ভারতের ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে বাঘা যতীন এমন এক নাম, যার সঙ্গে সাহস, আত্মত্যাগ ও সশস্ত্র বিপ্লবের স্মৃতি গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। তাঁর প্রকৃত নাম যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। ১৮৭৯ সালের ৭ ডিসেম্বর কুষ্টিয়ার কয়াগ্রামে তাঁর জন্ম। মাত্র ৩৫ বছরের জীবনে তিনি ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী আন্দোলনে এমন ভূমিকা রেখে যান যে মৃত্যুর পরও তাঁর নাম হয়ে ওঠে বাঙালির বিপ্লবী চেতনার এক শক্তিশালী প্রতীক।
যতীন্দ্রনাথ ছিলেন শক্ত-সমর্থ, নির্ভীক ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন এক যুবক। প্রবেশিকা পরীক্ষা পাস করার পর তিনি সাঁটলিপি ও টাইপ শেখেন এবং বেঙ্গল সরকারের স্টেনোগ্রাফার হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন। চাকরিজীবনে দক্ষ ও পরিশ্রমী কর্মচারী হিসেবে পরিচিত হলেও তাঁর ভেতরে তখন অন্য এক আকাঙ্ক্ষা ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠছিল—পরাধীন দেশকে মুক্ত করার আকাঙ্ক্ষা। জাতীয়তাবোধ তাঁকে সরকারি চাকরির নিরাপদ জীবন থেকে ধীরে ধীরে বিপ্লবের কঠিন পথে নিয়ে যায়।
ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সশ*স্ত্র সংগ্রামে যতীন যুক্ত হন এবং বাংলার প্রধান বিপ্লবী সংগঠন যুগান্তর দলের অন্যতম প্রধান নেতা হয়ে ওঠেন। তাঁর কাছে স্বাধীনতা ছিল কেবল রাজনৈতিক দাবি নয়; তা ছিল আত্মমর্যাদার প্রশ্ন। বিপ্লবীদের সংগঠিত করা, অ*স্ত্র সংগ্রহ এবং ব্রিটিশবিরোধী কর্মকাণ্ড পরিচালনায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর নেতৃত্বে বিপ্লবী আন্দোলন আরও সুসংগঠিত রূপ লাভ করে।
যতীনের বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী অধ্যায়গুলোর একটি ছিল প্রথম বিশ্বযু*দ্ধকে কেন্দ্র করে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে বৃহত্তর সশ*স্ত্র অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা। যুদ্ধের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ব্রিটিশ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বি*দ্রোহ ঘটানোর পরিকল্পনা করা হয়। এই পরিকল্পনার সঙ্গে জার্মানির কাছ থেকে অস্ত্র ও রসদ সংগ্রহের প্রচেষ্টাও যুক্ত ছিল। কলকাতায় জার্মান যুবরাজের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে যতীন অ*স্ত্র ও রসদের প্রতিশ্রুতি অর্জন করেছিলেন। এই বৃহৎ পরিকল্পনাই পরবর্তীকালে ‘জার্মান প্লট’ নামে পরিচিত হয়।
তাঁর বিপ্লবী জীবন ছিল কেবল গোপন সংগঠন ও পরিকল্পনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ব্যক্তিগত সাহস ও শারীরিক সক্ষমতার জন্যও তিনি কিংবদন্তিতে পরিণত হন। বাঘের সঙ্গে লড়াইয়ের ঘটনার সূত্রেই তাঁর নামের সঙ্গে যুক্ত হয় ‘বাঘা’ উপাধি। এই উপাধি পরে তাঁর ব্যক্তিত্বেরই প্রতীক হয়ে ওঠে—একজন এমন মানুষ, যিনি বিপদের সামনে পিছিয়ে যাওয়ার বদলে তাকে মোকাবিলা করতেন।
ব্রিটিশ সরকারও তাঁকে বিপজ্জনক বিপ্লবী হিসেবে বিবেচনা করত। পুলিশি নজরদারি এড়িয়ে সংগঠন পরিচালনা, বিপ্লবীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং অ*স্ত্র সংগ্রহের মতো কর্মকাণ্ডে তিনি দক্ষতার পরিচয় দেন। তাঁর জীবনকাহিনিতে যেমন সাহসের গল্প আছে, তেমনি আছে সংগঠন, কৌশল ও আত্মসংযমের ইতিহাস।
১৯১৫ সালে তাঁর বিপ্লবী জীবনের শেষ অধ্যায় শুরু হয়। ব্রিটিশ পুলিশের সঙ্গে সংঘ*র্ষের এক পর্যায়ে যতীন ও তাঁর সঙ্গীরা উড়িষ্যার বালেশ্বর অঞ্চলে আশ্রয় নেন। সেখানে বুড়ি বালামের তীরে ব্রিটিশ বাহিনীর সঙ্গে তাঁদের সম্মুখযু*দ্ধ হয়। সীমিত অ*স্ত্র ও বিপর্যস্ত পরিস্থিতিতেও তাঁরা প্রতিরোধ চালিয়ে যান। সেই যু*দ্ধে যতীন গুরুতর আহ*ত হন। পরে বালাসোর হাসপাতালে তাঁর মৃ*ত্যু হয়।
১৯১৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর, মাত্র ৩৫ বছর বয়সে বাঘা যতীনের জীবন শেষ হয়। কিন্তু তাঁর মৃত্যু বিপ্লবী আন্দোলনের ইতিহাসে তাঁকে আরও স্থায়ী করে তোলে। তাঁর শেষ লড়াই হয়ে ওঠে আত্মত্যাগ ও প্রতিরোধের এক স্মরণীয় অধ্যায়। এই বিপ্লবীর প্রয়াণদিবসে আমাদের শ্রদ্ধা।
সূত্র: face book

