স্প্যানিশ ফুটবলের সবচেয়ে আলোচিত দ্বৈরথ এল ক্লাসিকোতে দারুণ এক জয় পেয়েছে রিয়াল মাদ্রিদ। কিলিয়ান এমবাপ্পের জোড়া গোলে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বার্সেলোনাকে তাদের নিজেদের মাঠে ২-১ ব্যবধানে হারিয়েছে হোসে মরিনহোর দল। রোববার (২৫ অক্টোবর) ক্যাম্প ন্যুতে অনুষ্ঠিত ম্যাচে শেষ মুহূর্তের গোলে জয় নিশ্চিত করে রিয়াল। এই হারে চলতি মৌসুমে স্প্যানিশ লিগে বার্সেলোনার টানা জয়ের ধারা থেমে গেছে।
ম্যাচের প্রথমার্ধে এমবাপ্পের গোলে এগিয়ে যায় রিয়াল মাদ্রিদ। দ্বিতীয়ার্ধে রাফিনিয়া সমতা ফেরালে ঘুরে দাঁড়ানোর আশা জাগে বার্সেলোনার। কিন্তু ম্যাচের শেষদিকে আবারও গোল করে সব হিসাব বদলে দেন ফরাসি তারকা এমবাপ্পে।
এই জয়ে লিগের শীর্ষে থাকা বার্সেলোনার সঙ্গে রিয়ালের পয়েন্টের ব্যবধান কমে দাঁড়িয়েছে তিনে। অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের পেছনে থেকে তৃতীয় অবস্থানে থাকলেও শিরোপার লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিন পয়েন্ট তুলে নিয়েছে মরিনহোর দল।
প্রথমার্ধে এমবাপ্পের গোলে এগিয়ে রিয়াল
ম্যাচের শুরুতে দুই দলই কিছুটা সতর্কভাবে খেলতে থাকে। বলের দখল ও আক্রমণ তৈরির চেষ্টা থাকলেও প্রথমদিকে পরিষ্কার গোলের সুযোগ খুব বেশি তৈরি হয়নি।
বার্সেলোনার তরুণ ডিফেন্ডার পাউ কুবারসি একাধিকবার এমবাপ্পের আক্রমণ প্রতিহত করেন। অন্যদিকে রিয়ালের মার্ক কুকুরেয়া বার্সেলোনার ১৯ বছর বয়সী তারকা লামিনে ইয়ামালকে কড়া নজরদারিতে রাখেন।
নিউক্যাসল থেকে বার্সেলোনায় যোগ দেওয়া অ্যান্থনি গর্ডন নিজের প্রথম এল ক্লাসিকোতে আক্রমণ তৈরির চেষ্টা করেন। তাঁর পেছন দিকে বাড়ানো পাস থেকে রাফিনিয়া শট নিলেও বল অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়।
ম্যাচের আধা ঘণ্টা পূর্ণ হওয়ার আগেই চোটের কারণে মাঠ ছাড়তে হয় বার্সেলোনার তরুণ ডিফেন্ডার জাভি এসপার্টকে। তাঁর পরিবর্তে মাঠে নামেন আলেহান্দ্রো বালদে।
এদিকে অসুস্থতার কারণে থিবো কোর্তোয়া দলে না থাকায় রিয়ালের গোলবার সামলানোর দায়িত্ব পান আন্দ্রি লুনিন। গর্ডনের একটি বিপজ্জনক শট ঠেকিয়ে দলকে বিপদমুক্ত করেন তিনি।
এরপর ম্যাচের ৪১ মিনিটে আসে রিয়ালের প্রথম গোল। আক্রমণ ঠেকাতে গিয়ে বার্সেলোনার জেরার্দ মার্তিন বল পরিষ্কার করার চেষ্টা করেন। কিন্তু বল গিয়ে লাগে এমবাপ্পের শরীরে এবং সেখান থেকে জালে জড়িয়ে যায়। চলতি লিগ মৌসুমে এটি ছিল ফরাসি তারকার দশম গোল।
গোল হজমের পর সমতায় ফেরার ভালো সুযোগ পেয়েছিল বার্সেলোনা। কিন্তু গোলের সামনে সুবিধাজনক অবস্থানে থেকেও লক্ষ্যভেদ করতে পারেননি লামিনে ইয়ামাল।
