রাজশাহী বিভাগজুড়ে ছড়িয়ে পড়া হাম ও হামের উপসর্গ এখন বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিয়েছে। গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বিভাগের বিভিন্ন জেলায় অন্তত ৭৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। দেশের আট বিভাগের মধ্যে মৃত্যুর সংখ্যায় এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জে।
স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, আক্রান্ত শিশুদের বড় একটি অংশের বয়স এতটাই কম ছিল যে তারা এখনো নিয়মিত টিকা নেওয়ার পর্যায়েই পৌঁছায়নি। ফলে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পর অনেক পরিবার কার্যত অসহায় অবস্থায় পড়ে যায়।
রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তার দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মারা যাওয়া ৭৯ শিশুর মধ্যে চারজনের শরীরে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছিল। এর মধ্যে নওগাঁর একটি, বগুড়ার একটি এবং পাবনার দুটি শিশু ছিল। অন্যদিকে শুধু হামের উপসর্গ নিয়েই রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা গেছে ৫৫ শিশু। এছাড়া চাঁপাইনবাবগঞ্জে সাত, পাবনায় ছয়, বগুড়ায় ছয় এবং নওগাঁয় একটি শিশুর মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।
তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তিতে মৃত্যুর সংখ্যা ৭৮ বলা হয়েছে। সেখানে নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে দুইজন। সরকারি তথ্যের এই অমিলও পরিস্থিতি নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলছে।
নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার ছয় মাস বয়সী গৌরীর গল্প এখন অনেক পরিবারের আতঙ্কের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে। হামের উপসর্গ নিয়ে গুরুতর অসুস্থ হওয়ার পর তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকরা জরুরি ভিত্তিতে আইসিইউ প্রয়োজন বলে জানান।
কিন্তু আইসিইউ বেডের দীর্ঘ অপেক্ষা আর শেষ পর্যন্ত শেষ হয়নি। পরিবারের সদস্যদের বলা হয়েছিল, গৌরীর সিরিয়াল ২৮ নম্বরে। ভর্তি হওয়ার দুই দিন পর গত ১৮ এপ্রিল মারা যায় শিশুটি।
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে মৃত্যুর পরদিন। শ্মশানে নিয়ে যাওয়ার পথে পরিবারের কাছে ফোন আসে হাসপাতাল থেকে—গৌরীর আইসিইউ বেড খালি হয়েছে।
শিশুটির বাবা সোহাগ কুমার বলেন, তার মেয়ের বয়স ছিল ছয় মাস সাত দিন। এখনো টিকা দেওয়া হয়নি, ভিটামিন এ ক্যাপসুলও খাওয়ানো হয়নি। মা বন্দনা রানী বলেন, “একটা আইসিইউ বেড পেলে হয়তো মেয়েটাকে বাঁচানো যেত।”
রাজশাহী বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ। সেখানে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।
গত ২৪ এপ্রিল পাঁচ মাস বয়সী রাইসা নামে এক শিশু হামের উপসর্গে মারা যায়। এর আগে ১৫ এপ্রিল মারা যায় ১৫ মাস বয়সী লামিয়া। তার বাবা রাজমিস্ত্রি মোহাম্মদ রনি জানান, মেয়ের জন্য সময়মতো টিকা পাওয়া যায়নি। অসুস্থ হওয়ার পর কয়েক দিন হাসপাতালে চিকিৎসাও চলে। পরে বাড়িতে আনার পর টিকা দেওয়া হলে অবস্থার আরও অবনতি ঘটে।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার গতি এত দ্রুত ছিল যে অনেক শিশুই টিকা পাওয়ার আগেই আক্রান্ত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়েকটি কারণ একসঙ্গে পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করে তুলেছে।
প্রথমত, আক্রান্তদের বড় অংশের বয়স ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে। অনেকেই তখনো পূর্ণ টিকা পায়নি। দ্বিতীয়ত, পুষ্টিহীনতা ও দুর্বল রোগ প্রতিরোধক্ষমতা সংক্রমণকে মারাত্মক করে তুলছে।
রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, যারা মারা যাচ্ছে তাদের অধিকাংশই খুব অল্প বয়সী। অনেকে টিকা নেওয়ার আগেই আক্রান্ত হয়েছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. এ কে এম শাহাব উদ্দীন জানান, আগে হামের টিকা দেওয়ার বয়স ছিল নয় মাস। কিন্তু সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার পর বিশেষ ব্যবস্থায় তা কমিয়ে ছয় মাস করা হয়েছে। পাশাপাশি ভিটামিন এ ক্যাপসুল বিতরণও জোরদার করা হয়েছে।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিত্র এখন উদ্বেগজনক। শুধু রাজশাহী বিভাগ নয়, খুলনার কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর এবং ঢাকা বিভাগের ফরিদপুর ও রাজবাড়ী থেকেও রোগী আসছে এখানে।
হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে বেড আছে মাত্র ২০০টি। অথচ প্রতিদিন ভর্তি থাকছে ৭০০ থেকে ৮০০ শিশু। একেকটি বেডে একাধিক শিশুকে রাখতে হচ্ছে। চিকিৎসক ও নার্সদের ওপরও বাড়ছে অস্বাভাবিক চাপ।
শনিবার নতুন ভর্তি হয়েছে ৯ শিশু, ছাড়পত্র পেয়েছে ১০ জন। তখন হাসপাতালে ভর্তি ছিল ৯৯ শিশু। এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছে ৯৬৮ শিশু।
বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত রাজশাহী বিভাগে হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছে ৪ হাজার ৬৪১ শিশু। সুস্থ হয়েছে ৩ হাজার ৮৭১ জন। নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে ৫৭৬ জনের শরীরে।
চিকিৎসকদের মতে, এই সংকট সামাল দিতে শুধু হাসপাতালনির্ভর চিকিৎসা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দ্রুত টিকাদান, পুষ্টি নিশ্চিত করা এবং সচেতনতা বাড়ানো।
রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শংকর কে বিশ্বাস বলেন, শিশুদের নিয়মিত মায়ের বুকের দুধ খাওয়াতে হবে। ছয় মাসের পর পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি সময়মতো ভিটামিন এ ক্যাপসুল ও টিকা দিতে হবে।
রাজশাহীর এই পরিস্থিতি শুধু একটি বিভাগের স্বাস্থ্য সংকট নয়, এটি দেশের টিকাব্যবস্থা, শিশুস্বাস্থ্য ও হাসপাতাল সক্ষমতার বড় একটি সতর্কবার্তাও হয়ে উঠছে।

