বাংলাদেশে শিশুস্বাস্থ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য উদ্যোগগুলোর একটি হলো ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন। বহু বছর ধরে এই কর্মসূচি শুধু রাতকানা প্রতিরোধেই নয়, বরং শিশুদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ানো, অপুষ্টির ঝুঁকি কমানো এবং সংক্রমণজনিত জটিলতা ঠেকাতেও বড় ভূমিকা রেখে এসেছে। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, দেশে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে এই ক্যাম্পেইন বন্ধ রয়েছে। বছরে দুবার এই কর্মসূচি হওয়ার কথা থাকলেও গত দুই বছরে তা হয়েছে মাত্র দুবার। এই বিরতি শুধু প্রশাসনিক অচলাবস্থার খবর নয়; এটি জনস্বাস্থ্যের ভেতরে জমতে থাকা একটি গভীর সংকেত।
সর্বশেষ ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন অনুষ্ঠিত হয় ২০২৫ সালের মার্চে। এর আগে কর্মসূচিটি হয়েছিল ২০২৪ সালের মে মাসে। অর্থাৎ নিয়মিত ছয় মাস অন্তর ক্যাম্পেইন হওয়ার যে কাঠামো, তা কার্যত ভেঙে গেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সূত্র অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত কৌশলগত পরিকল্পনা বা অপারেশনাল প্ল্যানের মাধ্যমে ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাপসুল কেনা ও বিতরণ করা হতো। কিন্তু নতুন ওপি না হওয়ায় এরপর আর নতুন করে ক্যাপসুল কেনা সম্ভব হয়নি। ২০২৫ সালের মার্চের ক্যাম্পেইনটি চালানো হয়েছিল আগের কেনা মজুত ক্যাপসুল দিয়ে। এই তথ্য থেকে স্পষ্ট হয়, সমস্যা কেবল মাঠপর্যায়ের নয়; এর শিকড় নীতিনির্ধারণ, বাজেট বরাদ্দ এবং ক্রয়ব্যবস্থার জটিলতায় আটকে আছে।
এই কর্মসূচির গুরুত্ব বুঝতে হলে এর পেছনের স্বাস্থ্য-বাস্তবতা বুঝতে হবে। ভিটামিন ‘এ’ শিশুদের শরীরে এমন এক অপরিহার্য পুষ্টি উপাদান, যা দৃষ্টিশক্তি, স্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি রাতকানা প্রতিরোধের পাশাপাশি হাম, ডায়রিয়া ও অন্যান্য সংক্রামক রোগের জটিলতা কমাতেও কার্যকর। ভিটামিন ‘এ’ একটি ফ্যাট-সলিউবল ভিটামিন হওয়ায় এটি শরীরে চার থেকে ছয় মাস পর্যন্ত সঞ্চিত থাকতে পারে। এই কারণেই প্রতি ছয় মাস পরপর ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে শিশুদের ক্যাপসুল খাওয়ানোর পরিকল্পনা করা হয়েছিল। মানবদেহ নিজে ভিটামিন ‘এ’ তৈরি করতে পারে না, আর খাদ্যাভ্যাসে ঘাটতির কারণে অনেক শিশুই পর্যাপ্ত পুষ্টি পায় না। ফলে নিয়মিত সাপ্লিমেন্টেশন বন্ধ থাকা মানে একটি ধীর কিন্তু বাস্তব ঝুঁকি তৈরি হওয়া।
বাংলাদেশে এই কর্মসূচির ইতিহাসও দীর্ঘ। শিশুদের অন্ধত্ব ও পুষ্টিহীনতা কমানোর লক্ষ্য নিয়ে ১৯৭৩ সাল থেকে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো শুরু হয়। তখন এটি ‘জাতীয় রাতকানা রোগ প্রতিরোধ কার্যক্রম’ নামে পরিচিত ছিল। পরে ১৯৯৫ সাল থেকে জাতীয় টিকাদান দিবসের সঙ্গে এই কার্যক্রম যুক্ত হয়, যাতে সেবার পরিধি বাড়ে। ২০০৩ সালে এটি ‘জাতীয় ভিটামিন এ প্লাস ক্যাম্পেইন’ নামে পরিচিত হয় এবং একই বছর কৃমিনাশক ট্যাবলেটও এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়। কারণ, শরীরে কৃমি থাকলে ভিটামিন ‘এ’-এর শোষণ ব্যাহত হয়। পরে ২০১১ সালে এই কর্মসূচি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জাতীয় পুষ্টিসেবা কার্যক্রমের অধীনে আরও বিস্তৃতভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়। কিন্তু যে কর্মসূচি এত দীর্ঘ সময় ধরে শিশুস্বাস্থ্যের সুরক্ষাবলয় হিসেবে কাজ করেছে, সেই উদ্যোগের ধারাবাহিকতা সাম্প্রতিক সময়ে মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে।
