২০২৬ বিশ্বকাপ এখন এমন এক পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে আর কোনো ভুলের সুযোগ নেই। গ্রুপপর্বের হিসাব-নিকাশ, পয়েন্ট টেবিলের ওঠানামা, শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তা এবং অপ্রত্যাশিত ফল—সবকিছু পেরিয়ে টুর্নামেন্ট এখন প্রবেশ করছে শেষ ৩২ দলের বিদায়ী লড়াইয়ে। এখান থেকে প্রতিটি ম্যাচ একেকটি ফাইনালের মতো। জিতলে সামনে পথ খুলবে, হারলেই শেষ হয়ে যাবে বিশ্বকাপ স্বপ্ন।
এই আসরের গ্রুপপর্ব শুরু থেকেই ছিল ঘটনাবহুল। বড় দলগুলোর কেউ প্রত্যাশা অনুযায়ী এগিয়েছে, কেউ আবার হোঁচট খেয়ে কোনোভাবে টিকে আছে। স্বাগতিক তিন দেশ—মেক্সিকো, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা—তিন দলই শেষ ৩২-এ জায়গা করে নিয়েছে। তবে তাদের পথ একরকম নয়। মেক্সিকো গ্রুপপর্বে সবচেয়ে আত্মবিশ্বাসী ছন্দ দেখিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র শীর্ষস্থান ধরে রাখলেও শেষ ম্যাচে ধাক্কা খেয়েছে, আর কানাডা রানার্সআপ হয়ে বিদায়ী পর্বে উঠেছে।
গ্রুপপর্বের শেষ দিনেই দেখা গেছে বিশ্বকাপের আসল সৌন্দর্য। আলজেরিয়া ও অস্ট্রিয়ার ম্যাচে শেষ মুহূর্তে এমন নাটকীয়তা তৈরি হয়, যা এই আসরের অন্যতম আলোচিত ঘটনা হয়ে থাকবে। রিয়াদ মাহরেজের ৯৪তম মিনিটের গোল আলজেরিয়াকে জয়ের খুব কাছে নিয়ে গিয়েছিল। সেই ফল হলে অস্ট্রিয়ার বিদায় নিশ্চিত হয়ে যেত। কিন্তু ম্যাচের একেবারে শেষ আক্রমণে বদলি খেলোয়াড় সাশা কালাইদজিচ সমতা ফেরান। তার দ্বিতীয় স্পর্শেই গোল, আর সেটিই ছিল ম্যাচের শেষ মুহূর্তের সবচেয়ে বড় মোড়। এই একটি গোল শুধু অস্ট্রিয়াকে বাঁচায়নি, শেষ ৩২-এর সমীকরণও বদলে দিয়েছে।
অন্যদিকে মেক্সিকো ছিল গ্রুপপর্বের সবচেয়ে শৃঙ্খলাবদ্ধ দলগুলোর একটি। দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে ১-০ জয়ে তারা দ্রুত শেষ ৩২ নিশ্চিত করে। এরপর চেকিয়াকে ৩-০ গোলে হারিয়ে পূর্ণ ৯ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপের শীর্ষে ওঠে। এমন পারফরম্যান্স শুধু ফলের দিক থেকে নয়, মানসিক দিক থেকেও মেক্সিকোকে শক্ত অবস্থানে রেখেছে। ঘরের মাঠের সমর্থন তাদের জন্য বড় শক্তি হতে পারে।
শেষ ৩২-এর সূচি ও ম্যাচভিত্তিক বিশ্লেষণ
দক্ষিণ আফ্রিকা বনাম কানাডা
তারিখ: সোমবার, ২৯ জুন
বাংলাদেশ সময়: রাত ১টা
ভেন্যু: সোফি স্টেডিয়াম, লস অ্যাঞ্জেলেস, যুক্তরাষ্ট্র
