বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটে বিয়ে ও মাতৃত্বের পর খেলায় ফেরা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অনেক দেশ নারী খেলোয়াড়দের মাতৃত্বকালীন ছুটি, বেতন ও পুনর্বাসনের সুযোগ দিলেও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডে (বিসিবি) এ বিষয়ে এখনো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা নেই। ফলে সন্তান জন্মের পর ক্যারিয়ার চালিয়ে যাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়ছেন নারী ক্রিকেটাররা।
জাতীয় দলের সাবেক পেসার সুরাইয়া আজমিনের অভিজ্ঞতা এই সমস্যার একটি উদাহরণ। গত ৯ মে বেতনসহ মাতৃত্বকালীন ছুটির আবেদন জানিয়ে বিসিবিকে ইমেইল করেছিলেন তিনি। কিন্তু বোর্ডের কাছ থেকে কোনো উত্তর পাননি। আগস্টে সন্তান জন্ম দেওয়ার পর ঘরোয়া ক্রিকেটে বোর্ডের চুক্তিবদ্ধ খেলোয়াড়দের তালিকা থেকে তার নাম বাদ পড়ে। ছুটির আবেদন ও বকেয়া বেতনের বিষয়টিও তখন পর্যন্ত নিষ্পত্তি হয়নি।
সুরাইয়ার ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। নারী ক্রিকেটারদের চুক্তির নিরাপত্তা, আর্থিক সহায়তা এবং সন্তান জন্মের পর মাঠে ফেরার সুযোগ নিশ্চিত করতে কার্যকর নীতিমালার প্রয়োজনীয়তা আবারও সামনে এসেছে।
২০১২ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের হয়ে ১৬টি একদিনের আন্তর্জাতিক ও ৫৪টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলেছেন সাবেক ওপেনার সানজিদা ইসলাম ময়না। ২০২০ সালে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটার মিম মোসাদ্দেককে বিয়ে করেন তিনি। এরপর ২০২৪ সাল পর্যন্ত ঘরোয়া ক্রিকেটে খেলেছেন। ২০২৫ সালে মা হওয়ার পর সন্তান লালন-পালনের জন্য বিরতি নেন। তবে এরপর আর ক্রিকেটে ফিরতে পারেননি।
সানজিদার মতে, বিয়ে ও মাতৃত্ব নিয়ে প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি নারী ক্রিকেটারদের পেশাগত জীবনে প্রভাব ফেলে। অনেক সময় কর্মকর্তা ও নির্বাচকেরা মনে করেন, বিয়ে বা সন্তান হওয়ার পর একজন নারী খেলোয়াড়ের পক্ষে দীর্ঘদিন খেলা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। এ কারণে তাঁদের পেছনে বিনিয়োগের আগ্রহও কমে যেতে পারে।
তিনি মনে করেন, মাতৃত্বকালীন সহায়তার ব্যবস্থা থাকলে বিয়ের পরও অনেক নারী ক্রিকেটার দীর্ঘ সময় খেলতে পারতেন। তাঁর অভিজ্ঞতায়, ক্যারিয়ার দীর্ঘ করার চিন্তা থেকে অনেক খেলোয়াড় বিয়ের সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দেন, আবার কেউ কেউ বিয়ের বিষয়টি আড়ালেও রাখেন।
সুরাইয়ার অভিজ্ঞতাতেও একই ধরনের অনিশ্চয়তা রয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, একজন খেলোয়াড়ের বয়স বাড়লে কিংবা বিয়ে হলে অনেকেই ধরে নেন যে তাঁর ক্রিকেট ক্যারিয়ার আর দীর্ঘ হবে না। সন্তান হলে মাঠে ফেরার সম্ভাবনা আরও কমে যায় বলে মনে করা হয়।
বোর্ডের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া না পাওয়ায় নিজের ক্রিকেটে ফেরার আগ্রহও কমে গেছে বলে জানিয়েছেন সুরাইয়া। তাঁর মতে, বোর্ড সহযোগিতার আশ্বাস দিলে মাঠে ফেরার ইচ্ছা আরও দৃঢ় হতো। ২০২৫ সালে ঢাকা প্রিমিয়ার বিভাগ নারী ক্রিকেট লিগে গুলশান ইউথ ক্লাবের হয়ে খেলেছিলেন তিনি।
সন্তান লালন-পালন ও ক্রিকেটের দায়িত্ব একসঙ্গে সামলানোর কঠিন অভিজ্ঞতা রয়েছে সাবেক জাতীয় ক্রিকেটার এবং আন্তর্জাতিক আম্পায়ার সাথিরা জাকির জেসিরও। বিবাহিত অবস্থায় জাতীয় দলের সহ-অধিনায়ক থাকাকালেও তাঁর মনে হতো, হয়তো বেশিদিন খেলতে পারবেন না। মা হওয়ার পরও খেলা চালিয়ে গেলেও বিষয়টি সহজ ছিল না।
জেসির মতে, ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় অনেক নারী ক্রিকেটার সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দেন। বর্তমানে আম্পায়ারিংয়ে নিজের অবস্থান ধরে রাখার পরও দ্বিতীয়বার সন্তান নেওয়ার কথা ভাবলে তাঁকে ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করতে হয়। কারণ, এ সময় বিসিবি কতটা সহযোগিতা করবে, তা নিয়ে তাঁর নিশ্চয়তা নেই।
অন্যান্য দেশের ক্রিকেটে মাতৃত্বকালীন সহায়তা
নারী ক্রিকেটারদের সন্তান জন্মের পর মাঠে ফেরার প্রক্রিয়া সহজ করতে গত ২২ জুন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) একটি নির্দেশিকা চালু করে। এতে প্রস্তুতি, মূল্যায়ন, পুনরুদ্ধার, ফিটনেস অর্জন, মাঠে প্রত্যাবর্তন এবং পারফরম্যান্স উন্নয়নের মতো ছয়টি ধাপ রয়েছে। চিকিৎসকের পরামর্শ, শারীরিক সক্ষমতা যাচাই এবং ধাপে ধাপে অনুশীলনের মাধ্যমে খেলোয়াড়দের নিরাপদে ক্রিকেটে ফেরার বিষয়টি এতে গুরুত্ব পেয়েছে।
