লুকা মদরিচের গল্প শুধু একজন ফুটবলারের সাফল্যের গল্প নয়; এটি যু*দ্ধ, বাস্তুচ্যুতি, শৈশবের অনিশ্চয়তা আর প্রতিকূলতার মধ্যেও স্বপ্ন আঁকড়ে থাকার গল্প। একসময় যে শিশুকে যু*দ্ধের কারণে পরিবার নিয়ে ঘর ছাড়তে হয়েছিল, হোটেলের পার্কিংয়ে ফুটবল খেলতে হয়েছিল, সেই শিশুই একদিন বিশ্বফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিগত পুরস্কার বালোঁ দর জিতে নেন। ক্রোয়েশিয়ার অধিনায়ক হিসেবে নেতৃত্ব দেন বিশ্বকাপের ফাইনালে। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে হয়ে ওঠেন তার প্রজন্মের অন্যতম সেরা মধ্যমাঠের খেলোয়াড়।
লুকা মদরিচের জন্ম ১৯৮৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর, তৎকালীন যুগোস্লাভিয়ার ক্রোয়েশিয়া প্রজাতন্ত্রের জাদারে। তার বাবা স্ত্রিপে মদরিচ ও মা রাদোইকা দোপুদ দুজনই নিটওয়্যার কারখানায় কাজ করতেন। পরিবারের বড় সন্তান মদরিচের শৈশবের একটি সময় কেটেছে দাদার পাথরের বাড়িতে। মাত্র পাঁচ বছর বয়সেই তাকে ছা*গল চরানোর কাজ করতে হয়েছিল।
কিন্তু তার শৈশব দ্রুতই বদলে যায় যু*দ্ধের অভিঘাতে। ১৯৯১ সালে ক্রোয়েশিয়ার স্বাধীনতা যু*দ্ধ শুরু হলে মদরিচের পরিবারকে নিজেদের এলাকা ছেড়ে পালাতে হয়। তার দাদা লুকা মদরিচ নিহ*ত হন এবং পরিবারের বাড়িও পু*ড়িয়ে দেওয়া হয়। যু*দ্ধের কারণে পরিবারটি শরণার্থী হিসেবে প্রায় সাত বছর একটি হোটেলে বসবাস করে।
সেই কঠিন সময়েও ফুটবল তার জীবন থেকে হারিয়ে যায়নি। বরং ফুটবলই হয়ে ওঠে যু*দ্ধের ভয়াবহতা থেকে দূরে থাকার একটি আশ্রয়। হোটেলের পার্কিং এলাকায় অন্য শিশুদের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বল নিয়ে পড়ে থাকতেন ছোট্ট মদরিচ। ১৯৯২ সালে তিনি একই সঙ্গে স্কুল ও একটি ক্রীড়া একাডেমিতে ভর্তি হন। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে থাকে তার অসাধারণ ফুটবল প্রতিভা।
শৈশবের যু*দ্ধ তাকে থামাতে পারেনি। বরং প্রতিকূলতাই তার মানসিক দৃঢ়তা তৈরি করে। পরবর্তী জীবনে মদরিচ একাধিকবার বলেছেন, যু*দ্ধের সময়কার সেই কঠিন অভিজ্ঞতা তাকে মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছে। ফুটবলের মাঠে তার ধৈর্য, চাপ সামলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং শেষ পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার মানসিকতার পেছনে সেই শৈশবের বড় ভূমিকা ছিল।
ফুটবলে পেশাদার হওয়ার পথে তার প্রথম বড় সুযোগ আসে ক্রোয়েশিয়ার দিনামো জাগরেবের মাধ্যমে। এর আগে জাদারের যুব পর্যায়ে খেলার পর ২০০৩–০৪ মৌসুমে দিনামোর মূল দলে জায়গা পান। তবে শুরুর দিকে তাকে ধারে খেলতে পাঠানো হয়। জ্রিনিস্কি মোস্তারে ও ইন্টার জাপ্রেশিচে খেলার অভিজ্ঞতা তাকে আরও পরিণত করে তোলে।
দিনামো জাগরেবে ফিরে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দেন মদরিচ। চার মৌসুমে ক্লাবটির হয়ে ৯৪ ম্যাচে ২৬ গোল করেন। তার অসাধারণ পারফরম্যান্স নজর কাড়ে ইউরোপের বড় ক্লাবগুলোর।
২০০৮ সালে মদরিচ যোগ দেন ইংল্যান্ডের টটেনহ্যাম হটস্পারে। প্রায় ১ কোটি ৬৫ লাখ ইউরোর বিনিময়ে করা সেই দলবদল তখন টটেনহ্যামের ইতিহাসে সর্বোচ্চ পারিশ্রমিকের দলবদলগুলোর একটি ছিল। চার মৌসুমে ক্লাবটির হয়ে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ১৫৯ ম্যাচে ১৭ গোল করেন তিনি। তবে গোলের চেয়ে তার পাসিং, খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ এবং মধ্যমাঠ থেকে আক্রমণ তৈরির দক্ষতাই তাকে আলাদা পরিচিতি এনে দেয়।