কানাডার সামনে দক্ষিণ আফ্রিকা। কাগজে-কলমে ম্যাচটি ভারসাম্যপূর্ণ, কারণ দুই দলেরই বিশ্বকাপ বিদায়ী পর্বে বড় সাফল্যের ইতিহাস নেই। দক্ষিণ আফ্রিকা গ্রুপপর্বে মেক্সিকোর কাছে হার দিয়ে শুরু করলেও চেকিয়ার সঙ্গে ড্র এবং দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে ১-০ জয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। কানাডা বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার সঙ্গে ১-১ ড্র, কাতারের বিপক্ষে ৬-০ জয়ের পর সুইজারল্যান্ডের কাছে ২-১ হেরে রানার্সআপ হয়।
এই ম্যাচে কানাডার গতি ও আক্রমণভাগের কার্যকারিতা বড় ভূমিকা রাখবে। তবে দক্ষিণ আফ্রিকা যদি নিজেদের রক্ষণ জমাট রাখতে পারে, তাহলে ম্যাচটি দীর্ঘ সময় অনিশ্চয়তায় থাকতে পারে। দুই দলের কেউই আগে বিশ্বকাপের বিদায়ী পর্বে জয় পায়নি—তাই ইতিহাস বদলানোর সুযোগ দুই পক্ষের সামনেই।
ব্রাজিল বনাম জাপান
তারিখ: সোমবার, ২৯ জুন
বাংলাদেশ সময়: রাত ১১টা
ভেন্যু: এনআরজি স্টেডিয়াম, হিউস্টন, যুক্তরাষ্ট্র
ব্রাজিল প্রত্যাশিতভাবেই শেষ ৩২-এ উঠেছে। স্কটল্যান্ডকে ৩-০ গোলে হারিয়ে তারা গ্রুপের শীর্ষস্থান নিশ্চিত করে। সাত পয়েন্টে মরক্কোর সমান থাকলেও গোল ব্যবধানে এগিয়ে ছিল ব্রাজিল। কার্লো আনচেলত্তির দল এখন জাপানের মুখোমুখি হবে।
জাপান গ্রুপে সুইডেনের সঙ্গে ১-১ ড্র করে রানার্সআপ হিসেবে এই জায়গা নিশ্চিত করেছে। এই ম্যাচের বিশেষ দিক হলো, দুই দলের সর্বশেষ সাক্ষাতে জাপান ৩-২ গোলে ব্রাজিলকে হারিয়েছিল। সেটি ছিল প্রীতি ম্যাচ, কিন্তু মানসিকভাবে জাপান এই স্মৃতিকে কাজে লাগাতে চাইবে। ব্রাজিলের কাছে অভিজ্ঞতা, তারকা শক্তি ও বিদায়ী পর্বের সংস্কৃতি আছে। তবে জাপানের গতিময় ফুটবল এবং সংগঠিত চাপ ব্রাজিলকে অস্বস্তিতে ফেলতে পারে।
জার্মানি বনাম প্যারাগুয়ে
তারিখ: মঙ্গলবার, ৩০ জুন
বাংলাদেশ সময়: রাত ২টা ৩০ মিনিট
ভেন্যু: জিলেট স্টেডিয়াম, বোস্টন, যুক্তরাষ্ট্র
জার্মানির গ্রুপপর্ব ছিল অদ্ভুত। কুরাসাওকে ৭-১ গোলে হারালেও খেলায় পুরো নিয়ন্ত্রণের ছাপ সবসময় ছিল না। এরপর কোত দিভোয়ারের বিপক্ষে ২-১ জয় এবং ইকুয়েডরের বিপক্ষে অনিশ্চিত পারফরম্যান্স দলটির স্থিরতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। জুলিয়ান নাগেলসমানের দল এখনো পূর্ণাঙ্গ ছন্দে আছে কি না, তা এই ম্যাচেই বোঝা যাবে।
