বাংলাদেশে ক্রিকেট কেবল একটি খেলা নয়, এটি প্রায় ১৭/১৮ কোটি মানুষের আবেগ, জাতীয় গর্ব এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের পরিচয়ের প্রধানতম মাধ্যম। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মাঠের ছক্কার চেয়ে বিসিবির এসি রুমের রাজনৈতিক সমীকরণগুলোই বেশি শিরোনাম হচ্ছে।
২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত বিসিবিতে যে ধরনের অস্থিরতা দেখা গেছে, তা কেবল নজিরবিহীনই নয়, বরং দেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যৎকে এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
প্রশ্ন উঠছে, কেন বিসিবিকে নিয়ে এই কামড়াকামড়ি? কেন রাজনীতির বিষবাষ্প বারবার গ্রাস করছে দেশের ক্রিকেটকে?
নেতৃত্বের ‘মিউজিক্যাল চেয়ার’ এবং ক্রান্তিকালীন ঘটনাক্রম
বিসিবির ইতিহাসে গত দেড় বছর ছিল সবচেয়ে নাটকীয়। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নাজমুল হাসান পাপনের দীর্ঘ এক দশকের একাধিপত্য শেষ হলে শুরু হয় নতুন ক্ষমতার দ্বন্দ।
- ফারুক আহমেদ: সংস্কারের স্বপ্ন ও হোঁচট (আগস্ট ২০২৪ – মে ২০২৫): ২০২৪ সালের ২১ আগস্ট বিসিবির দায়িত্ব নেন সাবেক অধিনায়ক ফারুক আহমেদ। মূলত জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের (এনএসসি) মনোনয়নে তিনি নাজমুল হাসান পাপনের স্থলাভিষিক্ত হন। ফারুকের আগমনে ক্রিকেট অঙ্গনে স্বচ্ছতার আশা জাগলেও বাস্তব চিত্র ছিল ভিন্ন। বোর্ড পরিচালকদের বড় একটি অংশ, যারা আগের প্রশাসনের অনুসারী ছিলেন, তাদের সাথে ফারুকের শুরু থেকেই দূরত্ব তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত বিপিএল আয়োজন নিয়ে মতপার্থক্য এবং বোর্ড পরিচালকদের অনাস্থা ভোটে ২০২৫ সালের ২৯ মে তিনি সরে যেতে বাধ্য হন।
- আমিনুল ইসলাম বুলবুল: নির্বাচন ও বিতর্কের তুঙ্গে (মে ২০২৫ – এপ্রিল ২০২৬): ফারুকের বিদায়ের পর ৩০ মে দায়িত্ব নেন আরেক সাবেক অধিনায়ক আমিনুল ইসলাম বুলবুল। তার সময়ে বিসিবি একটি বহুল আলোচিত নির্বাচনের আয়োজন করে। আমিনুল ইসলাম বুলবুল নিজেকে নির্বাচিত সভাপতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলেও সেই নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে এনএসসি। ভোটার তালিকায় নামমাত্র ক্লাব প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্তি এবং প্রভাব খাটানোর অভিযোগে উচ্চ আদালতে রিট হয়। গত বিসিবি নির্বাচনে অনিয়মের দায়ে শেষ পর্যন্ত তার নেতৃত্বাধীন পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়ার নির্দেশ দেয় এনএসসি।
- তামিম ইকবাল: অ্যাডহক কমিটির নতুন কাপ্তান (৭ এপ্রিল ২০২৬ – বর্তমান): আমিনুল ইসলামের কমিটি ভেঙে দেওয়ার পর ৭ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে সবাইকে চমকে দিয়ে দেশের ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা ওপেনার তামিম ইকবালকে অ্যাডহক কমিটির সভাপতি করা হয়। তামিমের নিয়োগকে কেউ কেউ ‘ক্রিকেটীয় সংস্কার’ হিসেবে দেখলেও তার কমিটির রাজনৈতিক গঠন নিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। ১১ সদস্যের এই কমিটিতে রাজনৈতিক প্রভাবের ছায়া স্পষ্ট বলে দাবি করছেন অনেক ক্রীড়া বিশ্লেষক।
বিসিবি নিয়ে কেন এই মরণপণ লড়াই?
