যখন বিশ্বকাপ চলছিল, ইসরায়েল তখন অধিকৃত ফিলিস্তিন ও লেবানন জুড়ে তার নিরবচ্ছিন্ন হত্যাকাণ্ড ও ভূমি দখল অব্যাহত রেখেছিল এবং একই সাথে আত্মম্ভরী মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইরানের বিরুদ্ধে তাদের যুদ্ধে যোগ দিতে উস্কে দিয়েছিল।
কিন্তু গণহত্যাবাদী জায়নবাদীরা বিশ্বকাপ সম্পর্কে পুরোপুরি উদাসীন ছিল না। তারা ঠিকই সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার নাম কলঙ্কিত করতে এবং এর সুনাম নষ্ট করতে সক্ষম হয়েছিল।
বিশ বছর আগে, জার্মানিতে যখন ২০০৬ সালের বিশ্বকাপ চলছিল, তখন আমি লেবাননে ছিলাম। আমরা বৈরুত ছাড়ার কয়েক দিন পরেই ইসরায়েলিরা আবারও লেবানন আক্রমণ করে।
আমরা শরণার্থী শিবিরে ফিলিস্তিনি ও লেবানিজ বন্ধুদের সাথে বিশ্বকাপের কয়েকটি খেলা দেখেছিলাম। আমরা ২ জুলাই বৈরুত ছেড়েছিলাম, বিশ্বকাপ শেষ হয়েছিল ৯ জুলাই এবং ১২ জুলাইয়ের মধ্যেই ইসরায়েলিরা লেবাননে বোমা হামলা শুরু করে দিয়েছিল। নিরস্ত্র মানুষের ওপর বোমা ফেলা তাদের জাতীয় খেলা।
আজ প্রায় একই রকম পরিস্থিতিতে, ২০২৬ বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পর, এই গভীরভাবে সমস্যা জর্জরিত বিশ্বকে শোভিত করা, বহু নিন্দিত হলেও এখনও সুন্দর এই খেলাটি নিয়ে সংক্ষিপ্তভাবে ভাবার সময় এসেছে।
আমার বিশ্বাস, অনেক সমসাময়িক চিন্তাবিদের কাছে ফুটবলের আকর্ষণের কারণ হলো এই যে, এটি একটি সমতল খেলার ক্ষেত্র তৈরি করে দেয়, এমন এক বিশ্বে যা অন্যথায় শক্তিশালী দেশগুলোর বিশেষাধিকার ও গুণ্ডামিতে কলুষিত।
এদুয়ার্দো গালেয়ানোর ‘সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো’ বইটি এখন মূলত সুন্দর এই খেলাটির সারগর্ভ সারসংক্ষেপের জন্য পরিচিত: “সকারের ইতিহাস হলো সৌন্দর্য থেকে কর্তব্যের দিকে এক দুঃখজনক যাত্রা। যখন খেলাটি একটি শিল্পে পরিণত হলো, তখন খেলার আনন্দ থেকে প্রস্ফুটিত সৌন্দর্যকে একেবারে শিকড়সুদ্ধ উপড়ে ফেলা হলো।”
সুন্দর খেলা, কুৎসিত পৃথিবী
তবুও, এই কুৎসিত জগতে যেখানে সুন্দর খেলাটি মঞ্চস্থ হয়, সেখানেও এর ঝলক চমৎকারভাবে দেখা যায়– যেখানে সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার, আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসি, ইসরায়েলি অপপ্রচারে ইন্ধন দেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত।
স্টেডিয়ামের ভেতরে ও বাইরে কিছু আর্জেন্টাইন সমর্থকের জঘন্য বর্ণবাদী আচরণ ইসরায়েলি প্রাতিষ্ঠানিক বর্ণবাদেরই প্রতিচ্ছবি। কিন্তু যে দক্ষিণ আমেরিকান দেশটি বিশ্বকে দিয়েগো ম্যারাডোনা ও আলফ্রেডো ডি স্টেফানোর মতো অনবদ্য ফুটবলার এবং এনরিকে ডুসেল ও ওয়াল্টার মিগনোলোর মতো প্রতিভাবান দার্শনিকসহ আরও অনেককে উপহার দিয়েছে, সেই দেশটি তার ভাঁড়সুলভ জায়নবাদী রাষ্ট্রপতি হাভিয়ের মিলেইয়ের কলঙ্কের দ্বারা ম্লান হতে পারে না।
এই বিশ্বকাপে বিশ্বজুড়ে ভক্তদের মনোভাবের সবচেয়ে অদ্ভুত পরিবর্তনগুলোর মধ্যে একটি ছিল যখন ইন্টারনেট ইংল্যান্ডের পক্ষে আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে চলে গিয়েছিল।