প্যারাগুয়ে শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে হেরে চাপে পড়ে। এরপর তুরস্কের বিপক্ষে ১-০ জয় এবং অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে গোলশূন্য ড্র তাদের শেষ ৩২-এ জায়গা এনে দেয়। প্যারাগুয়ে সাধারণত কঠিন, শারীরিক ও ধৈর্যশীল ফুটবল খেলে। জার্মানি যদি দ্রুত গোল না পায়, ম্যাচটি তাদের জন্য বিরক্তিকর ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
নেদারল্যান্ডস বনাম মরক্কো
তারিখ: মঙ্গলবার, ৩০ জুন
বাংলাদেশ সময়: সকাল ৭টা
ভেন্যু: এস্তাদিও বিবিভিএ, গুয়াদালুপে, মেক্সিকো
এই ম্যাচটি শেষ ৩২-এর সবচেয়ে আকর্ষণীয় লড়াইগুলোর একটি। নেদারল্যান্ডস গ্রুপে দারুণ ফুটবল খেলেছে এবং তিউনিসিয়াকে ৩-১ গোলে হারিয়ে শীর্ষস্থান নিশ্চিত করেছে। অন্যদিকে মরক্কো সাত পয়েন্ট নিয়ে ব্রাজিলের সমান ছিল, কিন্তু গোল ব্যবধানে পিছিয়ে রানার্সআপ হয়।
মরক্কোর কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় নেদারল্যান্ডসে জন্ম নেওয়ায় এই ম্যাচে আবেগের আলাদা মাত্রা থাকবে। মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি পরিচয়, ফুটবল সংস্কৃতি এবং ব্যক্তিগত প্রেরণার মিশ্রণ ম্যাচটিকে আরও রোমাঞ্চকর করবে। নেদারল্যান্ডস বল দখল ও পজিশনাল ফুটবলে শক্তিশালী, আর মরক্কো দ্রুত পাল্টা আক্রমণ ও শারীরিক দৃঢ়তায় বিপজ্জনক। ছোট ভুলই এখানে ম্যাচের ফল বদলে দিতে পারে।
কোত দিভোয়ার বনাম নরওয়ে
তারিখ: মঙ্গলবার, ৩০ জুন
বাংলাদেশ সময়: রাত ১১টা
ভেন্যু: এটিঅ্যান্ডটি স্টেডিয়াম, ডালাস, যুক্তরাষ্ট্র
নরওয়ে দীর্ঘ বিরতির পর বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে এসে শেষ ৩২-এ ওঠা দিয়েই বড় অর্জন করেছে। ১৯৯৮ সালের পর তারা বিশ্বকাপে ছিল না। তবে ফ্রান্সের বিপক্ষে গ্রুপের শেষ ম্যাচে আর্লিং হালান্ড ও মার্টিন ওডেগার্ডকে বিশ্রাম দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। শক্তিশালী ফ্রান্সের কাছে পরাজয় তাদের গ্রুপ শীর্ষ হওয়ার সুযোগ নষ্ট করে।
কোত দিভোয়ার এই শতকে একাধিকবার বিশ্বকাপে খেললেও আগে গ্রুপপর্ব পেরোতে পারেনি। এবার সেই বাধা তারা ভেঙেছে। ২০২৩ আফ্রিকা কাপ অব নেশনস জয়ী দল হিসেবে তাদের আত্মবিশ্বাসও উঁচুতে। দুই প্রান্ত দিয়ে আক্রমণ এবং মাঝমাঠের গতিশীলতা নরওয়ের রক্ষণকে পরীক্ষায় ফেলবে। হালান্ড যদি সুযোগ পান, নরওয়ে যেকোনো মুহূর্তে গোল করতে পারে। তবে কোত দিভোয়ারের দলগত ভারসাম্য এই ম্যাচে বড় ফ্যাক্টর হতে পারে।
ফ্রান্স বনাম সুইডেন
তারিখ: বুধবার, ১ জুলাই
বাংলাদেশ সময়: রাত ৩টা
ভেন্যু: মেটলাইফ স্টেডিয়াম, ইস্ট রাদারফোর্ড, যুক্তরাষ্ট্র
