রাজধানীর বাসিন্দা আব্দুল হালিমের বয়স ৩৬ বছর। দীর্ঘদিন ধরে তিনি নিয়মিত ধূমপান করেন। একসময় প্রতিদিন একটি পূর্ণ প্যাকেট সিগারেট শেষ করতেন। তবে গত কয়েক বছরে সিগারেটের দাম ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকায় এখন তিনি দৈনিক ৬ থেকে ৭টি সিগারেটেই সীমাবদ্ধ থাকার চেষ্টা করছেন।
একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান সতীন্দ্রনাথ। তিনি আগে প্রতিদিন দেড় প্যাকেট সিগারেট খেতেন। দাম বাড়ার পর একাধিকবার ব্র্যান্ড পরিবর্তন করতে হয়েছে তাকে। প্রথমে তুলনামূলক কম দামের ব্র্যান্ডে গেলেও পরবর্তীতে সেটির দামও বাড়ায় আবার নতুন বিকল্প বেছে নিয়েছেন। অন্যদিকে সাব্বির আহমেদ জানান, তিনি তুলনামূলক কম ধূমপান করেন। তবে মূল্যবৃদ্ধির কারণে নিজের সিগারেট খাওয়ার পরিমাণ আরও কমিয়েছেন।
বেসরকারি চাকরিজীবী রফিক মৃধার মতে, ধীরে ধীরে অল্প অল্প করে দাম বাড়ানোর ফলে ধূমপায়ীরা পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছেন। তার বিশ্বাস, ধূমপান নিরুৎসাহিত করতে হলে এক ধাপে উল্লেখযোগ্য হারে মূল্য বৃদ্ধি প্রয়োজন।
রাজধানীর তোপখানা রোডের এক চায়ের আড্ডায় এসব অভিজ্ঞতা উঠে আসে। তবে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বাইরেও সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে, মূল্যবৃদ্ধি সত্ত্বেও দেশের অধিকাংশ তরুণ ধূমপায়ী ধূমপান ছাড়ছেন না। বরং তারা ব্র্যান্ড বদলাচ্ছেন, খরচ কমাচ্ছেন কিংবা নতুন ধরনের তামাকজাত পণ্যের দিকে ঝুঁকছেন।
‘ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ ট্রাস্ট’ পরিচালিত ‘তামাক কর বৃদ্ধির ফলে তরুণ ধূমপায়ীদের ওপর প্রভাব: প্রয়োজন শক্তিশালী তামাক কর নীতি’ শীর্ষক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের তরুণ ধূমপায়ীদের বড় অংশ মূল্যবৃদ্ধির পরও তাদের অভ্যাসে পরিবর্তন আনেননি।
দেশের আট বিভাগের ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী ৩৯১ জন তরুণ ধূমপায়ীর ওপর পরিচালিত এই গবেষণায় উঠে এসেছে, মাত্র ২০ দশমিক ৭২ শতাংশ তরুণ ধূমপানের পরিমাণ কমিয়েছেন। বিপরীতে ৭৯ দশমিক ২৮ শতাংশের আচরণে কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যায়নি। এর মধ্যে ৭৬ দশমিক ০৮ শতাংশের ধূমপানের পরিমাণ আগের মতোই রয়েছে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, ৩ দশমিক ২ শতাংশ তরুণের ধূমপান বরং বেড়েছে।
ব্র্যান্ড বদলে চলছে আসক্তি:
গবেষণায় দেখা গেছে, মূল্যবৃদ্ধির ফলে অনেক তরুণ ধূমপান ত্যাগ না করে সস্তা বিকল্পের দিকে ঝুঁকছেন। প্রায় ২১ দশমিক ২৩ শতাংশ তরুণ সরাসরি কম দামের ব্র্যান্ডে চলে গেছেন। অন্যদিকে ৫৮ দশমিক ৭৭ শতাংশ তরুণ প্রয়োজন অনুযায়ী মাঝেমধ্যে নতুন ও তুলনামূলক সস্তা ব্র্যান্ড ব্যবহার করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রবণতা প্রমাণ করে যে কেবল দাম বাড়ানো সবসময় কাঙ্ক্ষিত ফল দেয় না, বিশেষ করে যখন পণ্যটি আসক্তি তৈরি করে।
গবেষণার আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হলো, ধূমপানের ব্যয় মেটাতে তরুণরা নিজেদের প্রয়োজনীয় খরচ কমিয়ে দিচ্ছেন। তামাক কর বৃদ্ধির পর ১৮ দশমিক ৬৭ শতাংশ তরুণ জানিয়েছেন, তারা অন্য খাতের ব্যয় কমিয়ে সিগারেটের জন্য অর্থ জোগাড় করছেন।
এই গোষ্ঠীর মধ্যে ৭৬ দশমিক ৭৬ শতাংশ খাদ্য, যাতায়াত, যোগাযোগসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় কমিয়েছেন। ২৩ শতাংশ পারিবারিক বাজেট থেকে অর্থ সরিয়েছেন। আর ১ দশমিক ২৪ শতাংশ পড়াশোনা কিংবা বিনোদনের খরচ কমিয়ে সিগারেট কিনছেন। এটি স্পষ্টভাবে দেখায় যে তামাকাসক্তি অনেক ক্ষেত্রে মৌলিক প্রয়োজনের চেয়েও অগ্রাধিকার পাচ্ছে।
