পূর্ণদেহের দৃশ্য ও মুখের ক্লোজআপসহ বিভিন্ন ভিজ্যুয়াল উপাদান তৈরি করা হয়। পরে ভিডিও তৈরির নির্দেশনায় সেগুলো ব্যবহার করা হয়, যাতে চরিত্রগুলোর চেহারা ও উপস্থিতির ধারাবাহিকতা বজায় থাকে।
এরপর প্রতিটি ৩০ সেকেন্ডের দৃশ্যের জন্য প্রায় ৪ হাজার শব্দের নির্দেশনা তৈরি করা হয়। এর কিছু অংশ একটি বৃহৎ ভাষা মডেল বা এলএলএমের সাহায্যে লেখা হয়। নির্দেশনায় চরিত্রের কাজ, ক্যামেরার গতিবিধি, আলোর বিন্যাস এবং আবেগ প্রকাশের ধরন নির্ধারণ করা থাকে।
প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দেশনা সংশোধন করে দৃশ্যটি বারবার তৈরি করা হয়, যতক্ষণ না নির্মাতারা কাঙ্ক্ষিত ফল পান এবং কৃত্রিম দৃশ্যের অস্বাভাবিকতা অনেকটাই কমে আসে।
এই প্রক্রিয়ায় এআই মডেলকে অনেকটা সুতোয় নিয়ন্ত্রিত পুতুলের মতো পরিচালনা করতে হয়। প্রতিটি অভিব্যক্তি ও অঙ্গভঙ্গির জন্য আলাদা নির্দেশনা দিতে হয়।
উদাহরণ হিসেবে অভিনেতা ক্লাউস কিনস্কির কথা বলা যায়। তিনি চরিত্রের ভেতরের দ্বন্দ্ব ও ক্রোধকে অভিনয়ের মাধ্যমে তীব্রভাবে প্রকাশ করতে পারতেন। কিন্তু এআই প্রোগ্রামারকে একই ধরনের প্রভাব তৈরির জন্য অনেক বেশি অনুমাননির্ভর পদ্ধতি ব্যবহার করতে হয়।
‘গসিপ গবলিন’ নামে এআই-নির্মিত সায়েন্স ফিকশন স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র তৈরি করেন জ্যাক লন্ডন। তিনি বলেন, “এআই তো আর অভিনেতা নয়। তাহলে একটি চরিত্রের ভেতরের অবস্থা আপনি কীভাবে বোঝাবেন?”
তার মতে, নির্মাতারা বলতে পারেন চরিত্রটি বিভ্রান্ত, ঠাট্টা করছে কিংবা কঠোরভাবে কথা বলছে। কিন্তু এগুলো খুবই সাধারণ নির্দেশনা। এর ফলে মডেলটি অতিরঞ্জিত টেলিনোভেলা-ধাঁচের অভিনয় করতে পারে অথবা প্রয়োজনীয় আবেগ প্রকাশেই ব্যর্থ হতে পারে।
লন্ডন বলেন, “একপর্যায়ে মডেলটিকে মেরিওনেট পুতুলের মতো বিবেচনা করতে হয় এবং এর প্রতিটি সুতোয় আলাদাভাবে সূক্ষ্ম সমন্বয় করতে হয়।”
তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, নির্দেশনায় এমনও উল্লেখ করতে হয় যে চরিত্রটির ঠোঁটের বাঁ পাশে সামান্য কাঁপুনি দেখা দেবে, তার দৃষ্টি একটু নিচে নামবে এবং এরপর সে আবার ওপরে তাকিয়ে পলক ফেলবে।
লন্ডন প্রথমে প্রকৃত অভিনেতাদের দিয়ে সংলাপ রেকর্ড করেন। এরপর সেই সংলাপকে কেন্দ্র করে অ্যানিমেশন তৈরি করেন, যাতে নির্মাণপ্রক্রিয়ায় মানুষের উপস্থিতির কিছুটা ছাপ থাকে।