ফ্রান্স গ্রুপপর্বে নিখুঁত। সেনেগালকে ৩-১, ইরাককে ৩-০ এবং নরওয়েকে ৪-১ গোলে হারিয়ে তারা শক্ত বার্তা দিয়েছে। কিলিয়ান এমবাপে তিন ম্যাচে ৪ গোল ও ২ সহায়তা করে আলোচনার কেন্দ্রে। ওসমান দেম্বেলেও ৪ গোল করেছেন, যার মধ্যে নরওয়ের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক রয়েছে। মাইকেল ওলিসে ৩ সহায়তা দিয়ে আক্রমণভাগকে আরও ধারালো করেছেন।
সুইডেন শুরুতে তিউনিসিয়ার বিপক্ষে ৫ গোল করলেও পরে নেদারল্যান্ডসের কাছে ভেঙে পড়ে এবং জাপানের সঙ্গে ১-১ ড্র করে। কাগজে-কলমে ফ্রান্স অনেক এগিয়ে। তবু বিদায়ী পর্বে এক ম্যাচের লড়াইয়ে আত্মতুষ্টি বিপজ্জনক। ফ্রান্স যদি নিজেদের স্বাভাবিক গতি ধরে রাখে, তাদের থামানো কঠিন হবে।
মেক্সিকো বনাম ইকুয়েডর
তারিখ: বুধবার, ১ জুলাই
বাংলাদেশ সময়: সকাল ৭টা
ভেন্যু: এস্তাদিও আজতেকা, মেক্সিকো সিটি, মেক্সিকো
মেক্সিকো এখনো গোল খায়নি। গ্রুপপর্বে তাদের রক্ষণ ছিল দৃঢ়, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও আত্মবিশ্বাসী। ঘরের মাঠে এস্তাদিও আজতেকার আবহ এই দলকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে পারে। তবে ইকুয়েডর এমন দল, যারা রক্ষণভিত্তিক ফুটবলকে অস্ত্র বানাতে জানে।
এই ম্যাচে বেশি গোলের আশা করা কঠিন। দুই দলই প্রতিপক্ষকে জায়গা দিতে চাইবে না। মেক্সিকোর কোচ হাভিয়ের আগিরে টুর্নামেন্টের আগে বলেছিলেন, বিশ্বকাপে সবচেয়ে সুন্দর ফুটবল খেলা দল সবসময় জেতে না; যে দল প্রতিযোগিতা করতে জানে, সেই দলই এগিয়ে যায়। ইকুয়েডরের বিপক্ষে এই কথার বাস্তব পরীক্ষা হবে।
ইংল্যান্ড বনাম ডিআর কঙ্গো
তারিখ: বুধবার, ১ জুলাই
বাংলাদেশ সময়: রাত ১০টা
ভেন্যু: মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়াম, আটলান্টা, যুক্তরাষ্ট্র
ইংল্যান্ডের সামনে ডিআর কঙ্গো। নামের ওজন, খেলোয়াড়ের মান এবং সাম্প্রতিক ধারাবাহিকতায় ইংল্যান্ড এগিয়ে। তবে আফ্রিকান প্রতিপক্ষকে ছোট করে দেখা ইংল্যান্ডের জন্য ইতিহাসেও বিপজ্জনক প্রমাণিত হয়েছে। ১৯৯০ বিশ্বকাপে ক্যামেরুনের বিপক্ষে ইংল্যান্ডকে অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত লড়তে হয়েছিল।
থমাস টুখেলের ইংল্যান্ড গ্রুপপর্বে খুব সাবলীল ছিল না। জেদি প্রতিপক্ষের বিপক্ষে তাদের আক্রমণ অনেক সময় ধীর ও অনুমেয় দেখিয়েছে। ডিআর কঙ্গো যদি রক্ষণ শক্ত করে এবং শারীরিক লড়াইয়ে ইংল্যান্ডকে আটকে রাখে, তাহলে ম্যাচটি সহজ হবে না। ইংল্যান্ডের দরকার দ্রুত ছন্দ পাওয়া এবং অযথা চাপ তৈরি না করা।
বেলজিয়াম বনাম সেনেগাল
