চারদিকে হাড়কাঁপানো শীত। ১৯১০ সালের ১০ নভেম্বরের গভীর রাত। রাশিয়ার ইয়াসনায়া পলিয়ানা এস্টেটের নীরবতা ভেঙে ৮২ বছরের এক বৃদ্ধ নিঃশব্দে ঘর ছাড়লেন। সঙ্গে ছিল না কোনো জাঁকজমক, ছিল না দেহরক্ষী কিংবা অনুচরবর্গ। সামান্য কিছু জিনিসপত্র নিয়েই তিনি বেরিয়ে পড়লেন অনিশ্চিত এক যাত্রায়।
এই বৃদ্ধ আর কেউ নন—বিশ্বসাহিত্যের কিংবদন্তি লিও তলস্তয়। স্ত্রী, সন্তান ও সাজানো সংসার ফেলে কেন মাঝরাতে চোরের মতো পালিয়ে যেতে হলো এই মহীরুহকে? কেনই বা এর মাত্র ১০ দিন পর এক অখ্যাত রেলওয়ে স্টেশনে তাঁকে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করতে হলো?
তলস্তয়ের এই ‘পালিয়ে যাওয়া’ কোনো সাময়িক আবেগের সিদ্ধান্ত ছিল না। এর পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের মানসিক যন্ত্রণা, আদর্শিক লড়াই এবং গভীর নিঃসঙ্গতা। তিনি এমন একটি জীবন চেয়েছিলেন, যা তাঁর দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কিন্তু আভিজাত্য, পরিবার ও খ্যাতির শেকল তাঁকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছিল।
তলস্তয় ছিলেন যশ ও খ্যাতির বন্দিশালায় এক নিঃসঙ্গ সম্রাট। জীবনের শেষ দিনগুলোতে তিনি যেভাবে বাঁচতে চেয়েছিলেন, সেভাবে বাঁচতে পারছিলেন না। তিনি সাধারণ মানুষের মতো সাদামাটা জীবন কাটাতে চেয়েছিলেন। আভিজাত্যের চাকচিক্য ছেড়ে কোনো নিভৃত প্রান্তে মাটির মানুষের সঙ্গে মিশে যেতে চেয়েছিলেন। নিজের শ্রমে অন্ন সংস্থান, নিরিবিলি আলাপচারিতা এবং ঈশ্বরের সান্নিধ্যে শান্তিতে দিন কাটানোই ছিল তাঁর স্বপ্ন।
কিন্তু ভাগ্যের পরিহাস ছিল, জন্মসূত্রে তিনি একজন অভিজাত জমিদার আর কর্মগুণে হয়ে উঠেছিলেন বিশ্বখ্যাত লেখক। এই দুই পরিচয়ের টানাপোড়েন তাঁকে কখনো স্বস্তি দেয়নি।
সেই সময়ে তলস্তয় ছিলেন বর্তমান সময়ের পরিভাষায় প্রথম সারির ‘গ্লোবাল সেলিব্রিটি’। তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়ে উঠত। তাঁর একটি হাঁচির খবরও সাংবাদিকেরা সংগ্রহ করতেন। ইয়াসনায়া পলিয়ানায় তাঁর বাড়ির সামনে সবসময় ভিড় লেগে থাকত। কেউ আসতেন সাহায্যের আশায়, কেউ একপলক তাঁকে দেখতে, আবার কেউ নিছক কৌতূহল থেকে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসত বস্তা বস্তা চিঠি। তলস্তয়-গবেষকদের মতে, এই অতি-জনপ্রিয়তা তাঁর ব্যক্তিগত জীবনকে বিষিয়ে তুলেছিল।
সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি ছিল তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের আচরণ। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব এমনকি অনুসারীরাও তাঁকে শান্তিতে থাকতে দিতেন না। সবাই যেন তাঁর জীবনের ওপর নিজেদের মালিকানা দাবি করতেন। তাঁর আধ্যাত্মিক সংকট, শারীরিক অসুস্থতা কিংবা স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়া—সবই জনসমক্ষে চলে আসত। কাছের মানুষরা নিজেদের ডায়েরিতে তলস্তয়ের ব্যক্তিগত জীবনের খুঁটিনাটি লিখে রাখতেন এবং সেগুলো একে অপরকে পড়ে শোনাতেন। নিজের বাড়িতেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন জনাকীর্ণ খাঁচার বন্দি পাখি।