প্রতি ছয় মাস পরপর এই ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে ৬–১১ মাস বয়সী শিশুকে নীল রঙের এবং ১২–৫৯ মাস বয়সী শিশুকে লাল রঙের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো হতো। প্রতিবার গড়ে সোয়া ২ কোটি শিশুকে এ কর্মসূচির আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা থাকত। সর্বশেষ ২০২৫ সালের মার্চেও ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী সোয়া ২ কোটি শিশুকে ক্যাপসুল খাওয়ানো হয়েছিল। সংখ্যাটি কেবল বড় নয়, তা দেখায় যে এই কর্মসূচির স্থবিরতা মানে দেশের বিশাল শিশুজনসংখ্যা সরাসরি অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়া। এমন একটি ক্যাম্পেইন যদি সময়মতো না হয়, তবে তার প্রভাব একদিনে দৃশ্যমান না হলেও ধীরে ধীরে তা জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় চাপ তৈরি করতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যও এ উদ্বেগকে আরও স্পষ্ট করে। সংস্থাটি বলছে, বিশ্বে প্রাক্-বিদ্যালয় বয়সী প্রায় ১৯ কোটি শিশু ভিটামিন ‘এ’ ঘাটতির ঝুঁকিতে রয়েছে, এবং এদের বড় অংশ আফ্রিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। ভিটামিন ‘এ’-এর অভাবে দৃষ্টিশক্তির সমস্যা থেকে শুরু করে গুরুতর ক্ষেত্রে অন্ধত্ব পর্যন্ত হতে পারে। পাশাপাশি সংক্রমণজনিত রোগের জটিলতা বাড়ে, বিশেষ করে হাম ও ডায়রিয়ার ক্ষেত্রে মৃত্যুঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশে যখন হাম নিয়ে আবার উদ্বেগের কথা বলা হচ্ছে, তখন ভিটামিন ‘এ’ সাপ্লিমেন্টেশন দীর্ঘদিন স্থগিত থাকা নিছক প্রশাসনিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে ভুল হবে; এটি একটি সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকির পূর্বাভাসও হতে পারে।
সমস্যার প্রশাসনিক পটভূমিটাও গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের স্বাস্থ্য খাতের ৩০টির বেশি উদ্যোগ—যেমন প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা, সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ, টিকা ও পুষ্টি কার্যক্রম—১৯৯৮ সাল থেকে পাঁচ বছর মেয়াদি অপারেশনাল প্ল্যানের মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে আসছে। সর্বশেষ ওপি বা চতুর্থ স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি সেক্টর কর্মসূচি ২০২৪ সালের জুনে শেষ হয়। এরপর ১ লাখ ৬ হাজার ১০০ কোটি টাকার পঞ্চম এইচপিএনএসপি অনুমোদন পায়নি। পরে ২০২৫ সালের মার্চে কর্মসূচিটি বাতিল করে রাজস্ব খাতের মাধ্যমে কার্যক্রম চালানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়। কাগজে-কলমে এটি হয়তো পুনর্গঠনের অংশ, কিন্তু বাস্তবে প্রকল্প অনুমোদন, বাজেট বরাদ্দ এবং বাস্তবায়ন কাঠামোতে বিলম্ব দেখা দেয়। এর ফল গিয়ে পড়ে মাঠপর্যায়ের একটি অত্যাবশ্যক শিশুস্বাস্থ্য কর্মসূচির ওপর।
জাতীয় পুষ্টিসেবার সাবেক দায়িত্বশীলদের বক্তব্য অনুযায়ী, ওপি থাকাকালে শুধু ক্যাপসুল কেনাই নয়, সংরক্ষণ, মাঠপর্যায়ে বিতরণ, প্রশিক্ষণ এবং প্রচার—সবই একটি নির্দিষ্ট ব্যবস্থার অধীনে পরিচালিত হতো। নতুন ওপি না থাকায় ২০২৪ সালের জুনের পর সেই অর্থায়ন ও বাস্তবায়ন কাঠামো ভেঙে পড়ে। অর্থাৎ এখানে ঘাটতি কেবল পণ্যে নয়, পুরো সরবরাহ ও ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থায়। ২০২৫ সালের মার্চের ক্যাম্পেইন পুরোনো মজুদের ওপর ভর করে চালানো গেলেও, তা স্থায়ী সমাধান নয়। এটি বরং বোঝায় যে ব্যবস্থাটি কিছুদিন জোড়াতালি দিয়ে চলেছে, কিন্তু পরে এসে সম্পূর্ণ থেমে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যে একটি বিষয় খুব স্পষ্ট: এই ধরনের কর্মসূচি বন্ধ থাকলে তাৎক্ষণিকভাবে বড় বিপর্যয় চোখে না পড়লেও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতি জমতে থাকে। শিশুদের মধ্যে অপুষ্টি, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা হ্রাস, সংক্রমণের ঝুঁকি বৃদ্ধি—এসবই ধীরে ধীরে বাড়ে। অর্থাৎ এটি এমন এক নীরব সমস্যা, যা প্রকাশ পেতে সময় নেয়, কিন্তু প্রকাশ পাওয়ার পর ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া