তারিখ: বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই
বাংলাদেশ সময়: রাত ২টা
ভেন্যু: লুমেন ফিল্ড, সিয়াটল, যুক্তরাষ্ট্র
এটি শেষ ৩২-এর অন্যতম রোমাঞ্চকর ম্যাচ। বেলজিয়াম ও সেনেগাল—দুই দলই গ্রুপপর্বের শেষ দিকে নিজেদের সেরা রূপের ইঙ্গিত দিয়েছে। বেলজিয়ামের জন্য এটি হয়তো এক প্রজন্মের শেষ বড় সুযোগ। কেভিন ডি ব্রুইনে ও রোমেলু লুকাকুর মতো খেলোয়াড়দের সামনে আরেকটি বিশ্বকাপ পাওয়ার সম্ভাবনা কম। সেনেগালের ক্ষেত্রেও সাদিও মানে ও কালিদু কুলিবালির জন্য সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।
এই ম্যাচে আবেগ, অভিজ্ঞতা ও শারীরিক শক্তির দারুণ মিশ্রণ থাকবে। বেলজিয়াম বল নিয়ন্ত্রণ ও সৃজনশীলতায় শক্তিশালী, সেনেগাল গতি, শক্তি ও ট্রানজিশনে ভয়ংকর। যে দল মাঝমাঠে নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবে, তাদের জয়ের সম্ভাবনা বেশি।
যুক্তরাষ্ট্র বনাম বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা
তারিখ: বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই
বাংলাদেশ সময়: সকাল ৬টাই
ভেন্যু: লেভাইস স্টেডিয়াম, সান ফ্রান্সিসকো, যুক্তরাষ্ট্র
যুক্তরাষ্ট্র গ্রুপের শীর্ষস্থান আগেই নিশ্চিত করেছিল। প্যারাগুয়ে ও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জয় তাদের অবস্থান শক্ত করে। শেষ ম্যাচে তুরস্কের কাছে ৩-২ হারলেও ব্র্যাকেটের অবস্থান বদলায়নি। মাউরিসিও পচেত্তিনোর দল এখন বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার মুখোমুখি হবে।
বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা চার পয়েন্ট নিয়ে সেরা তৃতীয় দলগুলোর একটি হিসেবে শেষ ৩২-এ উঠেছে। নতুন ৪৮ দলের বিশ্বকাপ কাঠামোতে তৃতীয় স্থানের দলগুলোকে কোন গ্রুপজয়ীর সঙ্গে খেলতে হবে, তা আগে থেকে বোঝা কঠিন ছিল। একই গ্রুপের দল যেন কোয়ার্টার ফাইনালের আগে আবার মুখোমুখি না হয়, সে নিয়মের কারণে এই সমীকরণ আরও জটিল হয়েছে। সুইডেন ও জাপানের ১-১ ড্রয়ের পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ হিসেবে বসনিয়ার অবস্থান নিশ্চিত হয়।
স্বাগতিক সুবিধা যুক্তরাষ্ট্রের বড় শক্তি। তবে বসনিয়া রক্ষণে ধৈর্য ধরে খেললে যুক্তরাষ্ট্রকে সৃজনশীলতার পরীক্ষা দিতে হবে।
স্পেন বনাম অস্ট্রিয়া
তারিখ: শুক্রবার, ৩ জুলাই
বাংলাদেশ সময়: রাত ১টা
ভেন্যু: সোফি স্টেডিয়াম, লস অ্যাঞ্জেলেস, যুক্তরাষ্ট্র
