পৃথিবীটা এখনো লিওনেল মেসির, আর ফুটবল বিশ্ব আরও একবার বুঁদ হয়ে রইল তাঁর জাদুতে। ৩৮ বছর বয়স, পেশির চোটের শঙ্কা আর ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ—ম্যাচের আগে বাতাসে ভাসছিল হাজারো প্রশ্ন। এই বয়সে কি তিনি পারবেন ম্যাচের গতিপথ বদলে দিতে? নাকি তিনি এখন কেবলই স্মৃতির মানুষ?
৪৫ মিনিটের মধ্যেই সব প্রশ্নকে স্রেফ হাস্যকর বানিয়ে দিলেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। কানসাস সিটির আকাশি-নীল গ্যালারিকে সাক্ষী রেখে আলজেরিয়ার বিপক্ষে জাদুকরী এক হ্যাটট্রিক উপহার দিলেন এই ক্ষুদে জাদুকর। আর এই হ্যাটট্রিকের ওপর ভর করে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা ৩-০ গোলের বড় জয়ে বিশ্বকাপ ধরে রাখার মিশন শুরু করল।
ক্লোসার রেকর্ডে ভাগ: ইতিহাসের শীর্ষে মেসি
এই ঐতিহাসিক হ্যাটট্রিকের মাধ্যমে লিওনেল মেসি ছুঁয়ে ফেলেছেন বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড। ব্রাজিলের কিংবদন্তি ফুটবলার রোনালদো নাজারিওর ১৫ গোলের রেকর্ড ছাড়িয়ে মেসি স্পর্শ করেছেন জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসার সর্বোচ্চ ১৬ গোলের কীর্তি। বিশ্বকাপ শুরুর আগে মেসির গোলসংখ্যা ছিল ১৩টি। ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে এর আগে ১৪ গোল করে মেসিকে ছাড়িয়ে গেলেও, আলজেরিয়ার বিপক্ষে এক ম্যাচেই পুরো হিসাব বদলে দিলেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা। এখন আর মাত্র একটি গোল করলেই এককভাবে বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার সিংহাসনে বসবেন তিনি।

ম্যাচের গতিচিত্র ও জাদুকরী হ্যাটট্রিক
ম্যাচের শুরু থেকেই মেসিকে দেখা গেছে এক তরুণ সংস্করণে—ধারালো এবং ক্ষুধার্ত। ম্যাচের পঞ্চম মিনিটেই বল জালে জড়িয়েছিলেন, তবে অফসাইডের কারণে তা বাতিল হয়। কিন্তু জাদুর প্রদর্শনীর জন্য দর্শকদের বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়নি।
- ১৭ মিনিট (প্রথম গোল): রদ্রিগো দি পলের পাস থেকে বক্সের বাইরে বল পান মেসি। প্রায় ২৫ গজ দূর থেকে তিন ডিফেন্ডারের বাধা এড়িয়ে নেওয়া তাঁর চোখধাঁধানো শট আলজেরিয়ার গোলরক্ষক লুকা জিদান হাত ছোঁয়ালেও আটকাতে পারেননি। স্টেডিয়ামে উপস্থিত ৭০ হাজার দর্শক মেতে ওঠে “মেসি, মেসি, মেসি” উল্লাসে।
- ৬০ মিনিট (দ্বিতীয় গোল): আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের দূরপাল্লার শট আলজেরিয়ান গোলরক্ষক লুকা জিদান সঠিকভাবে সামলাতে ব্যর্থ হলে ফিরতি বল ক্লিয়ার করার আগেই চিতার বেগে বক্সে ঢুকে নিখুঁত টোকায় জালে জড়ান মেসি।
