দীর্ঘ অনিশ্চয়তা ও নানা জল্পনা-কল্পনার পর অবশেষে ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপে অংশ নিতে ইরানের জাতীয় দলের খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাদের ভিসা অনুমোদন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে এই অনুমোদনের সঙ্গে কিছু বিশেষ শর্তও যুক্ত করেছে ওয়াশিংটন, যা নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
শুক্রবার (৫ জুন) এক মার্কিন কর্মকর্তা সংবাদমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন। এর ফলে বিশ্বকাপকে ঘিরে ইরানের অংশগ্রহণ নিয়ে যে সংশয় তৈরি হয়েছিল, তা অনেকটাই দূর হলো।
বর্তমানে ইরানের জাতীয় ফুটবল দল তুরস্কের আনতালিয়ায় প্রস্তুতি শিবিরে রয়েছে। সেখান থেকেই খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফ এবং কর্মকর্তারা আঙ্কারায় অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসে ভিসার জন্য আবেদন করেন। যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, খেলোয়াড়দের পাশাপাশি কোচ, শারীরিক সক্ষমতা প্রশিক্ষক এবং কয়েকজন সহায়ক কর্মীর ভিসাও অনুমোদিত হয়েছে।
তবে কতজন আবেদন করেছিলেন এবং কোনো আবেদন বাতিল করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। মার্কিন কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, পাসপোর্ট ফেরত পাওয়ার পর ইরানি প্রতিনিধিদল যুক্তরাষ্ট্র অথবা মেক্সিকোর উদ্দেশে যাত্রা করতে পারবে।
তবে ভিসা অনুমোদনের খবরের পাশাপাশি আরেকটি বিষয়ও গুরুত্ব পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্ট করে জানিয়েছে, ইরানের প্রতিনিধিদলের সদস্যদের ওপর বিশেষ নজরদারি রাখা হবে। বিশেষ করে দেশটির প্রভাবশালী সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিষয়ে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করা হবে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, খেলোয়াড় ও তাদের সঙ্গে সরাসরি কাজ করা কর্মীদের নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো আপত্তি নেই। তবে খেলাধুলার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত নন এবং সামরিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে—এমন কাউকে প্রতিনিধিদলে অন্তর্ভুক্ত করা হলে তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্তে ফুটবল ও কূটনীতির জটিল সম্পর্ক আবারও সামনে চলে এসেছে। আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা সাধারণত রাজনৈতিক বিরোধের ঊর্ধ্বে রাখার চেষ্টা করা হলেও বাস্তবে অনেক সময় ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ক্রীড়াঙ্গনেও প্রভাব ফেলে।
২০২৬ সালের বিশ্বকাপে ইরানের প্রথম ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে ১৫ জুন। ওই ম্যাচে তাদের প্রতিপক্ষ নিউজিল্যান্ড। এরপর ২১ জুন তারা মুখোমুখি হবে বেলজিয়ামের। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে ২৬ জুন সিয়েটলে মিশরের বিপক্ষে খেলবে দলটি।
উল্লেখ্য, ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ যৌথভাবে আয়োজন করছে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো। চলতি বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ার পর অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন, বিশ্বকাপে ইরানের অংশগ্রহণ কোনো বাধার মুখে পড়বে কি না। তবে আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থা শুরু থেকেই জানিয়ে আসছিল, ইরান নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী টুর্নামেন্টে অংশ নেবে।
এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ইরানের অংশগ্রহণ এবং খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। জবাবে ইরানের জাতীয় দল দৃঢ় অবস্থান নিয়ে জানিয়েছিল, কোনো রাজনৈতিক চাপ বা কূটনৈতিক বিরোধ তাদের বিশ্বকাপ খেলা থেকে বিরত রাখতে পারবে না।
ভিসা ইস্যুতে ইরানের জন্য এটি অবশ্য নতুন কোনো অভিজ্ঞতা নয়। গত এপ্রিল মাসে দেশটির ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি মেহদি তাজের কানাডার ভিসা বাতিল করা হয়েছিল। তার বিরুদ্ধে অতীতে সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ ছিল। একই কারণে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র উভয় দেশই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিষয়ে কঠোর অবস্থান বজায় রেখেছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ইরানের জন্য বিশ্বকাপের দরজা খুলে গেছে, কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতা এখনো পুরোপুরি দূরে সরে যায়নি। মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি কূটনৈতিক পর্যবেক্ষণও এবার ইরান দলের বিশ্বকাপ যাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে থাকছে।

