উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগে আজ মুখোমুখি হচ্ছে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন প্যারিস সেন্ট জার্মেই ও দুর্দান্ত ছন্দে থাকা বার্সেলোনা। ইউরোপীয় ফুটবলের দুই শক্তিশালী দলের এই লড়াই ঘিরে সমর্থকদের প্রত্যাশা তুঙ্গে। একদিকে শিরোপা ধরে রাখার লক্ষ্যে এগিয়ে চলা পিএসজি, অন্যদিকে একের পর এক জয় তুলে নিয়ে অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠা বার্সেলোনা—সব মিলিয়ে জমজমাট এক ম্যাচের অপেক্ষা।
দুই দলই এবারের ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় এখন পর্যন্ত নিজেদের প্রথম দুই ম্যাচ জিতেছে। পিএসজি হারিয়েছে স্লোভান ব্রাতিস্লাভা ও ম্যানচেস্টার সিটিকে। অন্যদিকে বার্সেলোনা বড় ব্যবধানে পরাজিত করেছে গালাতাসারাই ও ফেইনুর্দকে। ফলে দুই দলের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স বিবেচনায় ম্যাচটি শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ছন্দে ফিরেছে পিএসজি, তবে রক্ষণে দুর্বলতা
মৌসুমের শুরুতে ঘরোয়া লিগে টানা তিন ম্যাচ জয়হীন থাকার পর দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে পিএসজি। সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে টানা ছয় ম্যাচে জয়ের দেখা পেয়েছে লুইস এনরিকের দল। এই সময়ে প্রতিপক্ষের জালে ১৯ গোল করেছে তারা। সর্বশেষ ফরাসি লিগেও স্ত্রাসবুরের বিপক্ষে পিছিয়ে পড়ার পর ঘুরে দাঁড়িয়ে জয় তুলে নেয় দলটি।
তবে আক্রমণে দুর্দান্ত হলেও পিএসজির রক্ষণ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। চলতি মৌসুমে ১০ ম্যাচে মাত্র একবার প্রতিপক্ষকে গোল করতে দেয়নি তারা। সর্বশেষ চার ম্যাচেই গোল হজম করেছে বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা। বার্সেলোনার মতো আক্রমণাত্মক দলের বিপক্ষে এই দুর্বলতা বড় সমস্যায় পরিণত হতে পারে।
পিএসজির জন্য আরেকটি দুঃসংবাদ হলো, উরুর চোটের কারণে কয়েক সপ্তাহের জন্য মাঠের বাইরে ছিটকে গেছেন নুনো মেন্দেস। তবে সপ্তাহান্তের ম্যাচে বিশ্রামে থাকা উইলিয়ান পাচো, ভিতিনিয়া, ফাবিয়ান রুইজ, আশরাফ হাকিমি, উসমান দেম্বেলে ও দেজিরে দুয়ে মূল একাদশে ফিরতে পারেন। তাঁদের সঙ্গে অধিনায়ক মারকিনিওসের উপস্থিতিও দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে।
অপ্রতিরোধ্য বার্সেলোনা, গোলের বন্যা
হান্সি ফ্লিকের অধীনে বার্সেলোনা এখন দুর্দান্ত ছন্দে রয়েছে। চলতি মৌসুমে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে নিজেদের প্রথম ১১টি ম্যাচেই জয় পেয়েছে কাতালান ক্লাবটি। এসব ম্যাচে তারা করেছে ৪৮ গোল, অর্থাৎ প্রতি ম্যাচে গড়ে চারটিরও বেশি গোল। ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগের দলগুলোর মধ্যে এই গোলসংখ্যা সর্বোচ্চ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
