গত মার্চের মাঝামাঝি থেকে বাংলাদেশে হাম রোগ ভয়াবহ আকার নেয়। এ সময়ে ৩০০-এর বেশি শিশু প্রাণ হারায় এবং আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়ায় ৪৭ হাজার। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি ছিল পুরোপুরি প্রতিরোধযোগ্য একটি জনস্বাস্থ্য সংকট। কিন্তু সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত দুই দশকে দেশে হাম টিকার আওতা ধারাবাহিকভাবে বাড়লেও সাম্প্রতিক সময়ে সেই অগ্রগতি ভেঙে পড়ে। একসময় নিম্ন আয়ের দেশগুলোর জন্য বাংলাদেশ টিকাদানে একটি সফল উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হতো। তবে নীতি পরিবর্তন, অব্যবস্থাপনা ও প্রস্তুতির ঘাটতিতে সেই অর্জন বড় ধরনের ধাক্কা খায়।
সূত্র অনুযায়ী, এই ব্যর্থতার পেছনে রয়েছে একটি পরিচিত প্রশাসনিক প্রবণতা। নতুন দায়িত্ব গ্রহণের পর আগের ব্যবস্থার ওপর আস্থা কমে যাওয়া এবং সেটিকে পুনর্গঠনের নামে পুরো কাঠামো ভেঙে ফেলা। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৯৮ সাল থেকে চলমান স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত কর্মসূচি ২০২৫ সালের মার্চে কোনো স্পষ্ট বিকল্প পরিকল্পনা ছাড়াই বন্ধ করে দেওয়া হয়।
পরে যে অস্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়, সেটিও ২০২৫ সালের নভেম্বরের আগে অনুমোদন পায়নি। ফলে টিকা সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়, দেশের ১৪ হাজারের বেশি কমিউনিটি ক্লিনিকে ওষুধের ঘাটতি তৈরি হয় এবং জরুরি মজুদও শেষ হয়ে যায়।
এর আগে বাংলাদেশ ইউনিসেফের মাধ্যমে সরাসরি প্রক্রিয়ায় টিকা সংগ্রহ করত। কিন্তু হঠাৎ নীতিগত পরিবর্তনে অর্ধেক টিকা উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, এই নতুন ব্যবস্থায় সংশ্লিষ্টদের পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা ছিল না এবং ইউনিসেফও এ পরিবর্তন নিয়ে সতর্ক করেছিল। পরিণতিতে নতুন কোনো ব্যবস্থাতেই সময়মতো একটি টিকাও দেশে আসেনি, যা সংকটকে আরও গভীর করে তোলে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যব্যবস্থা বন্ধ করার আগে বিকল্প কাঠামো প্রস্তুত রাখা অপরিহার্য। কিন্তু এখানে পরিকল্পনা স্থগিত করা হয়, জনবল কাঠামো বাতিল করা হয় এবং অর্থায়নের প্রক্রিয়াও জটিল করে ফেলা হয়। ফলে পুরো টিকাদান ব্যবস্থা কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে এবং সংকট আরও বিস্তৃত হয়।
স্বাস্থ্য উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক সায়েদুর রহমান জানান, নতুন ব্যবস্থার সঙ্গে কর্মকর্তাদের অভিজ্ঞতার ঘাটতি ছিল এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে বিলম্ব ঘটে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ইউনিসেফের সতর্কবার্তা তিনি ৩০ ডিসেম্বর পেয়েছিলেন। তবে এর আগেই বিশেষজ্ঞরা টিকা কাভারেজ কমে যাওয়ার ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছিলেন বলে জানা যায়। দীর্ঘদিন ধরে পিছিয়ে থাকা অতিরিক্ত হাম টিকাদান কর্মসূচিও ২০২৬ সালের এপ্রিলে পুনঃনির্ধারণ করা হয়, যা সময়োচিত পদক্ষেপের ঘাটতিকে নির্দেশ করে।
পরিস্থিতির সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো আক্রান্ত শিশুদের টিকাহীনতা। তথ্য অনুযায়ী, আক্রান্তদের ৭৪ শতাংশ কোনো টিকা পায়নি এবং ১৪ শতাংশ পেয়েছিল মাত্র একটি ডোজ। এছাড়া কৃমিনাশক ও ভিটামিন ‘এ’ কর্মসূচি এক বছরের বেশি সময় বন্ধ ছিল, যা শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা আরও দুর্বল করেছে বলে বিশেষজ্ঞদের মত।
স্বাস্থ্য খাতে যেকোনো ব্যর্থতা সরাসরি মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িত। তাই বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের সিদ্ধান্তে পরিকল্পনা, প্রস্তুতি ও ধারাবাহিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান পরিস্থিতিতে একটি শক্তিশালী তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি উঠেছে, যারা পুরো ঘটনার দায় নিরূপণ করবে। একই সঙ্গে এই সংকটে যাদের সিদ্ধান্ত ও অবহেলা ভূমিকা রেখেছে, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জোরালো হচ্ছে। শিশুদের মৃত্যু ও আক্রান্ত হওয়ার এই ভয়াবহ চিত্র এখন জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।