বর্তমান এআই পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে তিনি খোলামেলা। তার মতে, এই প্রযুক্তিতে অ্যান্থনি হপকিন্স বা অলিভিয়া কোলম্যানের মতো অভিনেতাদের সূক্ষ্ম অভিনয় তৈরি করা কঠিন। বরং টেরি গিলিয়াম বা গাই রিচির চলচ্চিত্রের মতো অতিরঞ্জিত ও প্রাণবন্ত চরিত্র তৈরিতে এটি বেশি কার্যকর হতে পারে।
কিন্তু এখানেই মানব অভিনেতাদের জন্য ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। অনেক বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রে আবেগের সরল ও সহজবোধ্য প্রকাশ দেখা যায়। এ ধরনের অভিনয় যদি নির্দিষ্ট কিছু অভিব্যক্তির পুনরাবৃত্তির ওপর নির্ভর করে, তাহলে তা এআই দিয়ে অনুকরণ করা তুলনামূলকভাবে সহজ হতে পারে।
তবে বড় বাজেটের চলচ্চিত্রেও এমন কিছু মুহূর্ত থাকে, যা কেবল নির্দিষ্ট অভিব্যক্তি অনুকরণ করে তৈরি করা কঠিন।
ওয়ান্ডার ডায়নামিক্সের সহপ্রতিষ্ঠাতা টাই শেরিডান বলেন, “কখনো কখনো সবচেয়ে অসাধারণ মুহূর্তটি ঘটে এক সেকেন্ডের ক্ষুদ্রতম ভগ্নাংশে। একজন অভিনেতা কেন একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টিতে তাকান, তা আপনি সব সময় ব্যাখ্যা করতে পারবেন না।”
শেরিডান এ বিষয়ে অভিজ্ঞ। তিনি স্টিভেন স্পিলবার্গের ২০১৮ সালের চলচ্চিত্র ‘রেডি প্লেয়ার ওয়ান’-এ অভিনয় করেছিলেন। চলচ্চিত্রটি বাস্তব ও ডিজিটাল জগতের সীমারেখা নিয়ে কাজ করেছে।
মানব অভিনয় ও এআইয়ের সমন্বিত ভবিষ্যৎ
শেরিডান মনে করেন, এআইনির্ভর পদ্ধতি চলচ্চিত্র নির্মাণকে আরও সহজলভ্য করতে পারে। তবে অভিনয়ের কেন্দ্রে মানুষের উপস্থিতি থাকা উচিত বলে তিনি মনে করেন।
তার প্রতিষ্ঠান ফ্লো স্টুডিও মোশন ক্যাপচারের উন্নত ও তুলনামূলকভাবে কম ব্যয়বহুল পদ্ধতিতে এআই ব্যবহার করে। এতে ধারণ করা ফুটেজের ওপর কম্পিউটার-নির্মিত চরিত্র ও পরিবেশের স্তর যুক্ত করা যায়।
অন্যদিকে ফ্রেমস্টোরের টিম ওয়েবারও একই ধরনের এআই সরঞ্জাম নিয়ে কাজ করছেন। তার লক্ষ্য হলো, জেনারেটিভ নির্দেশনার ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে প্রচলিত অভিনয়ের ওপর ‘ডিজিটাল মেকআপ’ প্রয়োগ করা।
ওয়েবার, লন্ডন ও শেরিডান- তিনজনই মনে করেন, চলচ্চিত্র নির্মাণে মানব ও কৃত্রিম প্রযুক্তির সমন্বিত পদ্ধতি অভিনেতাদের সৃজনশীল সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ বজায় রাখতে পারে।
শেরিডান প্রশ্ন তোলেন, “এই জেনারেটিভ মডেলগুলো কি সত্যিই কিংবদন্তিতুল্য অভিনয় তৈরি করার জন্য, নাকি গড়পড়তা কিছু উপস্থাপনের জন্য তৈরি?”