- ৭৬ মিনিট (তৃতীয় গোল ও হ্যাটট্রিক): ৬৬ মিনিটে বক্সের বাইরে থেকে নেওয়া মেসির একটি শক্তিশালী শট গোলরক্ষক ঠেকিয়ে দিলেও ৭৭তম মিনিটে (অফিশিয়াল টাইমলাইন অনুযায়ী ৭৬ মিনিট) আর রক্ষা হয়নি। বক্সের বাইরে থেকে তিন ডিফেন্ডারের ফাঁক গলে বল নিচের কোণে পাঠিয়ে বিশ্বকাপে নিজের প্রথম হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন লিওনেল মেসি।
হ্যাটট্রিকের পরপরই ম্যাচের ৮০ মিনিটে কোচ লিওনেল স্কালোনি মেসিকে তুলে নিলে পুরো স্টেডিয়াম দাঁড়িয়ে এই ফুটবল মহীরুহকে ‘স্ট্যান্ডিং ওভেশন’ দেয়।
রেকর্ডের পাতায় দুই দশক ও অনন্য কীর্তি
আলজেরিয়ার বিপক্ষে মাঠে নেমেই নিজের ২০০তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ ও ষষ্ঠ বিশ্বকাপে খেলার অনন্য এক নজির গড়েন মেসি। কাকতালীয়ভাবে, এই দিনটি ছিল আর্জেন্টিনার জার্সিতে তাঁর বিশ্বকাপ অভিষেকের ঠিক ২০ বছর পূর্তি (দুই দশক আগে সার্বিয়া ও মন্টিনিগ্রোর বিপক্ষে তাঁর বিশ্বকাপ অভিষেক হয়েছিল)।
আজকের ম্যাচে গোল করার মাধ্যমে মেসি বেশ কিছু নতুন রেকর্ড নিজের করে নিয়েছেন:
- পাঁচ বিশ্বকাপে গোল: পর্তুগালের ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর পর দ্বিতীয় খেলোয়াড় হিসেবে পাঁচটি আলাদা বিশ্বকাপে (২০০৬, ২০১৪, ২০১৮, ২০২২ এবং ২০২৬) গোল করার কীর্তি গড়লেন মেসি।
- ১১ দেশের বিপক্ষে গোল: ইতিহাসের একমাত্র ফুটবলার হিসেবে বিশ্বকাপের মঞ্চে ১১টি ভিন্ন দেশের বিপক্ষে গোল করার রেকর্ড গড়েছেন তিনি। দেশগুলো হলো—সার্বিয়া, মেক্সিকো, নাইজেরিয়া, বসনিয়া, ইরান, ক্রোয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ডস, ফ্রান্স, সৌদি আরব এবং আলজেরিয়া।
- সর্বাধিক ম্যাচ ও অ্যাসিস্ট: বিশ্বকাপে ইতিহাসের সর্বোচ্চ ২৭টি ম্যাচ খেলার পাশাপাশি সর্বোচ্চ অ্যাসিস্টের তালিকায় ৯টি অ্যাসিস্ট নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন তিনি।
মেসির বিশ্বকাপ গোলের পরিসংখ্যান
| বিশ্বকাপ | গোলের সংখ্যা |
| ২০০৬ (জার্মানি) | ১টি গোল |
| ২০১০ (দক্ষিণ আফ্রিকা) | ০ (কোনো গোল পাননি) |
| ২০১৪ (ব্রাজিল) | ৪টি গোল |
| ২০১৮ (রাশিয়া) | ১টি গোল |
| ২০২২ (কাতার) | ৭টি গোল |
| ২০২৬ (উত্তর আমেরিকা) | ৩টি গোল (প্রথম ম্যাচেই হ্যাটট্রিক) |
| সর্বমোট | ১৬টি গোল |
“একটা সময় ছিল, আর্জেন্টিনা মেসির কাঁধে চেপে বাঁচতে চাইত। এখন মনে হয়, মেসিও আর্জেন্টিনার কাঁধে ভর দিয়ে নতুন গল্প লেখেন। স্কালোনির এই রক্ষণে সংগঠিত, মাঝমাঠে সচল ও আক্রমণে নমনীয় দলটির কারণে মেসিকে আর পৃথিবী একা বহন করতে হয় না। তাই হয়তো তাঁকে আরও মুক্ত লাগে, আরও বিপজ্জনক লাগে।”
কাতারে বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নপূরণ হলেও, ৩৮ বছরের মেসির ক্ষুধার তীব্রতা যে চার বছর আগের মতোই আছে—তা এই এক ম্যাচেই টের পেল ফুটবল বিশ্ব। গ্রেটদের আসলেই কোনো মেয়াদ থাকে না।