প্রথমার্ধের শেষদিকে ইয়ান দিয়োমান্দেও রিয়ালের ব্যবধান বাড়ানোর সুযোগ পান। তবে তাঁর নেওয়া শট পাশের জালে লাগে। ফলে এক গোলের ব্যবধান নিয়েই বিরতিতে যায় দুই দল।
রাফিনিয়ার গোলে ম্যাচে ফেরে বার্সেলোনা
দ্বিতীয়ার্ধে আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে স্বাগতিক বার্সেলোনা। প্রথমার্ধে তুলনামূলক নিষ্প্রভ থাকা রাফিনিয়া ধীরে ধীরে আক্রমণে সক্রিয় হতে থাকেন।
অবশেষে ৬১ মিনিটে সমতা ফেরান ব্রাজিলিয়ান এই ফরোয়ার্ড। পেদ্রির বাড়ানো বল পেয়ে জুড বেলিংহামের দুই পায়ের মাঝ দিয়ে নিচু শট নেন রাফিনিয়া। রিয়ালের গোলরক্ষক লুনিন চেষ্টা করেও বল আটকাতে পারেননি।
এই গোলের মাধ্যমে চলতি লিগে নিজের গোলসংখ্যা ১৩-তে নিয়ে যান রাফিনিয়া। একই সঙ্গে ম্যাচে নতুন করে প্রাণ ফিরে পায় বার্সেলোনা।
সমতায় ফেরার পর স্বাগতিকরা আরও চাপ সৃষ্টি করতে থাকে। কর্নার থেকে জেরার্দ মার্তিনের বিপজ্জনক প্রচেষ্টা দুর্দান্তভাবে ঠেকিয়ে দেন লুনিন। এরপর লামিনে ইয়ামালের বাঁকানো শট অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়।
বিকল্প খেলোয়াড় হিসেবে নামা ফ্রেঙ্কি ডি ইয়ংও গোলের সুযোগ পেয়েছিলেন। তবে তাঁর প্রচেষ্টা প্রতিহত করেন রিয়ালের ডিফেন্ডার ডিন হাউসেন।
এ সময় ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই নিজেদের দিকে নিয়ে এসেছিল বার্সেলোনা। কিন্তু একের পর এক সুযোগ তৈরি করেও এগিয়ে যেতে না পারার মূল্য শেষ পর্যন্ত দিতে হয় তাদের।
শেষ মুহূর্তে এমবাপ্পের জয়সূচক গোল
ম্যাচ যখন ড্রয়ের দিকে এগোচ্ছিল, তখনই দ্রুত পাল্টা আক্রমণ থেকে জয়সূচক গোল আদায় করে নেয় রিয়াল মাদ্রিদ।
বার্সেলোনার বদলি খেলোয়াড় গ্যাব্রিয়েল জেসুস বলের নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর সুযোগ কাজে লাগায় সফরকারীরা। রিয়ালের দ্রুত আক্রমণে এদুয়ার্দো কামাভিঙ্গা পাউ কুবারসিকে পেছনে ফেলে গোলমুখে এগিয়ে যান।
নিজে শট না নিয়ে তিনি বল বাড়িয়ে দেন ফাঁকায় থাকা এমবাপ্পেকে। বার্সেলোনার গোলরক্ষক জোয়ান গার্সিয়া তখন নিজের অবস্থান ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলেন। সুযোগ বুঝে ফাঁকা জালে বল পাঠিয়ে ম্যাচে নিজের দ্বিতীয় গোল করেন এমবাপ্পে।
৮৮ মিনিটের এই গোলেই নিশ্চিত হয় রিয়ালের ২-১ ব্যবধানের জয়। একই সঙ্গে ২০২৪ সালে প্যারিস সাঁ জার্মেই থেকে রিয়ালে যোগ দেওয়ার পর ক্লাবটির হয়ে ১০০ গোলের মাইলফলক স্পর্শ করেন ফরাসি তারকা।