আদর্শের সঙ্গে জীবনের সংঘাত
১৮৮১ সালের পর তলস্তয়ের জীবনদর্শনে আমূল পরিবর্তন আসে। তিনি ভোগবাদী জীবন এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তির মোহ ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেন। সমাজ ও ধর্মের প্রচলিত কাঠামোর প্রতিও তাঁর বিতৃষ্ণা তৈরি হয়। ১৮৯৪ সালে তিনি তাঁর জমিদারি এবং নিজের বই থেকে অর্জিত সমস্ত রয়্যালটি বা আয় ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণা দেন।
কিন্তু সমস্যা দেখা দিল পরিবার নিয়ে। তলস্তয় যখন নিজের আরাম-আয়েশ ছেড়ে সাধারণ কৃষকের মতো জীবনযাপন করতে চাইছেন, তখন তাঁর পরিবার সেই বিলাসিতা ছাড়তে নারাজ। নিজের ডায়েরিতে তিনি লিখেছিলেন, “চারপাশে এত দারিদ্র্য, আর আমি বাস করছি এক বিলাসবহুল প্রাসাদে যেখানে ডিনার টেবিলে ভৃত্যরা খাবার পরিবেশন করে—এ এক অসহ্য যন্ত্রণা।”
এই নৈতিক দহন তাঁকে প্রতিনিয়ত কুরে কুরে খাচ্ছিল। তিনি নিজেকে অপরাধী মনে করতেন। তাঁর মনে হতো, তিনি যা প্রচার করছেন, নিজে তা পালন করতে পারছেন না।
তবে তলস্তয়কে সবচেয়ে বেশি মানসিকভাবে ভেঙে দিয়েছিল তাঁর স্ত্রী সোফিয়া আন্দ্রেয়েভনা এবং তাঁর প্রধান সহযোগী ভ্লাদিমির চের্তকভের মধ্যকার বিরোধ। তলস্তয়ের মৃত্যুর আগেই তাঁর পাণ্ডুলিপি এবং সৃজনশীল কাজের উত্তরাধিকার নিয়ে যেন এক যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছিল।
তলস্তয়ের স্ত্রী সোফিয়া চাইতেন সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে সমস্ত সম্পত্তির অধিকার নিজের কাছে রাখতে। অন্যদিকে চের্তকভ চাইতেন তলস্তয়ের সমস্ত কাজ উন্মুক্ত করে দিতে, যাতে সাধারণ মানুষ বিনামূল্যে তাঁর বই পড়তে পারে। এই দুই মেরুর মাঝখানে পড়ে পিষ্ট হচ্ছিলেন বৃদ্ধ তলস্তয়।
পরিবারের সদস্যরা এমন আচরণ শুরু করেছিলেন যেন তলস্তয় ইতোমধ্যেই মৃত। তাঁরা তাঁর ডায়েরি চুরি করা, কাটছাঁট করা কিংবা লুকানোর প্রতিযোগিতায় নেমেছিলেন।
তলস্তয় ছিলেন নরম স্বভাবের মানুষ। কখনো স্ত্রীর চাপে বন্ধুর সঙ্গে দেখা করা বন্ধ করতেন, আবার বন্ধুর চাপে স্ত্রীর অগোচরে গোপনে উইল লিখে রাখতেন। এই দ্বিমুখী জীবন তাঁর মতো সত্যনিষ্ঠ মানুষের পক্ষে বয়ে বেড়ানো অসম্ভব হয়ে উঠেছিল। তিনি নিজেকে ক্ষমা করতে পারছিলেন না, আবার প্রিয়জনদের এই ঝগড়া থামানোর শক্তিও তাঁর ছিল না।
সোফিয়া কি সত্যিই খলনায়িকা ছিলেন?
