রাজধানীর মগবাজারের আদ্-দ্বীন হাসপাতালে একসঙ্গে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় তদন্তের সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মৃত শিশুদের পরিবারের বক্তব্য সংগ্রহ না করে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চায় না তদন্ত কমিটি। এ কারণে নির্ধারিত সময়ের পরিবর্তে আগামী ৩ জুন তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে।
স্বাস্থ্য খাতে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি হয়ে উঠেছে এই নবজাতক মৃত্যুর ঘটনা। গত বুধবার সকালে হাসপাতালের ডেলিভারির পর নবজাতকদের জন্য নির্ধারিত পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ছয় শিশুর মৃত্যু হয়। শিশুদের বয়স ছিল মাত্র এক থেকে তিন দিন। স্বল্প সময়ের মধ্যে একই ওয়ার্ডে এতগুলো নবজাতকের মৃত্যু ঘটায় চিকিৎসা ব্যবস্থা, হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা এবং রোগী নিরাপত্তা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, তদন্ত প্রতিবেদন চূড়ান্ত করার আগে মৃত শিশুদের মায়েদের সঙ্গে কথা বলা হবে। তাঁদের অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ এবং ঘটনার আগে-পরে কী ঘটেছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হবে। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য অনেক সময় এমন কিছু তথ্য সামনে নিয়ে আসে, যা নথিপত্র বা প্রযুক্তিগত পরীক্ষার মাধ্যমে পাওয়া সম্ভব হয় না।
মন্ত্রী বলেন, তদন্তকারীরা ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহ করেছেন এবং বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করছেন। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো ধরনের মন্তব্য করা হবে না। কারণ, অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত দিলে প্রকৃত কারণ আড়াল হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
ঘটনার পরপরই স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটির সদস্যরা হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট কক্ষ পরিদর্শন করেছেন। চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথি পরীক্ষা করা হয়েছে। পাশাপাশি হাসপাতালের দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক, নার্স এবং অন্যান্য কর্মীদের সঙ্গেও কথা বলা হয়েছে।
তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে, মৃত্যুগুলো কোনো চিকিৎসাগত জটিলতার কারণে হয়েছে নাকি হাসপাতালের পরিবেশ, যন্ত্রপাতি বা ব্যবস্থাপনায় কোনো ত্রুটি ছিল। একই সময়ে একাধিক নবজাতকের মৃত্যু হওয়ায় বিশেষজ্ঞরা বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। তাঁদের মতে, এ ধরনের ঘটনা স্বাভাবিক নয় এবং এর পেছনে কী ঘটেছে তা নিরপেক্ষভাবে খুঁজে বের করা জরুরি।
এদিকে পুলিশও পৃথকভাবে অনুসন্ধান চালাচ্ছে। হাসপাতালের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। কয়েকজন চিকিৎসক, নার্স এবং প্রত্যক্ষদর্শীর কাছ থেকেও তথ্য নেওয়া হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কাউকে আটক বা গ্রেপ্তার করা হয়নি।
মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ যাচাই করা হচ্ছে। চিকিৎসা ব্যবস্থার কোনো ব্যত্যয় ছিল কি না, দায়িত্ব পালনে কোনো অবহেলা হয়েছে কি না কিংবা অন্য কোনো কারণ জড়িত ছিল কি না—সবকিছুই তদন্তের আওতায় রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নবজাতকরা জন্মের পর প্রথম কয়েক দিন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকে। তাই হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ, অক্সিজেন সরবরাহ, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ এবং সার্বিক পরিবেশের মান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব বিষয়েও তদন্ত কমিটি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে বলে জানা গেছে।
ছয় নবজাতকের মৃত্যুর এই ঘটনা শুধু একটি হাসপাতালকে নয়, দেশের সামগ্রিক মাতৃ ও নবজাতক স্বাস্থ্যসেবাকেও নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে। স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
আগামী ৩ জুন প্রকাশিত হতে যাওয়া তদন্ত প্রতিবেদনের দিকে এখন সবার নজর। নিহত শিশুদের পরিবার, স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট মহল এবং সাধারণ মানুষ প্রত্যাশা করছে, প্রতিবেদনে ঘটনার প্রকৃত কারণ স্পষ্ট হবে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ থাকবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এমন মর্মান্তিক ঘটনা যাতে আর না ঘটে, সে বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপের দিকনির্দেশনাও উঠে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

