ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ শিরোপা বিশ্বকাপ। চার বছর পরপর অনুষ্ঠিত এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়াই অধিকাংশ দেশের জন্য বড় অর্জন। আর শিরোপা জয় মানে ফুটবল ইতিহাসে স্থায়ী জায়গা করে নেওয়া। অথচ অর্থের হিসাবে দেখা যাচ্ছে এক বিস্ময়কর বৈপরীত্য।
২০২৬ সালের বিশ্বকাপ জিতে স্পেন পেয়েছে ৫ কোটি ডলার। অন্যদিকে ২০২৫ সালের ক্লাব বিশ্বকাপ জিতে চেলসি পেয়েছিল সর্বোচ্চ ১২ কোটি ৫০ লাখ ডলার। অর্থাৎ বিশ্বকাপজয়ী স্পেনের তুলনায় চেলসির প্রাপ্ত অর্থ আড়াই গুণের কাছাকাছি।
১৯ জুলাই ২০২৬ নিউইয়র্ক ও নিউজার্সি স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে বিশ্বকাপের শিরোপা জেতে স্পেন। বিশ্বজুড়ে ৫ বিলিয়নের বেশি মানুষ এই প্রতিযোগিতা দেখেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তারপরও বিশ্বকাপজয়ীদের পুরস্কার নতুন করে সাজানো একটি ক্লাব প্রতিযোগিতার চ্যাম্পিয়নদের অর্ধেকেরও কম।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর থেকে ফিফা যখন বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আয় করে, তখন বিজয়ী দল তুলনামূলক কম পুরস্কার পায় কেন? এর উত্তর শুধু আয়-ব্যয়ের সাধারণ হিসাবের মধ্যে নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ফিফার ব্যবসায়িক কৌশল, বিশ্বজুড়ে অর্থ বণ্টনের নীতি, ক্লাবগুলোর বিপুল পরিচালন ব্যয় এবং নতুন প্রতিযোগিতাকে প্রতিষ্ঠিত করার পরিকল্পনা।
ফিফার অর্থ আসে কোথা থেকে
পুরস্কারের পার্থক্য বুঝতে হলে প্রথমে ফিফার আয়ের কাঠামো জানতে হবে। ২০২৬ সাল পর্যন্ত চলমান চার বছরের বাণিজ্যিক চক্রে সংস্থাটি প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলার আয় করার পথে রয়েছে। এর মধ্যে শুধু ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ থেকেই প্রায় ৮.৯ বিলিয়ন ডলার আসবে বলে ধারণা করা হয়েছে।
এই বিপুল অর্থ কয়েকটি প্রধান উৎস থেকে আসে।
সবচেয়ে বড় উৎস টেলিভিশন ও সম্প্রচার স্বত্ব। চলতি বাণিজ্যিক চক্রে এই খাতের মূল্য ৪ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। এটি ফিফার মোট আয়ের প্রায় ৩৯ শতাংশ।
বিশ্বকাপের ম্যাচ সরাসরি দেখানোর অধিকার পেতে বিভিন্ন দেশের সম্প্রচার প্রতিষ্ঠানকে বিপুল অর্থ দিতে হয়। প্রতিযোগিতা যত বড় হয়, দর্শকের সংখ্যা যত বাড়ে, এই স্বত্বের মূল্যও তত বেড়ে যায়।
এরপর রয়েছে টিকিট বিক্রি এবং অতিথি আপ্যায়ন ব্যবস্থা। সাধারণ আসনের টিকিটের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ধনী দর্শকদের জন্য বিশেষ আসন, খাবার, যাতায়াত এবং অন্যান্য সুবিধাসহ আলাদা ব্যবস্থা রাখা হয়। এসব সেবা থেকে বড় অঙ্কের আয় করে ফিফা।
তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ উৎস বিপণন ও পৃষ্ঠপোষকতা। কোকা-কোলা, অ্যাডিডাস এবং ভিসার মতো বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠান ফিফার শীর্ষ পর্যায়ের অংশীদার হতে বছরে প্রায় ৭ কোটি থেকে ১০ কোটি ডলার পর্যন্ত দেয় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
এ ছাড়া প্রতিযোগিতার নাম, প্রতীক, পোশাক, খেলনা, স্মারকপণ্য এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক ব্যবহারের অনুমতি থেকেও অর্থ আসে।
এই হিসাব থেকে বোঝা যায়, বিশ্বকাপ এখন শুধু মাঠের একটি প্রতিযোগিতা নয়। এটি একই সঙ্গে বৈশ্বিক সম্প্রচার, বিজ্ঞাপন, বিপণন এবং বাণিজ্যের বিশাল আয়োজন। ফুটবলকে কেন্দ্র করে পুরো পৃথিবীর মনোযোগ এক জায়গায় এনে সেই মনোযোগকে অর্থে রূপান্তর করে ফিফা।
৮.৯ বিলিয়ন ডলার আয়, পুরস্কার মাত্র ৬৫ কোটি ৫০ লাখ
২০২৬ সালের বিশ্বকাপ থেকে ফিফার সম্ভাব্য আয় প্রায় ৮.৯ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু প্রতিযোগিতার মোট পুরস্কার তহবিল ৬৫ কোটি ৫০ লাখ ডলার।
এই অর্থও সরাসরি খেলোয়াড়দের হাতে যায় না। জাতীয় ফুটবল ফেডারেশনগুলোর মাধ্যমে তা দল ও খেলোয়াড়দের মধ্যে বণ্টিত হয়। কোন দেশের খেলোয়াড় কত টাকা পাবেন, তা সংশ্লিষ্ট ফেডারেশনের নিজস্ব নীতির ওপর নির্ভর করে।
এখানেই অনেক সমর্থক বিভ্রান্ত হন। তাদের মনে হতে পারে, ফিফা যদি এত বিপুল অর্থ আয় করে, তাহলে বিজয়ী দলকে আরও বেশি দেওয়া হচ্ছে না কেন।
কারণ ফিফা বিশ্বকাপকে শুধু পুরস্কারভিত্তিক প্রতিযোগিতা হিসেবে পরিচালনা করে না। সংস্থাটির মতে, বিশ্বকাপের আয় দিয়ে পুরো পৃথিবীর ফুটবল কাঠামোকে সহায়তা করা হয়।
প্রতিযোগিতা আয়োজনের ব্যয়, মাঠ ও প্রশিক্ষণ সুবিধা, নিরাপত্তা, যাতায়াত, প্রযুক্তি, কর্মকর্তা, সম্প্রচার ব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক খরচের পেছনে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হয়। এর সঙ্গে রয়েছে ফিফার নিজস্ব পরিচালন ব্যয়।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিশ্বকাপ থেকে আয় করা অর্থের একটি অংশ ফিফার ২১১টি সদস্য দেশের ফুটবল উন্নয়ন কার্যক্রমে দেওয়া হয়।
অনেক ছোট ও স্বল্প আয়ের দেশের ফুটবল ফেডারেশন বিশ্বকাপের পুরস্কারের চেয়ে ফিফার নিয়মিত উন্নয়ন সহায়তার ওপর বেশি নির্ভরশীল। এসব দেশ হয়তো কখনো বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পায় না, কিন্তু মাঠ নির্মাণ, প্রশিক্ষণ, তৃণমূল ফুটবল, নারী ফুটবল এবং বয়সভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ফিফার কাছ থেকে অর্থ পায়।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্বকাপ শুধু সেরা দলকে পুরস্কৃত করার প্রতিযোগিতা নয়। এটি ধনী ফুটবল বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করে অপেক্ষাকৃত দুর্বল দেশগুলোতে ছড়িয়ে দেওয়ার ব্যবস্থাও।
গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নিলেও ৯০ লাখ ডলার
ফিফার অর্থ বণ্টনের এই নীতি বোঝার আরেকটি উদাহরণ হলো গ্রুপ পর্ব থেকে বাদ পড়া দলগুলোর পুরস্কার।
২০২৬ সালের বিশ্বকাপে কোনো দল গ্রুপ পর্বেই বিদায় নিলেও ৯০ লাখ ডলার পাবে। অর্থাৎ শুধু চ্যাম্পিয়ন বা শেষ পর্যায়ে পৌঁছানো দলগুলোকেই অর্থ দেওয়া হয় না। অংশগ্রহণকারী প্রতিটি দেশকে একটি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
চ্যাম্পিয়ন স্পেন ৫ কোটি ডলার পেলেও মোট পুরস্কার তহবিলের বড় অংশ বিভিন্ন ধাপে অংশ নেওয়া দলগুলোর মধ্যে ভাগ হয়ে যায়।
ফিফা যদি বিজয়ী দলকে অনেক বেশি অর্থ দিত, তাহলে শুরুতেই বাদ পড়া এবং মাঝামাঝি পর্যায়ে বিদায় নেওয়া দেশগুলোর অংশ কমে যেত। ফলে প্রতিযোগিতার আয়কে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার যে নীতি, তা দুর্বল হয়ে পড়ত।
এ কারণেই বিশ্বকাপের পুরস্কার ব্যবস্থায় শীর্ষ দলকে সব অর্থ দেওয়ার বদলে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর মধ্যে তুলনামূলক বিস্তৃতভাবে অর্থ বিতরণ করা হয়।
ক্লাব বিশ্বকাপের হিসাব একেবারে আলাদা
জাতীয় দলের বিশ্বকাপ এবং ক্লাব বিশ্বকাপ—দুটিই ফিফার আয়োজন হলেও তাদের অর্থনৈতিক কাঠামো এক নয়।
ক্লাব বিশ্বকাপকে ৩২ দলের প্রতিযোগিতায় রূপ দেওয়া হয়েছে। নতুন এই কাঠামোর প্রথম আসর অনুষ্ঠিত হয় ২০২৫ সালের জুন ও জুলাই মাসে। প্রতিযোগিতাটির মোট পুরস্কার তহবিল নির্ধারণ করা হয় ১ বিলিয়ন ডলার।
চ্যাম্পিয়ন চেলসির সম্ভাব্য সর্বোচ্চ প্রাপ্তি ছিল ১২ কোটি ৫০ লাখ ডলার। এটি স্পেনের বিশ্বকাপ জয়ের ৫ কোটি ডলারের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি।
এই বিপুল পার্থক্যের পেছনে প্রথম কারণ ক্লাবগুলোর ব্যয়।
বড় ক্লাবগুলো সারা বছর বিপুল অঙ্কের বেতন দেয়। তাদের খেলোয়াড়দের অনেকের বার্ষিক আয় কয়েক মিলিয়ন পাউন্ডের সমান। শুধু খেলোয়াড় নয়, প্রশিক্ষক, চিকিৎসক, বিশ্লেষক, কর্মকর্তা, নিরাপত্তাকর্মী এবং অন্যান্য কর্মীদের বেতনও ক্লাবকে দিতে হয়।
এ ছাড়া একটি অতিরিক্ত আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিলে ক্লাবের খেলোয়াড়দের বিশ্রাম কমে যায়। প্রস্তুতি ও ভ্রমণ বাড়ে। ঘরোয়া মৌসুমের পরিকল্পনা ব্যাহত হতে পারে। খেলোয়াড়দের আঘাত পাওয়ার ঝুঁকিও বাড়ে।