স্পেন শেষ ৩২-এ উঠেছে, কিন্তু তাদের ফুটবল এখনো পূর্ণ গতিতে জ্বলেনি। উরুগুয়ের বিপক্ষে ১-০ জয় তাদের গ্রুপপর্ব শেষ করেছে, তবে সৌদি আরবের বিপক্ষে বড় জয় বাদ দিলে লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল অনেক সময় অতিরিক্ত পাসে আটকে গেছে। বল দখল থাকলেও গোলের সামনে ধার কম দেখা গেছে।
অস্ট্রিয়া রাল্ফ রাংনিকের অধীনে উচ্চচাপের ফুটবল খেলে। তারা স্পেনকে আরামে পাস খেলতে দেবে না। বিশেষ করে ম্যাচের শেষ দিকে অস্ট্রিয়ার চাপ স্পেনের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। স্পেন যদি বল দখলকে কার্যকর সুযোগে রূপ দিতে না পারে, অস্ট্রিয়া ম্যাচটিকে অস্বস্তিকর করে তুলবে।
পর্তুগাল বনাম ক্রোয়েশিয়া
তারিখ: শুক্রবার, ৩ জুলাই
বাংলাদেশ সময়: ভোর ৫টা
ভেন্যু: বিএমও ফিল্ড, টরন্টো, কানাডা
ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো ও লুকা মদ্রিচ আবার মুখোমুখি। ২০০৮ সালে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ও টটেনহ্যাম হটস্পারের হয়ে তাদের প্রথম বড় পর্যায়ের মুখোমুখি হওয়া। প্রায় ১৮ বছর পরে দুজনই ৪০ পেরিয়ে এখনো বিশ্বকাপের বিদায়ী পর্বে দেশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
এই ম্যাচ শুধু পর্তুগাল বনাম ক্রোয়েশিয়া নয়; এটি দুই কিংবদন্তির সময়ের সঙ্গে লড়াইও। রোনালদো ও মদ্রিচ একসঙ্গে রিয়াল মাদ্রিদে ২২২ ম্যাচ খেলেছেন, চারটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা জিতেছেন, দুজনই ব্যালন দ’অর জিতেছেন। এখন তাদের একজনের বিশ্বকাপযাত্রা এখানেই শেষ হয়ে যেতে পারে।
সুইজারল্যান্ড বনাম আলজেরিয়া
তারিখ: শুক্রবার, ৩ জুলাই
বাংলাদেশ সময়: সকাল ৯টা
ভেন্যু: বিসি প্লেস, ভ্যাঙ্কুভার, কানাডা
সুইজারল্যান্ড আধুনিক বিশ্বকাপে ধারাবাহিক দল হলেও বিদায়ী পর্বে তাদের সাফল্য নেই। ১৯৫৪ সালের আয়োজক দেশ হয়েও তারা কখনো বিশ্বকাপে বিদায়ী পর্বের ম্যাচ জিততে পারেনি। গত তিন বিশ্বকাপে গ্রুপপর্ব পেরিয়েও তারা শেষ ষোলোতেই থেমেছে। এবার আলজেরিয়ার বিপক্ষে তাদের সেই দীর্ঘ অপেক্ষা শেষ করার সুযোগ।
আলজেরিয়া গ্রুপপর্বের শেষ মুহূর্তে নাটকীয়তা দেখেছে। তাদের মনোবল উঁচু, কিন্তু সুইসদের সংগঠিত ফুটবল তাদের জন্য কঠিন পরীক্ষা। ম্যাচটি কৌশলগতভাবে ধীর গতির হতে পারে, যেখানে সেট-পিস ও ছোট ভুল বড় পার্থক্য গড়ে দেবে।
অস্ট্রেলিয়া বনাম মিসর
তারিখ: শনিবার, ৪ জুলাই
বাংলাদেশ সময়: রাত ১২টা
ভেন্যু: এটিঅ্যান্ডটি স্টেডিয়াম, ডালাস, যুক্তরাষ্ট্র