এরপর আসে ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অধ্যায়। ২০১২ সালে প্রায় ৩ কোটি ৫০ লাখ ইউরোর বিনিময়ে মদরিচ যোগ দেন স্পেনের রিয়াল মাদ্রিদে। শুরুতে নতুন পরিবেশে তাকে নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও খুব দ্রুতই তিনি দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হয়ে ওঠেন।
রিয়াল মাদ্রিদের মধ্যমাঠে মদরিচের সঙ্গে টনি ক্রুস ও কাসেমিরোর সমন্বয় একসময় ইউরোপীয় ফুটবলের অন্যতম শক্তিশালী মধ্যমাঠ হিসেবে বিবেচিত হয়। তার নিখুঁত পাস, বল ধরে রাখার ক্ষমতা, দূরপাল্লার শট, খেলার ছন্দ নিয়ন্ত্রণ এবং চাপের মধ্যে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা রিয়াল মাদ্রিদের সাফল্যে বড় ভূমিকা রাখে।
রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে তিনি একের পর এক শিরোপা জিতেছেন। তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে উজ্জ্বল সময় আসে ২০১৮ সালে। সে বছর রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ের পাশাপাশি রাশিয়া বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়াকে নেতৃত্ব দিয়ে ফাইনালে তোলেন মদরিচ।
বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়ার অসাধারণ যাত্রায় মদরিচ ছিলেন দলের প্রাণ। গ্রুপ পর্ব থেকে নকআউট পর্ব—প্রতিটি ম্যাচে মধ্যমাঠে তার নিয়ন্ত্রণ ও নেতৃত্ব ছিল চোখে পড়ার মতো। শেষ পর্যন্ত ক্রোয়েশিয়া ফ্রান্সের কাছে ফাইনালে হেরে গেলেও মদরিচ জিতে নেন বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার গোল্ডেন বল।
এরপর আসে সেই স্বীকৃতি, যা দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপীয় ফুটবলের কয়েকজন তারকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। ২০১৮ সালে লুকা মদরিচ জিতে নেন বালোঁ দর। লিওনেল মেসি ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর আধিপত্যের সময়ে এই পুরস্কার জিতে তিনি ব্যতিক্রমী এক কৃতিত্ব গড়েন।
ক্রোয়েশিয়ার জাতীয় দলেও তার অবস্থান অনন্য। ২০০৬ সালে আন্তর্জাতিক ফুটবলে অভিষেকের পর তিনি দলের অন্যতম প্রধান খেলোয়াড়ে পরিণত হন। দীর্ঘ সময় জাতীয় দলকে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি ক্রোয়েশিয়ার হয়ে সবচেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা খেলোয়াড়দের একজন এবং দলের অন্যতম প্রতীক হয়ে ওঠেন।
মদরিচের খেলায় সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় তার শারীরিক শক্তি নয়, বরং ফুটবল বুদ্ধিমত্তা। তুলনামূলকভাবে ছোটখাটো গড়নের এই খেলোয়াড় কীভাবে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী মধ্যমাঠগুলোর বিপক্ষে আধিপত্য বিস্তার করেন, সেটিই তার বিশেষত্ব। কখন পাস দিতে হবে, কখন গতি কমাতে হবে, কখন আ*ক্রমণ তৈরি করতে হবে কিংবা কখন প্রতিপক্ষের চাপ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে—এসব সিদ্ধান্তে তার অসাধারণ দক্ষতা তাকে আলাদা করে।
দিনামো জাগরেব, টটেনহ্যাম ও রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে দলগতভাবে বহু শিরোপা জিতেছেন মদরিচ। ব্যক্তিগতভাবে পেয়েছেন বালোঁ দর, বিশ্বকাপের গোল্ডেন বলসহ অসংখ্য পুরস্কার। ২০০৭ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত রেকর্ড নয়বার ক্রোয়েশিয়ার বর্ষসেরা ফুটবলারের পুরস্কারও জিতেছেন।
তার জন্মদিনে আমাদের শুভেচ্ছা।