তাই বড় ক্লাবগুলোকে অংশ নিতে উৎসাহিত করার জন্য প্রতিযোগিতাটির পুরস্কার অনেক বেশি রাখা হয়েছে।
জাতীয় দলের ক্ষেত্রে এমন ব্যয় নেই। ফুটবলাররা দেশের হয়ে খেলার সময় ক্লাবের মতো নিয়মিত বহু মিলিয়ন ডলারের বেতন পান না। একটি জাতীয় দলকে সারা বছর খেলোয়াড়দের ক্লাব পর্যায়ের বেতনও বহন করতে হয় না।
ফলে বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকে লাভজনক করে তুলতে ফিফাকে জাতীয় দলগুলোর সামনে বিশাল অঙ্কের অর্থ রাখার প্রয়োজন পড়ে না।
নতুন প্রতিযোগিতাকে প্রতিষ্ঠা করতে বেশি অর্থ
ক্লাব বিশ্বকাপের পুরস্কার বেশি হওয়ার আরেকটি বড় কারণ বাণিজ্যিক।
বিশ্বকাপ প্রায় এক শতাব্দী ধরে ফুটবলের সর্বোচ্চ প্রতিযোগিতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। এতে খেলতে কোনো দেশকে আলাদা করে অর্থের প্রলোভন দেখানোর প্রয়োজন নেই। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশ বিশ্বকাপে জায়গা পাওয়ার স্বপ্ন দেখে।
বিশ্বকাপের মর্যাদা অর্থের ওপর নির্ভরশীল নয়। একজন ফুটবলারের কাছে দেশের হয়ে বিশ্বকাপ জেতা অনেক সময় ক্লাব পর্যায়ের যেকোনো আর্থিক পুরস্কারের চেয়েও বড় অর্জন।
অন্যদিকে নতুন ৩২ দলের ক্লাব বিশ্বকাপ এখনো প্রতিষ্ঠিত প্রতিযোগিতা নয়। ২০২৫ সালের আগে বর্তমান কাঠামোতে এই আসরের অস্তিত্বই ছিল না।
তাই রিয়াল মাদ্রিদ, ম্যানচেস্টার সিটি এবং চেলসির মতো বড় ক্লাবকে প্রতিযোগিতায় আনতে ফিফাকে অনেক বেশি অর্থের ব্যবস্থা করতে হয়েছে। এসব ক্লাব অংশ নিলে তাদের কোটি কোটি সমর্থক প্রতিযোগিতাটি দেখবেন। সম্প্রচার প্রতিষ্ঠান আগ্রহী হবে। পৃষ্ঠপোষকেরা অর্থ দেবে। প্রতিযোগিতার মর্যাদাও বাড়বে।
সহজ ভাষায় বলা যায়, বিশ্বকাপের জনপ্রিয়তা আগে থেকেই তৈরি। কিন্তু নতুন ক্লাব বিশ্বকাপের জনপ্রিয়তা কিনে তৈরি করতে হচ্ছে।
পুরস্কারের বিপুল অঙ্ক সেই কৌশলেরই অংশ।
চেলসির অর্থ শুধু শিরোপার পুরস্কার নয়
চেলসির ১২ কোটি ৫০ লাখ ডলারকে শুধু একটি ফাইনাল জেতার পুরস্কার হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি বোঝা যাবে না।
ক্লাব বিশ্বকাপে একটি দলের মোট আয় নির্ভর করতে পারে অংশগ্রহণ, বাণিজ্যিক গুরুত্ব, প্রতিটি ধাপে অগ্রগতি এবং ফলাফলের ওপর। ফলে চ্যাম্পিয়ন দলের হাতে যাওয়া মোট অর্থের মধ্যে পুরো প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া এবং সফল হওয়ার বিভিন্ন অংশ যুক্ত থাকে।
ক্লাবগুলোর বাজারমূল্যও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্লাবগুলো কোটি কোটি দর্শককে আকৃষ্ট করে। তাদের উপস্থিতি ফিফাকে সম্প্রচার ও পৃষ্ঠপোষকতা থেকে বেশি অর্থ আয় করতে সাহায্য করে।