আর্জেন্টিনার কাছে মিশরের হারের পর সৃষ্ট বিতর্ক, যা পুরো ফিফা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলেছিল , তার পরিপ্রেক্ষিতে মেসি এবং মিশরীয় অধিনায়ক মোহাম্মদ সালাহর মধ্যকার সুস্পষ্ট বৈসাদৃশ্যটি সামনে চলে আসে। এটি দেখিয়ে দেয় যে, ফিলিস্তিনিদের অধিকারের পক্ষে দাঁড়ানো ব্যক্তিরা কীভাবে মহিমান্বিত হয় এবং যারা তা পালনে ব্যর্থ হয়, তারা কীভাবে কলঙ্কিত হয়।
মিশরীয় দলের সেই কঠিন দিনগুলোতে মিশরীয়, মরক্কীয়, ফিলিস্তিনি এবং অন্যান্য আরব সমর্থকেরা সৌজন্যের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন।
ইরান জাতীয় দলের বাসভবনের বাইরে জড়ো হওয়া মেক্সিকান সমর্থকদের মধ্যেও অটুট মানবিকতার ঝলক দেখা গিয়েছিল , যারা গাইছিল: “ইরান, হেরমানো, ইয়া এরেস মেক্সিকানো” (যার অনুবাদ হলো: “ইরান, ভাই, তুমি এখন মেক্সিকান”)।
“তাহলে এখন আমরা কী করব?” ইরানের জাতীয় দল প্রথম রাউন্ডেই বাদ পড়ার পর আমার ছোট মেয়ে হতাশ হয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করল।
ইরানি দল তাদের সাধ্যমতো সেরাটা করেছিল এবং মিশর ও বেলজিয়ামের মতো শক্তিশালী দলগুলোর বিরুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ লড়াই গড়ে তুলেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিছক দুর্ভাগ্য এবং প্রতিকূল পরিবেশের কারণেই তাদের থেমে যেতে হয়েছিল।
“কিছু না, বাবা,” আমি উত্তর দিলাম। “আমরা শুধু পৃথিবীর অন্য হতভাগাদের অনুসরণ করি আর তাদের সমর্থন করি। বিশ্বকাপের বাকি অংশে এখনও অনেক আফ্রিকান আর ল্যাটিন আমেরিকান দল টিকে আছে।”
বল ‘দখল’ এর মনোবিজ্ঞান
খেলার অর্থনীতি এবং ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার ব্যাপক দুর্নীতি ইতোমধ্যে জাতীয় দলগুলোর সহজ ও সরল রাজনীতিকে ছাপিয়ে গেছে।
এশিয়া ও আফ্রিকা থেকে ইউরোপে উল্লেখযোগ্য অভিবাসন এই জাতীয় দলগুলোর গঠনকেই ব্যাপকভাবে বদলে দিয়েছে। জনপ্রিয় ফরাসি স্ট্রাইকার কিলিয়ান এমবাপে ফ্রান্সে অভিবাসী ক্যামেরুনীয় ও আলজেরীয় পিতামাতার ঘরে জন্মগ্রহণ করেন । অনেক লাতিন আমেরিকান, আফ্রিকান এবং এশীয় ফুটবলার ইউরোপীয় ফুটবল ক্লাব ও লিগের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছেন; মিশরীয় সুপারস্টার সালাহ লিভারপুল এফসি-র হয়ে নয় বছর খেলেছেন।
ফ্রান্স ও স্পেনের মধ্যে, আমরা অবশ্যই স্পেনকেই সমর্থন করেছিলাম; গাজায় গণহত্যার বিরুদ্ধে তাদের অধিকতর নীতিগত অবস্থানের জন্য এবং কিশোর প্রতিভাধর লামিন ইয়ামালের চোখধাঁধানো খেলা দেখার নিখাদ আনন্দের জন্য।
এতেই আমরা আমেরিকান দলের প্রসঙ্গে আসি এবং এই নির্লজ্জ সত্যটি সামনে আসে যে, তারা যাকে ‘সকার’ বলে, তা আসলে কোনো আমেরিকান খেলা নয় এবং সম্ভবত কখনো হবেও না।
এই সহজ ঘটনাটির ব্যাখ্যা শুরু হয় একটি প্রচলিত বাগধারা দিয়ে: “সকার মম”। সকার মম কী? তিনি হলেন একজন ধনী শহরতলী-নিবাসী মা, যিনি তাঁর এসইউভি গাড়িতে ১১টি সন্তান ও তার পাঁচগুণ বেশি বল নিয়ে নিজের পাড়ার একটি সবুজ ঘাসের লনে যান।
