বাংলাদেশ এখন এক গুরুত্বপূর্ণ জনমিতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো দেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী অর্থাৎ ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী মানুষের সংখ্যা নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর চেয়ে বেশি। অর্থনীতি ও জনসংখ্যা বিজ্ঞানে এই অবস্থাকে বলা হয় ‘জনমিতিক লভ্যাংশ’। এই সময়কে অর্থনৈতিক অগ্রগতির বড় সুযোগ হিসেবে দেখা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে দরকার সুস্থ, দক্ষ ও কর্মক্ষম মানবসম্পদ। কিন্তু দেশের বর্তমান স্বাস্থ্য খাতের বাস্তবতা সেই সম্ভাবনাকে বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংখ্যা বিজ্ঞান বিভাগের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেশের স্বাস্থ্য খাতের জনবল সংকটের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণাটির শিরোনাম ছিল— ‘বাংলাদেশে জনমিতিক লভ্যাংশ কাজে লাগাতে স্বাস্থ্য কর্মশক্তির সম্ভাবনা: সুযোগ, চ্যালেঞ্জ ও প্রভাব’। গবেষণায় বলা হয়েছে, তীব্র জনবল সংকট, ভৌগোলিক বৈষম্য, নীতিগত দুর্বলতা এবং সরকারি পদে বিপুল শূন্যতার কারণে দেশে প্রতি বছর প্রায় ৫ কোটি ৬০ লাখ কর্মঘণ্টার চিকিৎসাসেবা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী, প্রতি ১০ হাজার মানুষের জন্য অন্তত ৪৪ দশমিক ৫ জন চিকিৎসক, নার্স ও মিডওয়াইফ থাকা প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশে এই সংখ্যা মাত্র ১২ দশমিক ৭৮ জন অর্থাৎ, প্রয়োজনের মাত্র ২৯ শতাংশ পূরণ হচ্ছে। বাকি ৭১ শতাংশ ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে।
চিকিৎসক-নার্স অনুপাতেও বড় বৈষম্য:
আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী একজন চিকিৎসকের বিপরীতে ৩ জন নার্স এবং ৫ জন মিডওয়াইফ থাকা উচিত। কিন্তু বাস্তবে বাংলাদেশে এই অনুপাত মাত্র ১: ০.৭৪: ০.০৭৫। এই ঘাটতির কারণে হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা সেবা ব্যাহত হচ্ছে। চিকিৎসকদের অনেক প্রশাসনিক ও সহায়ক কাজ করতে হচ্ছে, যা মূলত নার্সদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।
সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, দেশে নার্স ও টেকনোলজিস্টের ঘাটতি দীর্ঘদিনের সমস্যা। তিনি বলেন, অনেক নার্স বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে আসছেন, যাদের মান নিয়ন্ত্রণে ঘাটতি রয়েছে। সরকারি পর্যায়ে বিএসসি নার্সের সংখ্যা কম। মিডওয়াইফারি সেবা এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।
তার মতে, মাতৃমৃত্যু কমাতে চিকিৎসকের তুলনায় অন্তত পাঁচগুণ বেশি মিডওয়াইফ প্রয়োজন। তারা মাঠপর্যায়ে গিয়ে নিরাপদ প্রসব নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী স্বাস্থ্য খাতের মোট অনুমোদিত পদের ২৮ দশমিক ৬ শতাংশই শূন্য। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে ৪৮ হাজার ৫২টি পদ খালি, যার মধ্যে চিকিৎসক পদও উল্লেখযোগ্যভাবে শূন্য। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরে ১৬ হাজার ৯২১টি পদ শূন্য। নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরে ৫ হাজার ৩৩৩টি পদ ফাঁকা। সব মিলিয়ে শূন্যপদের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭১ হাজার ৭৬৫টি। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও ধীর নিয়োগ প্রক্রিয়াই এই অবস্থার মূল কারণ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জরিপে দেখা গেছে, দেশে নিবন্ধিত চিকিৎসকের সংখ্যা এক লাখ ৩৬ হাজার ৮১৫ জন। অথচ প্রয়োজন প্রায় ৮৮ হাজার ১০৬ জন। সংখ্যাগতভাবে চিকিৎসক বেশি মনে হলেও বাস্তবে সরকারি খাতে চিকিৎসক খুবই কম। প্রতি এক হাজার মানুষের বিপরীতে সরকারি চিকিৎসক মাত্র শূন্য দশমিক ১৮ জন। একই গবেষণায় দেখা যায়, ৬৮ শতাংশ চিকিৎসক জানিয়েছেন, স্নাতকোত্তর শেষ করার পর অন্তত এক বছর বেকার থাকতে হয়েছে।