কঠিন হয়। বর্তমানে হামের প্রকোপ বৃদ্ধিকে অনেকে সম্ভাব্য সতর্কসংকেত হিসেবে দেখছেন। যদিও সরাসরি একক কারণ নির্ধারণ করা কঠিন, তবু নিয়মিত ভিটামিন ‘এ’ সাপ্লিমেন্টেশন না থাকা যে সামগ্রিক ঝুঁকি বাড়াতে পারে, তা বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মঞ্জুর আল মুর্শেদ চৌধুরী বলেছেন, ভিটামিন ‘এ’ শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও রোগ প্রতিরোধক্ষমতা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, এবং ক্যাম্পেইন ব্যাহত হলে দীর্ঘমেয়াদে পুষ্টিহীনতা ও সংক্রমণজনিত ঝুঁকি বাড়তে পারে। অন্যদিকে জাতীয় পুষ্টি সেবার সর্বশেষ লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক ডা. আঞ্জুমান আরা সুলতানা জানিয়েছেন, ওপি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ক্যাম্পেইন চালানো যায়নি; ২০২৫ সালের ক্যাম্পেইনের ক্যাপসুল আগের ওপি থাকাকালীন কেনা হয়েছিল। তিনি আরও বলেছেন, সেক্টর কর্মসূচি না থাকায় জাতীয় পুষ্টি সেবা বা এনএনএস বিলুপ্ত হয়। এই বক্তব্যগুলো একসঙ্গে দেখলে বোঝা যায়, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক গাফিলতি নয়; বরং একটি নীতিগত রূপান্তর যথাযথ প্রস্তুতি ছাড়া বাস্তবায়নের ফলে সেবা সরবরাহে বড় শূন্যতা তৈরি হয়েছে।
সূত্র বলছে, কর্মসূচির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন পরিচালনার কথা ছিল। গত বছরের শেষে একটি ক্যাম্পেইনের পরিকল্পনাও ছিল। কিন্তু বরাদ্দ অনুমোদন, অর্থসংকট এবং ক্যাপসুল কেনার জটিলতায় সেটি বাস্তবায়ন করা যায়নি। আইপিএইচএনের পরিচালক ডা. মোহাম্মদ ইউনুস আলীর ভাষ্য অনুযায়ী, রাজস্ব খাত থেকে ক্যাম্পেইন চালানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে, এবং কেন্দ্রীয় ঔষধাগারকে ক্যাপসুল কিনতে হবে। তবে দরদাতারা অস্বাভাবিকভাবে বেশি দর দেওয়ায় দুটি দরপত্রপ্রক্রিয়া বাতিল করতে হয়েছে। এখন তৃতীয় দরপত্রের কার্যক্রম শেষে বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এই ব্যাখ্যা দেখায়, কেবল নীতিগত সিদ্ধান্ত নিলেই হয় না; বাস্তবায়ন ব্যবস্থায় বিলম্ব হলে তার মূল্য দেয় সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে শিশু।
এই পুরো ঘটনাকে বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে দেখলে আরও একটি উদ্বেগ সামনে আসে। বাংলাদেশে বহু জনস্বাস্থ্য সাফল্যের পেছনে ছিল নিয়মিত, মাঠভিত্তিক, গণঅংশগ্রহণমূলক ক্যাম্পেইন। ভিটামিন ‘এ’ প্লাস কর্মসূচি তার অন্যতম উদাহরণ। তাই এটি বন্ধ হয়ে যাওয়া কেবল একটি সাপ্লিমেন্ট বিতরণ স্থগিত হওয়া নয়; এটি জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা, পরিকল্পনা এবং অগ্রাধিকার নির্ধারণ নিয়েও প্রশ্ন তোলে। একটি দেশ যখন শিশুস্বাস্থ্যের মতো সংবেদনশীল খাতে বহু বছরের প্রতিষ্ঠিত উদ্যোগ টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খায়, তখন বোঝা যায় যে নীতির ধারাবাহিকতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতির মধ্যে এখনও বড় ফাঁক রয়ে গেছে।
সবশেষে বলা যায়, ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন বন্ধ থাকার এই দীর্ঘ বিরতি বাংলাদেশের শিশুস্বাস্থ্যের জন্য একটি নীরব কিন্তু গভীর সতর্কবার্তা। এখনই যদি দ্রুত ক্যাপসুল সংগ্রহ, বাজেট অনুমোদন এবং মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতি সম্পন্ন না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে এর প্রভাব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। শিশুদের সুস্থ বৃদ্ধি, পুষ্টি এবং সংক্রমণ থেকে সুরক্ষার প্রশ্নে এই কর্মসূচি কোনো অতিরিক্ত সুবিধা নয়; এটি একটি মৌলিক প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা। তাই প্রশাসনিক জটিলতা কাটিয়ে দ্রুত ক্যাম্পেইন পুনরায় চালু করা এখন শুধু প্রয়োজন নয়, বরং জরুরি।

