দেশে আবারও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে ম্যালেরিয়ার সংক্রমণ। পরজীবীবাহিত এই রোগটি সংক্রমিত স্ত্রী অ্যানোফিলিস মশার কামড়ের মাধ্যমে মানবদেহে ছড়িয়ে পড়ে। সাম্প্রতিক সময়ে এক শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তার ম্যালেরিয়ায় মৃত্যুর ঘটনা এবং দেশের বিভিন্ন এলাকায় নতুন সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে পার্বত্য অঞ্চল থেকে ফিরে আসা পর্যটকদের মাধ্যমে রোগটির জীবাণু সমতল অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা বাড়ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে দেশে ১৬ জনের মৃত্যু হয়। চলতি বছর সংক্রমণ পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। শুধু প্রথম তিন মাসেই আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৬০ জনে। এই প্রবণতা ২০৩০ সালের মধ্যে দেশ থেকে ম্যালেরিয়া নির্মূলের সরকারি লক্ষ্যকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে ধীরগতি এবং বরাদ্দকৃত অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহারে ঘাটতির কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়ছে। তাদের মতে, কার্যকর সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে সংক্রমণ আরও বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
সম্প্রতি এক ভ্রমণ দলও এ সংক্রমণ পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে আলোচনায় এসেছে। গত ২১ মার্চ ঢাকা থেকে ‘বাংলা ট্যুর গ্রুপ’ ও ‘কেবিডি ট্যুর গ্রুপ’-এর ১৯ সদস্যের একটি দল বান্দরবানের সাঙ্গু ও মাতামুহুরি রিজার্ভ ফরেস্টে ১০ দিনের ভ্রমণে যান। সেখানে তারা চার দিন পাহাড়ে তাঁবুতে এবং ছয় দিন জুমঘরে রাতযাপন করেন।
ভ্রমণ শেষে ৩১ মার্চ তারা ঢাকায় ফিরে আসেন। এরপর প্রায় ১০ দিন পর কবি নজরুল কলেজের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী সাকিব জ্বরে আক্রান্ত হন। একই সময়ে মিরপুরের বাসিন্দা জাহেদ (৪৫) এবং যাত্রাবাড়ীর সজলও জ্বরে আক্রান্ত হন। আক্রান্তদের সবার ক্ষেত্রেই জ্বরের পাশাপাশি তীব্র মাথাব্যথা ও শারীরিক দুর্বলতা দেখা দেয়। অবস্থার অবনতি হলে সাকিবকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে তাকে রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
|
অন্যদিকে, জাহেদ গতকাল একই হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন। তবে শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হওয়ায় তাকে ভর্তি না করে প্রয়োজনীয় ওষুধ দিয়ে বাড়িতে বিশ্রামের পরামর্শ দিয়েছেন সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের জুনিয়র কনসালটেন্ট (মেডিসিন) ডা. শ্রীবাস পাল। অপরদিকে যাত্রাবাড়ীর সজল এখনো একটি স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। আক্রান্ত সাকিব বর্তমানে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তার শারীরিক অবস্থার কারণে শুরুতে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক ছিল বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
ডা. শ্রীবাস পাল জানান, গত দুই সপ্তাহে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে মোট পাঁচজন ম্যালেরিয়া রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে গতকাল (রোববার) ভর্তি হওয়া সাকিবের অবস্থা ছিল গুরুতর। তার তীব্র মাথাব্যথার পাশাপাশি কালো প্রস্রাব দেখা দেয়, যা ম্যালেরিয়ার একটি জটিল লক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হয়। দ্রুত চিকিৎসা শুরু করায় বর্তমানে তার অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, পাহাড়ি বা ম্যালেরিয়াপ্রবণ এলাকা থেকে ফিরে আসার পর তিন সপ্তাহ থেকে এক মাসের মধ্যে জ্বর দেখা দিলে দেরি না করে ম্যালেরিয়া পরীক্ষা করা জরুরি। অবহেলা করলে রোগটি মারাত্মক রূপ নিতে পারে। তার মতে, সব