তবে আইসিসির এই নির্দেশিকা মূলত মাঠে ফেরার প্রক্রিয়া নিয়ে। এটি নিজে থেকে মাতৃত্বকালীন ছুটিতে বেতন বা চুক্তির নিশ্চয়তা দেয় না। এসব সুবিধা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট ক্রিকেট বোর্ডের নিজস্ব নীতিমালা প্রয়োজন।
অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের ক্রিকেট কর্তৃপক্ষ চুক্তিবদ্ধ নারী ক্রিকেটারদের জন্য বেতনসহ মাতৃত্বকালীন ছুটির ব্যবস্থা রেখেছে। পাকিস্তানও ২০২১ সালে অভিভাবকত্ব-সহায়তা নীতি চালু করে। এর পরের বছরই সন্তান জন্মের মাত্র ছয় মাস পর শিশু ও একজন সহায়তাকারীকে সঙ্গে নিয়ে বিশ্বকাপে পাকিস্তান দলকে নেতৃত্ব দেন বিসমাহ মারুফ।
বাংলাদেশের সাবেক ক্রিকেটার ফাতেমা তুজ জোহরা অস্ট্রেলিয়া ও চীনে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে জানিয়েছেন, এসব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবধান স্পষ্ট। অস্ট্রেলিয়ায় মাতৃত্বকালীন ছুটিতে বেতন দেওয়ার পাশাপাশি চিকিৎসাসেবা এবং খেলায় ফেরার উপযুক্ততা যাচাইয়ের জন্য ফিটনেস পরীক্ষার ব্যবস্থাও রয়েছে।
ফাতেমার মতে, বাংলাদেশের জাতীয় দলের খেলোয়াড়েরা অনেক সময় পরিবারের আর্থিক ভরসা হয়ে ওঠেন। তাই গর্ভধারণের সিদ্ধান্ত তাঁদের জন্য শুধু ব্যক্তিগত বিষয় থাকে না; এর সঙ্গে আয়, পেশাগত ভবিষ্যৎ ও পারিবারিক নিরাপত্তাও জড়িয়ে থাকে।
তিনি মনে করেন, মাতৃত্বকালীন সহায়তার নিশ্চয়তা না থাকায় অনেক নারী খেলোয়াড় পারিবারিক জীবন ও ক্রিকেট ক্যারিয়ারের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে সমস্যায় পড়েন। আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে তাঁদের পক্ষে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করা সহজ হতো।
বিসিবির বক্তব্য কী?
বিসিবির নারী বিভাগের প্রধান রফিকুল ইসলাম বাবু জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে কোনো নারী ক্রিকেটার অন্তঃসত্ত্বা হলে বা মাতৃত্বকালীন ছুটি চাইলে বোর্ড আইসিসির নির্দেশিকা অনুসরণ করবে। তবে এত দিন কেন এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরি হয়নি, সে সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত জানাতে পারেননি।
সুরাইয়া আজমিনের বকেয়া বেতন ও চুক্তির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, বকেয়া পরিশোধের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে এবং দ্রুত তা মিটিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।
বিসিবির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নিজামউদ্দিন চৌধুরীও আনুষ্ঠানিক মাতৃত্বকালীন নীতিমালার অভাবের কথা স্বীকার করেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে এ ধরনের বিষয়গুলো আলাদাভাবে বিবেচনা করে সমাধানের চেষ্টা করা হয়। তিনি আরও জানান, যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ও সুরক্ষাবিষয়ক নীতি ইতিমধ্যে কার্যকর হয়েছে এবং বাকি নীতিমালাগুলোও যত দ্রুত সম্ভব চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
প্রয়োজন সুস্পষ্ট ও কার্যকর নীতিমালা
বিসিবি আইসিসির নির্দেশিকা অনুসরণের আশ্বাস দিলেও মাতৃত্বকালীন ছুটির সময় বেতন, চুক্তির ধারাবাহিকতা, চিকিৎসা সহায়তা এবং সন্তান জন্মের পর মাঠে ফেরার সুযোগ নিয়ে এখনো স্পষ্ট নীতিমালা নেই।
নারী ক্রিকেটারদের জন্য কার্যকর মাতৃত্বকালীন নীতিমালা চালু হলে তাঁরা পরিবার ও পেশাগত জীবনের মধ্যে ভারসাম্য রাখার বিষয়ে আরও নিশ্চয়তা পাবেন। একই সঙ্গে অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের ধরে রাখা এবং নারী ক্রিকেটের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নেও তা সহায়ক হতে পারে।
মাতৃত্ব একজন নারী ক্রিকেটারের জীবনের স্বাভাবিক অংশ। তাই সন্তান নেওয়ার কারণে যেন তাঁর পেশাগত ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে না পড়ে, সে জন্য প্রয়োজন বেতন ও চুক্তির সুরক্ষা, যথাযথ চিকিৎসাসেবা এবং নিরাপদে মাঠে ফেরার সুযোগ নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটের সামনে এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো, মাতৃত্বের পর খেলোয়াড়দের ক্যারিয়ার চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ কি কেবল আশ্বাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি তা নিশ্চিত করতে কার্যকর নীতিমালাও চালু হবে?