বিসিবি কেন রাজনীতিকদের কাছে এতো প্রিয়? এর উত্তর লুকিয়ে আছে এর গঠনতন্ত্র এবং আলিশান কোষাগারে।
- অর্থের পাহাড় ও রিজার্ভের নিয়ন্ত্রণ—বিসিবি বাংলাদেশের সবচেয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং ধনী ক্রীড়া সংস্থা। আইসিসির লভ্যাংশ, বিপিএলের স্বত্ব বিক্রি, টেলিভিশন ব্রডকাস্টিং রাইটস এবং বিশাল স্পনসরশিপ চুক্তি থেকে প্রতি বছর বিসিবির তহবিলে যোগ হয় শত শত কোটি টাকা। বর্তমান হিসাব অনুযায়ী, বিসিবির ফিক্সড ডিপোজিট ও রিজার্ভের পরিমাণ কয়েক হাজার কোটি টাকা। এই বিশাল অংকের অর্থের নিয়ন্ত্রণ যার হাতে থাকে, ক্রীড়াঙ্গনে তার প্রভাব থাকে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা ছাড়া এই আর্থিক গুরুত্ব অনিবার্যভাবে রাজনৈতিক আগ্রহ তৈরি করে।(২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসের শেষের দিকের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) ফিক্সড ডিপোজিট (FDR) ও রিজার্ভের মোট পরিমাণ প্রায় ১,৩৯৮ কোটি টাকা)
- রাজনৈতিক সামাজিকীকরণ ও প্রভাব—বিসিবি সভাপতি বা পরিচালক হওয়া কেবল একটি প্রশাসনিক পদ নয়, এটি একটি সামাজিক স্ট্যাটাস। বিশ্ব ক্রিকেটের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে (আইসিসি) বসার সুযোগ পাওয়ায় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা একে তাদের ক্ষমতার প্রদর্শনী হিসেবে দেখেন। এছাড়া দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক পরিবারগুলোর সরাসরি সম্পৃক্ততা বিসিবিকে একটি ‘পাওয়ার হাউস’-এ পরিণত করেছে।
- ভোটার কাঠামো ও ক্লাবের নিয়ন্ত্রণ—বিসিবির নির্বাচনে মূলত ঢাকার প্রিমিয়ার ডিভিশন, প্রথম বিভাগ এবং আঞ্চলিক ক্রিকেট সংস্থার কাউন্সিলররা ভোট দেন। এই কাউন্সিলরদের বড় অংশই স্থানীয় বা জাতীয় রাজনীতির সাথে যুক্ত। রাজনৈতিক দলগুলো তাদের অনুসারীদের কাউন্সিলর বানিয়ে ভোটের মাঠ নিজেদের দখলে রাখে। ফলে যে দল যখন ক্ষমতায় আসে বা প্রভাবশালী হয়, তারা বিসিবিকে তাদের ‘এক্সটেন্ডেড অফিস’ হিসেবে ব্যবহার করতে চায়।
বর্তমান সংকট: আইসিসির নিষেধাজ্ঞার হুমকি
বিসিবিতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের এই ধারাবাহিকতা এখন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিপদের ঘণ্টা বাজাচ্ছে। আইসিসির গঠনতন্ত্রের ২.৪ (ডি) ধারা অনুযায়ী, কোনো দেশের ক্রিকেট বোর্ডে সরকারি বা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ সরাসরি নিষিদ্ধ।
আমিনুল ইসলামের চিঠির প্রভাব: বিদায়ী সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল আইসিসিকে জানিয়েছেন যে, তার নির্বাচিত কমিটিকে অনৈতিকভাবে ভেঙে দেওয়া হয়েছে। যদি আইসিসি একে ‘অযাচিত সরকারি হস্তক্ষেপ’ হিসেবে গণ্য করে, তবে শ্রীলঙ্কা বা জিম্বাবুয়ের মতো বাংলাদেশকেও বহিষ্কার করতে পারে।
অ্যাডহক কমিটির বৈধতা: তামিম ইকবালের কমিটি যদি ৯০ দিনের মধ্যে একটি স্বচ্ছ নির্বাচন দিতে ব্যর্থ হয়, তবে বিসিবি দীর্ঘমেয়াদী সংকটে পড়বে।
ঘরোয়া ক্রিকেটে রক্তক্ষরণ ও ক্লাব বয়কট
বিসিবির এই নোংরা রাজনীতির সবচেয়ে বড় শিকার ঘরোয়া ক্রিকেট। বর্তমান অ্যাডহক কমিটিকে ‘রাজনৈতিক’ তকমা দিয়ে ঢাকার ৪৪টি ক্লাব লিগ বয়কট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে প্রিমিয়ার লিগ ও প্রথম বিভাগ ক্রিকেট অনিশ্চয়তায় পড়েছে। ঘরোয়া ক্রিকেট বন্ধ থাকা মানে তরুণ ক্রিকেটারদের আয়ের পথ বন্ধ হওয়া এবং জাতীয় দলের পাইপলাইন শুকিয়ে যাওয়া।
সংস্কার নাকি কেবল ক্ষমতার হাতবদল?
তামিম ইকবালের সামনে এখন অগ্নিপরীক্ষা। তিনি কি পারবেন বিসিবিকে রাজনীতির হাত থেকে মুক্ত করে একটি পেশাদার কাঠামো দিতে? নাকি তিনিও আগের সভাপতিদের মতো কোনো রাজনৈতিক শক্তির ‘অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহৃত হবেন?
বিসিবিকে বাঁচাতে হলে এখনই প্রয়োজন:
- স্বাধীন নির্বাচন কমিশন: যেখানে রাজনৈতিক আনুগত্য নয়, বরং ক্রিকেটীয় জ্ঞান প্রাধান্য পাবে।
- অডিট ও জবাবদিহিতা: বিসিবির প্রতি পয়সার হিসাব জনগণের সামনে উন্মুক্ত করা।
- বিসিবি সভাপতি নিয়োগে সীমাবদ্ধতা: সভাপতি পদে রাজনৈতিক কোনো সক্রিয় ব্যক্তির সরাসরি অংশগ্রহণে আইনি নিষেধাজ্ঞা।
বাংলাদেশ ক্রিকেট আজ এক মহাসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। যদি ব্যক্তি স্বার্থ ও দলের স্বার্থ বিসিবির ওপর রাজত্ব করতে থাকে, তবে মাঠের ক্রিকেটে পরাজয় কেবল সময়ের ব্যাপার। কোটি কোটি ভক্তের প্রার্থনা—বিসিবি যেন রাজনীতির মাঠ থেকে বেরিয়ে আবার ক্রিকেটের মাঠে ফিরে আসে।