চ্যাম্পিয়নস লিগেও আক্রমণাত্মক ফুটবলের পরিচয় দিয়েছে বার্সেলোনা। ফেইনুর্দের বিপক্ষে পাঁচটি এবং গালাতাসারাইয়ের বিপক্ষে চারটি গোল করেছে দলটি। টানা চারটি ইউরোপীয় ম্যাচে অন্তত চার গোল করার নজিরও গড়েছে তারা। ফলে পিএসজির দুর্বল রক্ষণকে কাজে লাগিয়ে বার্সেলোনা বড় ব্যবধানে গোল করার চেষ্টা করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে বার্সেলোনার রক্ষণও পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য নয়। রিয়াল বেতিসের বিপক্ষে ম্যাচে চোট পাওয়ায় জুলস কুন্দে ও এরিক গার্সিয়া এই ম্যাচে খেলতে পারবেন না। জেরার্দ মার্তিন ও গাব্রিয়েল জেসুসও কিছুটা চোটের সমস্যায় পড়েছিলেন। ফলে রক্ষণ সামলানো এবং আক্রমণের ভারসাম্য বজায় রাখা ফ্লিকের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে।
অন্যদিকে পেশির চোট কাটিয়ে মাঠে ফিরেছেন রাফিনিয়া। চলতি মৌসুমে ইতিমধ্যে ১৪ গোল করা এই ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড পিএসজির বিপক্ষে শুরুর একাদশে ফিরতে পারেন। তাঁর সঙ্গে লামিনে ইয়ামালের উপস্থিতি বার্সেলোনার আক্রমণকে আরও বিপজ্জনক করে তুলতে পারে।
বার্সেলোনার তরুণ তারকা লামিনে ইয়ামাল এবারের চ্যাম্পিয়নস লিগে প্রথম দুই ম্যাচে একটি গোল ও চারটি সহায়তা করেছেন। দুই ম্যাচেই দুটি করে গোলে সহায়তা দিয়ে নিজের সৃজনশীলতার প্রমাণ দিয়েছেন তিনি। স্প্যানিশ লিগেও দুর্দান্ত ছন্দে রয়েছেন ইয়ামাল। নয় ম্যাচে তাঁর গোল আটটি, পাশাপাশি সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন ছয়টি গোল।
অন্যদিকে পিএসজির আক্রমণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন উসমান দেম্বেলে। ম্যানচেস্টার সিটির বিপক্ষে জয়ে একটি গোল ও একটি গোলে সহায়তা করেছিলেন তিনি। পিএসজির হয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগে ৪২ ম্যাচে তাঁর গোল ও গোলে সহায়তার সংখ্যা মিলিয়ে ৩৩টি। এর মধ্যে গোল ২১টি এবং সহায়তা ১২টি।
দুই দলের আক্রমণভাগের এই তারকাদের পারফরম্যান্স ম্যাচের ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। বার্সেলোনার আক্রমণাত্মক খেলার বিপরীতে পিএসজি নিজেদের গতিময় আক্রমণ কাজে লাগাতে পারলে ম্যাচটি আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়ে উঠবে।
ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় পিএসজি ও বার্সেলোনা এর আগে বহুবার মুখোমুখি হয়েছে। দুই দলের পারস্পরিক লড়াইয়ে পিএসজির জয় ছয়টি, ড্র চারটি এবং বার্সেলোনার জয় ছয়টি—অর্থাৎ জয়সংখ্যায় দুই দল সমানে সমান। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এবার বড় ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় ১৭তমবারের মতো মুখোমুখি হচ্ছে তারা।
তবে সাম্প্রতিক দুই সাক্ষাতে এগিয়ে রয়েছে পিএসজি। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ মৌসুমের চ্যাম্পিয়নস লিগে বার্সেলোনার মাঠে ২-১ গোলে জিতেছিল ফরাসি ক্লাবটি। এ ছাড়া চ্যাম্পিয়নস লিগে টানা ১২ ম্যাচ অপরাজিত রয়েছে পিএসজি। আরেকটি ম্যাচ হার এড়াতে পারলেই প্রতিযোগিতায় নিজেদের অপরাজিত থাকার সর্বোচ্চ রেকর্ডের কাছাকাছি পৌঁছে যাবে তারা।
সব মিলিয়ে পিএসজি-বার্সেলোনা ম্যাচে আক্রমণাত্মক ফুটবল, তারকাদের ব্যক্তিগত নৈপুণ্য এবং রক্ষণ সামলানোর লড়াই—সবকিছুরই সম্ভাবনা রয়েছে। বার্সেলোনা তাদের অবিশ্বাস্য গোল করার ধারা ধরে রাখতে চাইবে, আর পিএসজি চাইবে নিজেদের মাঠে জয় তুলে নিয়ে শিরোপা ধরে রাখার পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে যেতে। দুই দলের বর্তমান ছন্দ ও রক্ষণগত দুর্বলতা বিবেচনায় গোলসমৃদ্ধ এক ম্যাচ দেখার প্রত্যাশা করতেই পারেন ফুটবলপ্রেমীরা।