কিছু সময়ের জন্য মনে হচ্ছিল অস্ট্রেলিয়া ইরানের মুখোমুখি হবে। কিন্তু শোজায়ে খলিলজাদেহর গোল অফসাইডে বাতিল হওয়ায় মিসর দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসে। ফলে অস্ট্রেলিয়া ও মিসরের মধ্যে শেষ ৩২-এর লড়াই নিশ্চিত হয়।
দুই দলই রক্ষণ থেকে দ্রুত পাল্টা আক্রমণে যেতে পছন্দ করে। তাই প্রশ্ন হলো, প্রথমে কে উদ্যোগ নেবে? দুই দল যদি অপেক্ষার কৌশল নেয়, ম্যাচটি অনেকটা দাবার চালের মতো হবে। অস্ট্রেলিয়ার আক্রমণে নেস্টরি ইরানকুন্ডা বড় অস্ত্র হতে পারেন। মিসরের অভিজ্ঞতা ও ধৈর্যও কম নয়।
আর্জেন্টিনা বনাম কাবো ভার্দে
তারিখ: শনিবার, ৪ জুলাই
বাংলাদেশ সময়: ভোর ৪টা
ভেন্যু: হার্ড রক স্টেডিয়াম, মায়ামি, যুক্তরাষ্ট্র
আর্জেন্টিনা মাত্র দুই ম্যাচেই গ্রুপের শীর্ষস্থান নিশ্চিত করেছিল। আলজেরিয়ার বিপক্ষে ৩-০ জয়, যেখানে লিওনেল মেসি হ্যাটট্রিক করেন, শুরুতেই তাদের শক্ত অবস্থান দেয়। এরপর অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ২-০ জয়ে মেসি আরও ২ গোল করেন। গ্রুপপর্বের শেষে তিনি দারুণ এক ফ্রি-কিকও করেন এবং গোল্ডেন বুটের দৌড়ে এগিয়ে থাকেন।
কাবো ভার্দে এই বিশ্বকাপের বড় গল্পগুলোর একটি। বিশ্বকাপ অভিষেকে তারা স্পেন, উরুগুয়ে ও সৌদি আরবের সঙ্গে ড্র করে শেষ ৩২-এ জায়গা করে নেয়। তারা ইতিহাসের সবচেয়ে ছোট দেশ হিসেবে গ্রুপপর্ব পেরিয়েছে। কিন্তু পুরস্কার হিসেবে তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আর্জেন্টিনা—বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন এবং মেসির নেতৃত্বাধীন এক অভিজ্ঞ দল।
এই ম্যাচে কাবো ভার্দের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে মানসিক চাপ সামলানো। আর্জেন্টিনা দ্রুত গোল পেলে ম্যাচ একমুখী হয়ে যেতে পারে। তবে কাবো ভার্দে যতক্ষণ স্কোরলাইন ধরে রাখতে পারবে, ততক্ষণ তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়বে।
কলম্বিয়া বনাম ঘানা
তারিখ: শনিবার, ৪ জুলাই
বাংলাদেশ সময়: সকাল ৭টা ৩০ মিনিট
ভেন্যু: অ্যারোহেড স্টেডিয়াম, কানসাস সিটি, যুক্তরাষ্ট্র
কলম্বিয়া এই বিশ্বকাপে মাঠের ভেতরে যেমন উত্তেজনাপূর্ণ, মাঠের বাইরে সমর্থকদের কারণেও তেমন আলোচিত। তাদের ম্যাচগুলো অনেক সময় ঘরের মাঠের আবহ তৈরি করে। ঘানার বিপক্ষে ম্যাচটি হবে দুই ভিন্ন ফুটবল দর্শনের লড়াই। কলম্বিয়া আক্রমণাত্মক, আবেগী ও গতিশীল; ঘানা বেশি বাস্তববাদী, রক্ষণে দৃঢ় এবং ফলকেন্দ্রিক।