তাই ক্লাব বিশ্বকাপের অর্থকে শুধু খেলাধুলার পুরস্কার হিসেবে নয়, বড় ক্লাবগুলোর বাণিজ্যিক আকর্ষণের মূল্য হিসেবেও দেখা যায়।
স্পেনের ৫ কোটি ডলার কি সত্যিই কম
১২ কোটি ৫০ লাখ ডলারের সঙ্গে তুলনা করলে স্পেনের ৫ কোটি ডলার কম মনে হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু বিশ্বকাপের সামগ্রিক কাঠামো বিবেচনা করলে এই অর্থ একেবারে ছোট নয়।
জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের কাছে বিশ্বকাপের মূল মূল্য আর্থিক নয়। শিরোপাটি একটি দেশের ইতিহাস, জাতীয় গৌরব এবং খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত উত্তরাধিকারের অংশ হয়ে যায়।
একটি ক্লাব বিশ্বকাপ জয়ের অর্থনৈতিক মূল্য বেশি হতে পারে, কিন্তু বিশ্বকাপ জয়ের সামাজিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলনাহীন।
বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের জন্য জাতীয় দলকে অতিরিক্ত অর্থের প্রলোভন দিতে হয় না। বরং দেশগুলো নিজেরাই বাছাইপর্বে বিপুল অর্থ ব্যয় করে মূল প্রতিযোগিতায় ওঠার চেষ্টা করে।
এই স্বাভাবিক চাহিদাই ফিফাকে বিশ্বকাপের পুরস্কার তুলনামূলকভাবে সীমিত রাখার সুযোগ দেয়।
একই সংস্থার দুই ধরনের লক্ষ্য
দুই প্রতিযোগিতার পুরস্কারের পার্থক্য আসলে ফিফার দুই ধরনের লক্ষ্যকে প্রকাশ করে।
বিশ্বকাপের ক্ষেত্রে সংস্থার লক্ষ্য হলো ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আয়োজন পরিচালনা করা, বিশ্বজুড়ে আয় সৃষ্টি করা এবং সেই অর্থের একটি অংশ ২১১টি সদস্য দেশের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া।
ক্লাব বিশ্বকাপের ক্ষেত্রে লক্ষ্য হলো নতুন একটি আন্তর্জাতিক ক্লাব প্রতিযোগিতাকে দ্রুত জনপ্রিয় ও লাভজনক করে তোলা।
বিশ্বকাপ আগে থেকেই সফল। ক্লাব বিশ্বকাপকে সফল করতে এখনো বিনিয়োগ করতে হচ্ছে।
সেই কারণে বিশ্বকাপকে আয় সংগ্রহের প্রধান উৎস আর ক্লাব বিশ্বকাপকে ভবিষ্যতের বাণিজ্যিক সম্পদ তৈরির প্রকল্প হিসেবে দেখা যেতে পারে।
ফুটবলের মর্যাদা ও অর্থ সব সময় এক পথে চলে না
এই তুলনা ফুটবলের একটি বড় বাস্তবতা সামনে আনে। সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ প্রতিযোগিতাই সব সময় সবচেয়ে বেশি পুরস্কার দেয় না।
বিশ্বকাপের শক্তি তার ইতিহাস, আবেগ এবং বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতায়। ক্লাব বিশ্বকাপের শক্তি তৈরি করা হচ্ছে বড় অঙ্কের অর্থ, জনপ্রিয় ক্লাব এবং বাণিজ্যিক প্রচারের মাধ্যমে।
স্পেনের খেলোয়াড়রা ৫ কোটি ডলার পেয়েছেন, কিন্তু তারা এমন একটি শিরোপা জিতেছেন যা চার বছর পরপর আসে এবং একজন খেলোয়াড়ের জীবনে হয়তো একবারই জেতা সম্ভব।