এর সাথে আমার ফুটবল খেলার শৈশবের তুলনা করুন— যা ছিল পৃথিবীর আরও লক্ষ লক্ষ ছোট ফুটবলারের মতোই — যখন একটি ছোট প্লাস্টিকের বল কেনার জন্য আমাদের প্রত্যেককে এক পেনি করে চাঁদা দিতে হতো। বলটি যখন সাময়িকভাবে আমাদের দখলে থাকত, তখন সেটির ওপর আমাদের একচ্ছত্র অধিকার থাকত এবং সতীর্থকে পাস দেওয়া ছাড়া আমরা কখনোই তা হাতছাড়া করতাম না।
বল ‘দখল’ রাখার মনস্তত্ত্ব বিশেষভাবে শক্তিশালী, কারণ ফুটবলে আপনি হাত দিয়ে বল স্পর্শ করতে পারেন না, ধরে রাখা তো দূরের কথা (গোলরক্ষক ছাড়া); বরং, আপনি কেবল পা দিয়েই বলের দখল রাখতে পারেন এবং সতীর্থদের কাছে পাস দেওয়ার আগে কিছুক্ষণ ড্রিবলিং করতে পারেন।
এটি বলের প্রতি একটি সমাজতান্ত্রিক মনোভাব তৈরি করে, যা আপনার সাময়িক ও ক্ষণস্থায়ী দখলে থাকে। এরপর আপনাকে তা বন্ধুর সাথে ভাগ করে নিতে হয়—কারণ ভাগ করে নেওয়াই হলো যত্ন এবং আপনার শত্রু তা আপনার কাছ থেকে কেড়ে নেয়। ফুটবল তাই একটি আদর্শ সমাজতান্ত্রিক খেলা এবং এটিও একটি কারণ যে আমেরিকানরা এই খেলায় তেমন ভালো নয়।
অন্যদিকে, “আমেরিকান ফুটবল” পুরোপুরি হাত দিয়ে খেলা হয়; বলটির আকৃতি এমনভাবে তৈরি করা হয় যা বলের দখলকে উৎসাহিত করে।
এক গৌরবময় মোড়
মেসি ও এমবাপের মতো শীর্ষস্থানীয় খেলোয়াড়রা যে কোটিপতি, এই তথ্যের আলোকে এই সমস্ত ভাবনাচিন্তা খামখেয়ালি মনে হতে পারে। কিন্তু বলের জাদুকরী শক্তির প্রতি তাদের মনোভাব গড়ে ওঠে, কোনো ইউরোপীয় ক্লাবে তাদের মোটা অঙ্কের বেতন উপার্জনের জন্য যোগ দেওয়ার অনেক আগেই।
আর্জেন্টিনা ও স্পেনের মধ্যকার ফাইনাল ম্যাচটি পরিণত হলো বিজয় উদযাপনে সগর্বে ফিলিস্তিনি পতাকা ওড়ানো গৌরবময় ইয়ামাল এবং ইসরায়েল ও জায়নবাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কারণে কলঙ্কিত মেসির মধ্যকার লড়াইয়ে।
ফিলিস্তিনে গণহত্যা চালানো ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার শেষ নৃশংস অবশেষের পক্ষ নেওয়ায়, ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ/ইসলাস মালভিনাসের ওপর আর্জেন্টিনার দাবি উত্থাপন এখন অন্তঃসারশূন্য ও অর্থহীন শোনাচ্ছে।
আয়ারল্যান্ডের পরেই ইউরোপের অন্যতম ফিলিস্তিনপন্থী দেশ হওয়ায় স্প্যানিশ দলটির বিশ্বাসযোগ্যতা ছিল। এই সেই দেশ যেখান থেকে প্রখ্যাত স্প্যানিশ অভিনেতা হাভিয়ের বারদেম ফিলিস্তিনিদের অধিকারের একজন রক্ষক হিসেবে আবির্ভূত হন। এদিকে, কলঙ্কিত আর্জেন্টাইন শাসকগোষ্ঠীর বর্ণবাদী স্বরূপ বিশ্বব্যাপী উন্মোচিত হয়েছে।
২০২৬ বিশ্বকাপের শেষে, সেই বয়স্ক সিংহ তার দায়িত্বের মশালটি তুলে দিয়েছিল সেই তরুণ শাবকের হাতে, যাকে সে একসময় স্নান করাতো। মাঠে স্পেনের এই বিজয় ছিল ইসরায়েলের হাতে নিহত প্রতিটি ফিলিস্তিনি, লেবানিজ বা ইরানি শিশুর জন্য এক বিজয়—যারা এই সুন্দর খেলার গৌরবময় মোড়টি দেখার সুযোগ কখনোই পায়নি।
- হামিদ দাবাশি: নিউ ইয়র্ক সিটির কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইরানিয়ান স্টাডিজ ও তুলনামূলক সাহিত্যের হাগোপ কেভোরকিয়ান অধ্যাপক। সূত্র: মিডল ইস্ট আই