মরিনহোর অধীনে ছন্দে ফিরছে রিয়াল
দুই মৌসুম শিরোপাহীন থাকার পর অভিজ্ঞ পর্তুগিজ কোচ হোসে মরিনহোকে আবারও দায়িত্ব দেয় রিয়াল মাদ্রিদ। বার্সেলোনার আধিপত্যের জবাব দেওয়াই ছিল ক্লাবটির অন্যতম লক্ষ্য।
মরিনহোর অধীনে ধীরে ধীরে নিজেদের গুছিয়ে নিচ্ছে মাদ্রিদের দলটি। সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে টানা পঞ্চম জয় তুলে নিয়েছে তারা। গুরুত্বপূর্ণ এই ম্যাচে নিষেধাজ্ঞার কারণে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রকে না পেলেও দলীয় প্রচেষ্টায় জয় নিশ্চিত করেছে রিয়াল।
অন্যদিকে বার্সেলোনার জন্য সময়টা কঠিন হয়ে উঠেছে। হানসি ফ্লিকের দল চলতি লিগে প্রথম নয়টি ম্যাচের সবগুলো জিতেছিল। কিন্তু মঙ্গলবার চ্যাম্পিয়নস লিগে প্যারিস সাঁ জার্মেইর কাছে পরাজয়ের পর এবার ঘরোয়া লিগেও হারতে হলো।
ফ্লিক দায়িত্ব নেওয়ার পর আগের সাতটি এল ক্লাসিকোর ছয়টিতে জয় পেয়েছিল বার্সেলোনা। সেই তুলনায় এবারের ম্যাচে প্রত্যাশিত ছন্দে দেখা যায়নি কাতালানদের।
ম্যাচ শেষে বার্সেলোনার মিডফিল্ডার পেদ্রি দলের পারফরম্যান্স নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, বিশেষ করে প্রথমার্ধে নিজেদের স্বাভাবিক খেলাটা খেলতে পারেনি বার্সেলোনা। অনেক জায়গায় আরও ভালো করার সুযোগ ছিল।
তবে এই হারের মধ্যেই পুরো মৌসুমের ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে যায় না বলে মনে করেন তিনি। সামনে এখনও দীর্ঘ পথ বাকি রয়েছে।
শিরোপার লড়াইয়ে নতুন উত্তেজনা
এল ক্লাসিকোতে এই জয়ের ফলে স্প্যানিশ লিগের শিরোপার লড়াই আরও জমে উঠেছে। ১০ ম্যাচ শেষে বার্সেলোনা ২৭ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে রয়েছে। ২৬ পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ এবং ২৪ পয়েন্ট নিয়ে তৃতীয় স্থানে রিয়াল মাদ্রিদ।
মৌসুমের শুরুতে টানা নয় ম্যাচ জিতে শক্ত অবস্থানে থাকা বার্সেলোনা প্রথমবারের মতো হোঁচট খেল। অন্যদিকে কঠিন প্রতিপক্ষের মাঠে জয় পাওয়ায় রিয়ালের আত্মবিশ্বাস আরও বাড়বে।
বিশেষ করে এমবাপ্পের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স এবং মরিনহোর অধীনে দলের ধারাবাহিক উন্নতি মাদ্রিদ সমর্থকদের নতুন আশা দেখাচ্ছে।
ক্যাম্প ন্যুর এই জয় শুধু তিন পয়েন্ট অর্জনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর মাঠে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ জিতে রিয়াল মাদ্রিদ জানান দিয়েছে, এবারের লিগ শিরোপার লড়াইয়ে তারাও শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী।

