দেশের বিভিন্ন সরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসকরা ছয় দফা দাবি বাস্তবায়নের দাবিতে একযোগে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি শুরু করেছেন। রবিবার সকাল থেকে একাধিক বড় মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এই কর্মসূচি শুরু হলে রোগীসেবায় ব্যাপক চাপ তৈরি হয়। একই সময়ে বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশও অনুষ্ঠিত হয়।
চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ ও রাজশাহীসহ বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের এই কর্মবিরতি ছড়িয়ে পড়ে। সকালে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসকরা প্রথমে কর্মবিরতি শুরু করেন। একই সঙ্গে তারা দাবি আদায়ে অবস্থান কর্মসূচি ও বিক্ষোভে অংশ নেন। কিছু সময় পর মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থীরাও ক্লাস বর্জনের ঘোষণা দেন, ফলে হাসপাতাল ও শিক্ষাঙ্গন—দুই জায়গাতেই অস্থিরতা দেখা দেয়।
ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালেও ইন্টার্ন চিকিৎসকরা বিক্ষোভ মিছিল করে হাসপাতাল প্রশাসনের কাছে তাদের দাবি তুলে ধরেন। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন তারা। অন্যদিকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসকরাও একই দিন থেকে কর্মবিরতিতে যান এবং প্রধান ফটকে মানববন্ধনের মাধ্যমে তাদের অবস্থান জানান।
আন্দোলনরত চিকিৎসকদের অভিযোগ, সাম্প্রতিক সময়ে স্বাস্থ্যশিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগের একটি সিদ্ধান্ত তাদের প্রশিক্ষণ ও পেশাগত ভবিষ্যতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাদের মতে, নতুন নির্দেশনায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিভাগের পদায়ন সীমিত করা, উপজেলা পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদি বাধ্যতামূলক সেবা এবং ভাতার ক্ষেত্রে কড়াকড়ি শর্ত যুক্ত করা হয়েছে, যা তারা প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছেন।
তাদের ছয় দফা দাবির মধ্যে রয়েছে—সাম্প্রতিক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাতিল করে নতুন করে নির্দেশনা দেওয়া, ইন্টার্ন ভাতা ন্যূনতম ত্রিশ হাজার টাকা নির্ধারণ, ট্রেইনি চিকিৎসকদের বেতন নবম গ্রেডের সমমান করা, এবং চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ আইন প্রণয়ন। পাশাপাশি দ্রুত বিচার ব্যবস্থার মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত সহিংসতা বা অবহেলার ঘটনায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও জানানো হয়েছে।
এছাড়া চিকিৎসা খাতে বয়সসীমা শিথিল করে বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারে প্রবেশের বয়স ত্রিশের বেশি নির্ধারণের দাবি, চিকিৎসা শিক্ষা ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ কাঠামো সংস্কার এবং ভর্তি পরীক্ষার ফি সহনীয় পর্যায়ে আনার মতো বিষয়ও দাবির তালিকায় রয়েছে। একই সঙ্গে ভুয়া চিকিৎসক শনাক্ত ও তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বেসরকারি চিকিৎসকদের জন্য সুস্পষ্ট বেতন কাঠামো নির্ধারণের দাবি তুলেছেন আন্দোলনকারীরা।
হাসপাতাল প্রশাসন জানিয়েছে, ইন্টার্নদের অনুপস্থিতিতেও জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ সেবা চালু রাখতে বিকল্প চিকিৎসক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সিনিয়র চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে কিছুটা হলেও সেবা অব্যাহত রাখার চেষ্টা চলছে। তবে দীর্ঘ সময় এই পরিস্থিতি চললে রোগীসেবায় বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
চিকিৎসা বিশ্লেষকরা বলছেন, ইন্টার্ন চিকিৎসকরা হাসপাতালের কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাদের কর্মবিরতি শুধু চিকিৎসা সেবাকেই নয়, পুরো হাসপাতাল ব্যবস্থাপনাকেই চাপের মুখে ফেলে দেয়। একই সঙ্গে এটি স্বাস্থ্য খাতে নীতিগত সিদ্ধান্ত ও পেশাগত নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত প্রশ্নগুলো আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
এর আগে গত কয়েক দিন ধরেই বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচি চলছিল। প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনার পরও সমাধান না আসায় শেষ পর্যন্ত তারা কর্মবিরতির পথে যান। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