প্রতি বছর ২৩ থেকে ২৫ হাজার নতুন চিকিৎসক বের হলেও ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে সরকারি নিয়োগ হয়েছে মাত্র ১১ হাজার ২৮০ জন। এই ব্যবধান তরুণ চিকিৎসকদের মধ্যে হতাশা তৈরি করেছে এবং স্বাস্থ্য খাতে অস্থিরতা বাড়িয়েছে।
দেশের ১১৬টি চিকিৎসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৭৭টি বেসরকারি। মোট চিকিৎসকের ৬০ দশমিক ২৭ শতাংশ এবং নার্সের ৮১ দশমিক ০৫ শতাংশই বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে পাস করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত ল্যাব, প্রশিক্ষণ ও দক্ষ শিক্ষক নেই। এতে শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় উন্নয়ন বাজেটের গড়ে মাত্র ৭৬ শতাংশ ব্যবহার করতে পারে। বাকি অংশ ফেরত যায়। ফলে সাধারণ মানুষ তাদের মোট চিকিৎসা ব্যয়ের প্রায় ৭৯ দশমিক ৩ শতাংশ নিজের পকেট থেকে বহন করছে। এটি বিশ্বের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. রুমানা হক বলেন, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও কিডনি রোগের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগ বাড়ছে। সরকারি হাসপাতালে পর্যাপ্ত সেবা না থাকায় রোগীদের ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। তার মতে, অনেক পরিবার চিকিৎসার খরচ মেটাতে জমি-বাড়ি বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে।
গবেষণায় দেখা যায়, ৬০ থেকে ৬৯ শতাংশ স্বাস্থ্য স্নাতক বিদেশে চাকরির সুযোগ খুঁজছেন কিন্তু বিদেশে কাজের জন্য প্রয়োজনীয় ভাষা ও লাইসেন্সিং পরীক্ষায় অংশগ্রহণ খুবই কম। চিকিৎসকের মাত্র দেড় শতাংশ, নার্স ৩ দশমিক ৩ শতাংশ এবং মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ৪ দশমিক ৯ শতাংশ অংশ নেন। বর্তমানে স্বাস্থ্য খাতে আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থানের জন্য কোনো সুস্পষ্ট সরকারি কাঠামো নেই। ফলে বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ছে।
সুপারিশ ও সম্ভাব্য পথ: বিশেষজ্ঞরা সংকট মোকাবিলায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের কথা বলেছেন—
১. দ্রুত নিয়োগের জন্য পৃথক স্বাস্থ্য ক্যাডার বা বিশেষ বোর্ড গঠন
২. বেসরকারি চিকিৎসা ও নার্সিং শিক্ষার মান কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ
৩. আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থানের জন্য পৃথক সহায়তা ডেস্ক গঠন
৪. গ্রামীণ চিকিৎসকদের জন্য উন্নত সুবিধা ও ভাতা
৫. মাঠপর্যায়ে মিডওয়াইফ ও সহায়ক স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ বৃদ্ধি
৬. সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা ব্যবস্থা ও ই-হেলথ কার্ড চালু
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ আগামী এক থেকে দুই দশকই মূলত জনমিতিক লভ্যাংশের সুবিধা পাবে। এই সময়ের মধ্যে স্বাস্থ্য খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর না হলে বড় অর্থনৈতিক সুযোগ হারিয়ে যাবে। স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত বলেন, চিকিৎসকের সংখ্যা তুলনামূলক কম নয়, সমস্যা মূলত বণ্টনে। শহরে চিকিৎসক বেশি থাকলেও গ্রামের মানুষ চিকিৎসা সুবিধা থেকে বঞ্চিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আমিনুল হক মনে করেন, চিকিৎসকের সংখ্যা যথেষ্ট হলেও নার্স ও মিডওয়াইফের সংখ্যা দ্বিগুণ করা জরুরি।