তবে আলিমঝানভের বিশ্বাস, এআইয়ের সাহায্যে অভিনেতার অভ্যন্তরীণ আবেগপ্রক্রিয়ার মতো কিছু তৈরি করা সম্ভব। ‘দ্য কালি হিল বয়েজ’-এ ব্যবহৃত নির্দেশনা আগের পদ্ধতি থেকে কিছুটা আলাদা ছিল। সেখানে শুধু শারীরিক অঙ্গভঙ্গি নির্দিষ্ট করে আবেগ ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়নি। বরং চরিত্রগুলোর অভিজ্ঞতা ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির তথ্য ব্যবহার করে দৃশ্য তৈরি করা হয়েছে।
এআই অভিনয়ের এই দুই ধারার মধ্যে মূল পার্থক্যটি হলো, একটি পদ্ধতি প্রযুক্তিগতভাবে অভিব্যক্তি পুনর্নির্মাণে গুরুত্ব দেয়, অন্যটি মানুষের অভিজ্ঞতা ও আবেগকে কেন্দ্র করে কাজ করতে চায়।
এই বিতর্ক অভিনয়শিল্পের দীর্ঘদিনের একটি দ্বন্দ্বকে নতুন করে সামনে এনেছে: বাহ্যিক অভিব্যক্তি বনাম অভ্যন্তরীণ অনুভূতি, পুনরুৎপাদন বনাম বাস্তব অভিজ্ঞতা।
লরেন্স অলিভিয়ের একসময় ডাস্টিন হফম্যানকে বলেছিলেন, ৭২ ঘণ্টা জেগে থাকার বদলে তার ‘অভিনয় করে দেখা উচিত, প্রিয় বালক’। এই মন্তব্যে অভিনয় নিয়ে দুটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির সংঘাত স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
কনস্তানতিন স্তানিস্লাভস্কি অভিনয়কে আরও বাস্তবসম্মত করতে চরিত্রের অভ্যন্তরীণ মনস্তত্ত্ব অনুসন্ধানের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। কিন্তু এখন প্রথমবারের মতো এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে আবেগের বাহ্যিক প্রকাশ কৃত্রিমভাবে পুনর্নির্মাণের প্রযুক্তিগত পদ্ধতিই ভবিষ্যতের পথ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ডিজিটাল জগতের আরও বিস্তৃত ব্যবহার উইলিয়াম গিবসনের ১৯৯৬ সালের উপন্যাস ‘ইডোরু’-এর মতো কল্পনার বাস্তব রূপ দিতে পারে। সেখানে অমর ভার্চুয়াল তারকারা মানুষের মনোযোগ ও জনপ্রিয়তা অর্জন করে।
তবে এআই চলচ্চিত্রের জন্য বক্স অফিসে যথেষ্ট চাহিদা তৈরি হবে কি না এবং এই শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ভিত্তি কতটা শক্তিশালী হবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়।
এখনো এমন কোনো আকর্ষণীয় চিত্রনাট্য সামনে আসেনি, যা গল্পের মাধ্যমে এআই প্রযুক্তির সম্ভাবনাকে সেই মাত্রায় তুলে ধরতে পেরেছে, যেভাবে ‘দ্য ম্যাট্রিক্স’ কম্পিউটার-নির্মিত দৃশ্যের সম্ভাবনাকে জনপ্রিয় করে তুলেছিল।
যদি দর্শক নিম্নমানের ও একঘেয়ে এআই-নির্মিত চলচ্চিত্রে ভরে যাওয়া অনলাইন জগতের মুখোমুখি হন, তাহলে ‘টুম্বস্টোন’ চলচ্চিত্রে ডক হলিডের চরিত্রে ভ্যাল কিলমারের বলা একটি সংলাপ নতুন অর্থ পেতে পারে।
সেখানে তিনি বলেন, “ওর মধ্যে কিছু একটা আছে। চোখের চারপাশের কিছু একটা আমাকে আমার নিজের কথা মনে করিয়ে দেয়। আমি নিশ্চিত – আমি ওকে ঘৃণা করি।”
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