চেলসি ১২ কোটি ৫০ লাখ ডলার পেয়েছে, কারণ ক্লাবটির সারা বছরের বিপুল ব্যয় রয়েছে এবং তাদের মতো বড় প্রতিষ্ঠান ছাড়া নতুন ক্লাব বিশ্বকাপকে আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠা করা কঠিন।
এখানে পুরস্কারের অঙ্ক প্রতিযোগিতার মর্যাদা নয়, বরং আয়োজকের বাণিজ্যিক প্রয়োজনকে বেশি প্রতিফলিত করে।
সামনে কি বিশ্বকাপের পুরস্কার আরও বাড়বে
চলতি বাণিজ্যিক চক্রে বিশ্বকাপের পুরস্কার ৫০ শতাংশ বাড়িয়েছে ফিফা। তাই ভবিষ্যতে এই অর্থ আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ক্লাব বিশ্বকাপ জনপ্রিয় হলে এর সম্প্রচার ও পৃষ্ঠপোষকতা আয়ও বাড়বে। তখন ফিফা বর্তমান ১ বিলিয়ন ডলারের পুরস্কার তহবিল ধরে রাখবে, নাকি পরিবর্তন করবে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
অন্যদিকে বিশ্বকাপ থেকে প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার আয় হওয়ার পরও বিজয়ী দল তুলনামূলক কম অর্থ পাওয়ায় সমালোচনা বাড়তে পারে। খেলোয়াড় ও জাতীয় ফেডারেশনগুলো পুরস্কারের বড় অংশ দাবি করতে পারে।
তবে ফিফা যদি বিশ্বকাপের পুরস্কার ব্যাপকভাবে বাড়ায়, তাহলে উন্নয়ন কর্মসূচি এবং ২১১টি সদস্য দেশে অর্থ বণ্টনের ওপর চাপ পড়তে পারে।
ফলে সংস্থাটিকে একই সঙ্গে তিনটি বিষয় সামলাতে হবে—বিশ্বকাপের মর্যাদা অনুযায়ী পুরস্কার বাড়ানো, সদস্য দেশগুলোর উন্নয়ন সহায়তা বজায় রাখা এবং ক্লাব বিশ্বকাপকে আর্থিকভাবে আকর্ষণীয় রাখা।
বড় ট্রফি, ছোট পুরস্কার—কিন্তু মূল্য কি সত্যিই কম
কাগজে-কলমে চেলসির ১২ কোটি ৫০ লাখ ডলার স্পেনের ৫ কোটি ডলারের চেয়ে অনেক বেশি। কিন্তু এই দুই অর্জনের মূল্য একই মাপকাঠিতে বিচার করা কঠিন।
চেলসির পুরস্কার ক্লাবের বিপুল ব্যয়, খেলোয়াড়দের বেতন এবং নতুন প্রতিযোগিতার বাণিজ্যিক প্রয়োজনের সঙ্গে সম্পর্কিত।
স্পেনের পুরস্কার এমন একটি ব্যবস্থার অংশ, যেখানে বিশ্বকাপের আয় শুধু বিজয়ীদের মধ্যে নয়, অংশগ্রহণকারী দল এবং পৃথিবীর ২১১টি সদস্য দেশের ফুটবল উন্নয়নে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
তাই বিশ্বকাপজয়ীদের কম অর্থ পাওয়ার অর্থ এই নয় যে বিশ্বকাপের গুরুত্ব কমে গেছে। বরং এটি দেখায়, ফুটবলে মর্যাদা এবং অর্থের হিসাব এক নয়।
বিশ্বকাপকে গুরুত্বপূর্ণ করতে ফিফাকে অর্থ ঢালতে হয় না। এর ইতিহাস, আবেগ এবং সম্মানই দেশগুলোকে টেনে আনে। নতুন ক্লাব বিশ্বকাপের ক্ষেত্রে সেই আকর্ষণ এখনো তৈরি হয়নি। তাই সেখানে অর্থই প্রধান প্রলোভন।
শেষ পর্যন্ত স্পেনের ট্রফি ফুটবলের সর্বোচ্চ গৌরবের প্রতীক। আর চেলসির বড় পুরস্কার ফিফার নতুন বাণিজ্যিক পরিকল্পনার প্রতিফলন। একটির শক্তি ইতিহাসে, অন্যটির শক্তি অর্থে।