জায়গায় ম্যালেরিয়ার ওষুধ সহজে পাওয়া যায় না, তাই উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত বিশেষায়িত হাসপাতালে যোগাযোগ করা উচিত। সময়মতো চিকিৎসা নিলে রোগী সম্পূর্ণভাবে সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা থাকে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর দেশে ১৩টি জেলায় মোট ১০ হাজার ১৬২ জন ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হন। ওই বছর মৃত্যু হয় ১৬ জনের, যা আগের বছরগুলোর তুলনায় উদ্বেগজনক বলে মনে করা হচ্ছে। চলতি বছরেও সংক্রমণ অব্যাহত রয়েছে। বছরের প্রথম তিন মাসেই ৪৬০ জন আক্রান্ত হয়েছেন এবং একজনের মৃত্যু হয়েছে।
আক্রান্তের ভৌগোলিক চিত্রে দেখা যায়, ম্যালেরিয়ার সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে বান্দরবান জেলা। এখানে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৫ হাজার ২৩ জন, যা দেশের মোট রোগীর প্রায় অর্ধেক। এরপর রয়েছে রাঙামাটি ৩ হাজার ৬১৪ জন, কক্সবাজার ৮৪৫ জন এবং খাগড়াছড়ি ৫৩৪ জন। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে মূলত বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, কক্সবাজার ও চট্টগ্রামে রোগী শনাক্ত হয়েছে।
ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে ২০১৮-১৯ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত ছয় বছরে মোট ৬০৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন ৩৭৬ কোটি ৮৩ লাখ টাকা এবং জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) সহযোগী সংস্থা ‘গ্লোবাল ফান্ড টু ফাইট এইডস’-এর সহায়তা ২০৩ কোটি ৩৪ লাখ টাকা।
জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচির তথ্যমতে, ২০২৩ সাল পর্যন্ত দেশে ১৩টি জেলায় ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাব ছিল। গত বছর ময়মনসিংহ, শেরপুর, নেত্রকোনা ও কুড়িগ্রামকে ম্যালেরিয়ামুক্ত ঘোষণা করা হয়। বর্তমানে সিলেট, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে থাকলেও রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি এখনো উচ্চঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত।
২০১৯ সালে দেশে ১৭ হাজার ২২৫ জন ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হন। এরপর কোভিড মহামারির সময় ২০২০ ও ২০২১ সালে সংক্রমণ কমে যথাক্রমে ৬ হাজার ১০৪ ও ৭ হাজার ২৯৪ জনে নেমে আসে। তবে ২০২২ সাল থেকে আবার সংক্রমণ বাড়তে থাকে। গত বছর ১৩ হাজার ১০০ জন আক্রান্ত হন এবং ৯ জনের মৃত্যু হয়। চলতি বছরে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে; অক্টোবর পর্যন্ত ১০ মাসে আক্রান্ত হয়েছেন ৯ হাজার ৫৯১ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ১৬ জনের।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ থেকে শুরু করে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত গত ছয় বছরে ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচিতে মোট ৬০৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে এসেছে ৩৭৬ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। পাশাপাশি জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি)-এর সহযোগী সংস্থা ‘গ্লোবাল ফান্ড টু ফাইট এইডস’ থেকে পাওয়া গেছে ২০৩ কোটি ৩৪ লাখ টাকা।
চলতি অর্থবছরে এ কর্মসূচির জন্য আলাদা করে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২৪ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। তবে এখন পর্যন্ত সামগ্রিক বরাদ্দের বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ৩১০ কোটি ২৯ লাখ টাকা, যা মোট বরাদ্দের অর্ধেকেরও বেশি। এর ফলে ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল কার্যক্রমে অর্থ ব্যয়ের অগ্রগতি থাকলেও কার্যকারিতা ও ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
|
ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, সরকারি বরাদ্দের প্রায় ১০ শতাংশ ব্যয় হয় প্রশিক্ষণ, সভা ও সেমিনারের মতো প্রশাসনিক কাজে। বাকি ৯০ শতাংশ অর্থ ব্যয় করা হয় জীবনরক্ষাকারী কার্যক্রমে। এর মধ্যে রয়েছে শনাক্তকরণ কিট, ওষুধ, ইনজেকশন এবং মশারি কেনা। একইভাবে গ্লোবাল ফান্ড থেকে পাওয়া অর্থের প্রায় ৮০ শতাংশ সরাসরি চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম খাতে ব্যয় করা হয়।
এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ২০২৪ থেকে ২০৩০ সাল মেয়াদি একটি পরিকল্পনায় ২০২৭ সালের মধ্যে ম্যালেরিয়ায় মৃত্যু শূন্যে নামিয়ে আনার এবং ২০৩০ সালের মধ্যে সংক্রমণ সম্পূর্ণভাবে নির্মূলের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সংক্রমণ ও মৃত্যুহার আবার ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় সেই লক্ষ্য বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আরও অন্তত ৬ থেকে ৭ বছর অতিরিক্ত সময় প্রয়োজন হতে পারে। তাদের মতে, অপারেশন প্ল্যান বন্ধ থাকায় ম্যালেরিয়া প্রতিরোধ কার্যক্রমে কিছুটা স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। তবে গ্লোবাল ফান্ডের সহযোগিতায় কিছু কার্যক্রম এখনো চালু রয়েছে।
এছাড়া তারা জানান, ম্যালেরিয়ার একটি টিকার ট্রায়াল ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) অনুমোদন মিললে এটি মাঠপর্যায়ে চালু হতে আরও প্রায় দুই বছর সময় লাগতে পারে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ বলেন, মশা নিয়ন্ত্রণ, কীটনাশকযুক্ত মশারির ব্যবহার বৃদ্ধি, টিকাদান এবং মানুষের সার্বিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। এছাড়া অপারেশন প্ল্যান বন্ধ থাকায় মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে, যা পুনরায় জোরদার করা প্রয়োজন
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার বলেন, বর্তমান সংক্রমণের হার বিবেচনায় ২০২৭ সালের মধ্যে ম্যালেরিয়া নির্মূল করা বাস্তবসম্মত নয়। তাঁর মতে, শুধু পার্বত্য ম্যালেরিয়াপ্রবণ এলাকাই নয়, সমতল অঞ্চলেও সমান গুরুত্ব দিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, হঠাৎ সংক্রমণ বৃদ্ধির কারণগুলো শনাক্ত করতে হবে এবং সেই অনুযায়ী ম্যালেরিয়া নির্মূল কৌশলে পরিবর্তন আনা জরুরি। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা ‘অপারেশন প্ল্যান’ দ্রুত পুনরায় চালু করার ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন। অধ্যাপক কবিরুল বাশার পরামর্শ দেন, পাহাড়ি এলাকা বা বিদেশ ভ্রমণ শেষে কেউ জ্বরে আক্রান্ত হলে সেটি ম্যালেরিয়া কি না তা দ্রুত পরীক্ষা করে নিশ্চিত হতে হবে। তাঁর মতে, দ্রুত রোগ শনাক্ত করা গেলে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়ানো সম্ভব।
অন্যদিকে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের সাবেক পরিচালক এবং আইইডিসিআরের সাবেক মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ ম্যালেরিয়া নির্মূলে সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
তিনি বলেন, মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম, কীটনাশকযুক্ত মশারির ব্যবহার বৃদ্ধি, টিকাদান এবং সাধারণ মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করা একসঙ্গে করতে হবে। তাঁর মতে, অপারেশন প্ল্যান বন্ধ থাকায় মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা দ্রুত পূরণ করা জরুরি।
এই সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে বর্তমান কৌশলে পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। বিশেষ করে বেশি সংক্রমিত এলাকাগুলোতে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, মশার উৎপত্তিস্থল ধ্বংস এবং লার্ভা ও পূর্ণবয়স্ক মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম আরও জোরদার করতে হবে। সূত্র: ঢাকা পোস্ট