প্রশ্ন হলো, কলম্বিয়ার সৃজনশীলতা কি ঘানার শৃঙ্খলিত রক্ষণ ভাঙতে পারবে? ঘানা যদি ম্যাচকে ধীর করে তুলতে পারে, কলম্বিয়ার জন্য সমস্যা বাড়বে। আর কলম্বিয়া যদি দ্রুত ছন্দ পায়, ঘানাকে দীর্ঘ সময় চাপের মধ্যে থাকতে হবে।
বিদায়ী পর্ব কীভাবে চলবে
২০২৬ বিশ্বকাপের বিদায়ী পর্বে প্রতিটি ম্যাচ একবারের লড়াই। ৯০ মিনিটে ফল না হলে অতিরিক্ত সময় হবে। তাতেও বিজয়ী নির্ধারিত না হলে টাইব্রেকারে সিদ্ধান্ত হবে। শেষ ৩২ থেকে জয়ী দলগুলো শেষ ষোলোতে উঠবে। এরপর কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল এবং ১৯ জুলাই ফাইনাল অনুষ্ঠিত হবে।
এই কাঠামো বড় দলগুলোকেও সতর্ক থাকতে বাধ্য করে। গ্রুপপর্বে ভুল করলেও পরে পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকে, কিন্তু বিদায়ী পর্বে তা নেই। একটি লাল কার্ড, একটি পেনাল্টি, একটি অফসাইড সিদ্ধান্ত বা শেষ মুহূর্তের একটি গোল পুরো টুর্নামেন্টের গল্প বদলে দিতে পারে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলো
এই পর্বে কয়েকটি বড় প্রশ্ন সামনে আসছে। ব্রাজিল কি জাপানের সাম্প্রতিক জয়ের স্মৃতি মুছে দেবে? ফ্রান্স কি তাদের ভয়ংকর আক্রমণ ধরে রাখবে? মেক্সিকো কি ঘরের মাঠের চাপকে শক্তিতে রূপ দিতে পারবে? আর্জেন্টিনা কি কাবো ভার্দেকে সহজেই হারাবে, নাকি বিশ্বকাপ অভিষেকেই আরেকটি বিস্ময় দেখাবে ছোট দেশটি? রোনালদো ও মদ্রিচের মধ্যে কার যাত্রা আরও এগোবে? আর স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্র কি নিজেদের মাঠে প্রত্যাশার ভার সামলাতে পারবে?
২০২৬ বিশ্বকাপের গ্রুপপর্ব ছিল নাটকীয়, কিন্তু আসল চাপ শুরু হচ্ছে এখন। শেষ ৩২ শুধু বড় দলের শক্তি মাপার জায়গা নয়; এটি ছোট দলের স্বপ্ন দেখানোর মঞ্চও। এখানেই তৈরি হয় অপ্রত্যাশিত নায়ক, এখানেই বড় নাম হারিয়ে যায়, এখানেই এক ম্যাচে বদলে যায় ইতিহাস।
মেক্সিকো, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা—তিন স্বাগতিকই এখনো টুর্নামেন্টে আছে। ফ্রান্স, আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, ইংল্যান্ড, স্পেন, পর্তুগাল, জার্মানি—সব বড় নামও লড়াইয়ে টিকে আছে। কিন্তু বিশ্বকাপের সৌন্দর্য হলো, নাম নয়, মাঠের ৯০ মিনিটই শেষ কথা বলে।
শেষ ৩২-এর এই সূচি তাই শুধু ম্যাচের তালিকা নয়; এটি বিশ্বকাপের দ্বিতীয় অধ্যায়ের দরজা। এখন থেকে প্রতিটি বাঁশি, প্রতিটি আক্রমণ, প্রতিটি বাঁচানো শট এবং প্রতিটি গোলের ওজন অনেক বেশি। কারণ এখান থেকে আর ফেরার পথ নেই—জয় মানে স্বপ্ন বেঁচে থাকা, হার মানে বিদায়।