তলস্তয়ের ঘর ছাড়ার পেছনে সোফিয়া আন্দ্রেয়েভনাকে অনেক সময় ‘খলনায়িকা’ হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু তাঁর দিকটিও তলস্তয় সহমর্মিতার সঙ্গে বিচার করতেন।
১৯ বার গর্ভধারণ এবং ১৩ জন সন্তানের জননী সোফিয়াকে পোহাতে হয়েছিল অকল্পনীয় কষ্ট। তাঁর ছয়টি সন্তান শৈশবেই মারা যায়। একজন খামখেয়ালি প্রতিভাধর মানুষের সঙ্গে সংসার করা, বিশাল পরিবার সামলানো এবং স্বামীর অবাস্তব আবদার সহ্য করা সহজ ছিল না।
শেষ বয়সে এসে সোফিয়া মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিলেন। স্বামীর প্রতি তাঁর অতিরিক্ত অধিকারবোধ এবং সন্দেহপ্রবণতা শেষ পর্যন্ত তলস্তয়কে বাড়ি ছাড়ার দিকে ঠেলে দেয়।
শেষ যাত্রার শুরু
সেই রাতে বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় তলস্তয় সঙ্গে নিয়েছিলেন তাঁর বিশ্বস্ত চিকিৎসক মাকোভিৎস্কিকে। তিনি চেয়েছিলেন কোনো মঠে কিংবা নিভৃত গ্রামে সাধারণ মানুষের ভিড়ে মিশে যেতে। নিজের পরিচয় গোপন রাখতে চিঠিপত্রে ছদ্মনাম ব্যবহারেরও পরিকল্পনা করেছিলেন।
কিন্তু নিয়তি ছিল অন্যরকম।
বাড়ি ছাড়ার পর তিনি শামোর্দিনো মঠে তাঁর বোন মারিয়ার কাছে যান। সেখানেও শান্তি মেলেনি। সংবাদপত্রের প্রতিনিধিরা তাঁর পিছু নিয়েছিলেন। সেখান থেকে তিনি ওডেসা হয়ে কনস্টান্টিনোপল যাওয়ার কথা ভেবেছিলেন। কিন্তু ট্রেনযাত্রার মধ্যেই ঠান্ডা লেগে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁর নিউমোনিয়া ধরা পড়ে।
অসুস্থ শরীরে তিনি আস্তাপোভো নামে একটি অখ্যাত রেলওয়ে স্টেশনে নামতে বাধ্য হন। স্টেশন মাস্টারের ছোট্ট ঘরে তাঁর চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়।
এরপর খবর ছড়িয়ে পড়ল দাবানলের মতো। সারা রাশিয়ার চোখ তখন সেই ছোট্ট স্টেশনের দিকে। যে একাকিত্বের খোঁজে তিনি ঘর ছেড়েছিলেন, মৃত্যুর সময়ও তা জুটল না। ক্যামেরার লেন্স এবং সাংবাদিকদের ভিড় স্টেশনের বাইরে সারাক্ষণ অপেক্ষা করছিল।
বিছানায় শুয়ে তলস্তয় শুধু একটিই প্রার্থনা করছিলেন—তাঁকে যেন একা থাকতে দেওয়া হয়। তিনি কোনো ওষুধ খেতে চাইছিলেন না, চাইছিলেন না মরফিন নিতে। শুধু চেয়েছিলেন শান্তিতে চলে যেতে।
এমনকি তাঁর শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী, স্ত্রীকে তাঁর কামরায় ঢুকতে দেওয়া হয়নি যতক্ষণ না তিনি কোমায় চলে গিয়েছিলেন।
মৃত্যুর মধ্যেও অধরা ছিল একাকিত্ব
১৯১০ সালের ২০ নভেম্বর সেই ছোট স্টেশন মাস্টারের ঘরেই ইতিহাসের মহানায়কের জীবনাবসান ঘটে।
মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তিনি হয়তো সেই মুক্তি খুঁজে পেয়েছিলেন, যা জীবদ্দশায় শত চেষ্টা করেও পাননি। যে মানুষটি সারা জীবন সত্য, সরলতা ও আত্মিক স্বাধীনতার সন্ধান করেছিলেন, তাঁর শেষ যাত্রাটিও শেষ পর্যন্ত পরিণত হয়েছিল মানুষের কৌতূহল, সংবাদমাধ্যমের ভিড় এবং পারিবারিক দ্বন্দ্বের কেন্দ্রে।
আজও ইয়াসনায়া পলিয়ানার সেই শূন্য ঘর আর আস্তাপোভো স্টেশনের দেয়ালগুলো যেন সেই রাতের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর তলস্তয়ের জীবন আমাদের সামনে রেখে যায় এক গভীর প্রশ্ন—খ্যাতি, সম্পদ ও মানুষের ভালোবাসা পাওয়ার পরও যদি একজন মানুষ নিজের মতো করে বাঁচতে না পারেন, তবে সেই জীবনের স্বাধীনতা আসলে কোথায়?
তথ্যসূত্র: গেইটওয়ে টু রাশিয়া