গবেষণায় সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে ই-সিগারেট বা ভেপিংয়ের ব্যবহার। ২০১৭ সালের গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে অনুযায়ী দেশে ই-সিগারেট ব্যবহারকারীর হার ছিল মাত্র শূন্য দশমিক ২ শতাংশ। কিন্তু ২০২৬ সালের এই গবেষণায় অংশগ্রহণকারী তরুণদের মধ্যে ই-সিগারেট বা ভেপ ব্যবহারকারীর হার বেড়ে ৭ দশমিক ৪২ শতাংশে পৌঁছেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আকর্ষণীয় বিপণন কৌশল এবং বিভিন্ন সুগন্ধিযুক্ত উপাদান তরুণদের দ্রুত এই নতুন আসক্তির দিকে টেনে নিচ্ছে। এ ছাড়া ৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ তরুণ সিগারেটের পাশাপাশি জর্দা বা গুলের মতো ধোঁয়াবিহীন তামাকও ব্যবহার করছেন।
গবেষণায় বাজারে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য অমান্যের বিষয়টিও উঠে এসেছে। ৭২ দশমিক ৩৮ শতাংশ তরুণ জানিয়েছেন, তারা নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে খুচরা সিগারেট কিনছেন। আবার ২৬ শতাংশ তরুণ সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য সম্পর্কে কোনো ধারণাই রাখেন না। গবেষকদের মতে, জটিল কর কাঠামো এবং খুচরা শলাকা বিক্রির সুযোগের কারণে তামাক কোম্পানিগুলো বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। এতে সরকারের তামাক নিয়ন্ত্রণ উদ্যোগও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
যেসব তরুণ ধূমপান কমিয়েছেন, তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে স্বাস্থ্য সচেতনতা। ধূমপান কমানো তরুণদের ৪১ দশমিক ৯৯ শতাংশ জানিয়েছেন, স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা ভেবে তারা সিগারেট কমিয়েছেন। এ ছাড়া ১৯ দশমিক ৮৮ শতাংশ আসক্তি বা আগ্রহ কমে যাওয়ার কারণে, ১৪ দশমিক ৩২ শতাংশ অর্থনৈতিক চাপে এবং ২৩ দশমিক ৮১ শতাংশ উন্মুক্ত স্থানে ধূমপানের সুযোগ সীমিত হওয়ার কারণে ধূমপান কমিয়েছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. রুমানা হক বলেন, সাধারণত কোনো পণ্যের দাম বাড়লে তার চাহিদা কমে। কিন্তু তামাকজাত পণ্যের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন, কারণ এটি আসক্তি সৃষ্টি করে। তার মতে, গবেষণায় দেখা গেছে তামাকপণ্যের দাম ১০ শতাংশ বাড়লে উন্নয়নশীল দেশে এর চাহিদা প্রায় ৬ শতাংশ কমে। অর্থাৎ মূল্যবৃদ্ধি কিছুটা ইতিবাচক প্রভাব ফেললেও এটি এককভাবে সমস্যার সমাধান নয়।
তিনি মনে করেন, তামাক নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হওয়া উচিত তরুণদের এই নেশা থেকে দূরে রাখা। এজন্য এমন করনীতি প্রয়োজন, যাতে তামাকজাত পণ্য তরুণদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায়।
অন্যদিকে ইমেরিটাস অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ বলেন, শুধু কর বৃদ্ধি করে ধূমপানের আসক্তি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এর পাশাপাশি প্রয়োজন কঠোর আইন ও কার্যকর বাস্তবায়ন। তার মতে, রাস্তাঘাট, পার্ক, রেস্তোরাঁ এবং গণপরিবহনের মতো উন্মুক্ত স্থানে ধূমপান বন্ধে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। একই সঙ্গে জনসচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যমসহ সব পর্যায়ে নিয়মিত প্রচার চালানো জরুরি।
গবেষণার প্রধান সুপারিশ: গবেষণায় তামাক নিয়ন্ত্রণে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করা হয়েছে—
- স্তরভিত্তিক কর কাঠামো বাতিল করে সহজ ও কার্যকর সুনির্দিষ্ট কর ব্যবস্থা চালু করা।
- খুচরা শলাকা সিগারেট বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা।
- সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য কঠোরভাবে তদারকি করা।
- ই-সিগারেট ও ভেপিং নিষিদ্ধে দ্রুত আইন প্রণয়ন করা।
- শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও জনসমাগমস্থলে তামাকবিরোধী প্রচার জোরদার করা।
- ধূমপান ত্যাগে সহায়তা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা।
বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনও তামাকবিরোধী আইন আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন। তার ভাষায়, তামাক এমন একটি আসক্তি যা মানুষের শরীরের প্রায় প্রতিটি অঙ্গকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং বিদ্যমান আইনের দুর্বলতার সুযোগে অনেক অপরাধী পার পেয়ে যাচ্ছে।

