দেশে হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। সংস্থাটির দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, হামে মারা যাওয়া শিশুদের ৯২ শতাংশই হাম-রুবেলা (এমআর) টিকার কোনো ডোজ নেয়নি।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, মৃত্যুবরণকারী শিশুদের প্রায় এক-চতুর্থাংশের বয়স ছিল ৯ মাসের কম, অর্থাৎ টিকা গ্রহণের নির্ধারিত বয়স হওয়ার আগেই তারা প্রাণ হারিয়েছে।
সম্প্রতি শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বোতে অনুষ্ঠিত ডব্লিউএইচওর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের হাম-রুবেলা নির্মূলবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের বৈঠকে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে উপস্থাপন করা হয়। সেখানে জানানো হয়, শিশুদের মধ্যে পর্যাপ্ত রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি না হওয়া এবং টিকাদান কর্মসূচির আওতায় শতভাগ শিশুকে আনা না যাওয়ায় পরিস্থিতি উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে ২৮ জুন পর্যন্ত দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ৭০৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৬১৫ জন উপসর্গ নিয়ে মারা গেলেও পরীক্ষাগারে ৯৩ জনের মৃত্যু সরাসরি হামে আক্রান্ত হওয়ার কারণে নিশ্চিত হয়েছে। তবে রোগতত্ত্ববিদদের মতে, প্রাদুর্ভাবের সময় যেসব রোগী হামের উপসর্গ নিয়ে মারা যান, তাদের মৃত্যুকেও কার্যত হামজনিত মৃত্যু হিসেবেই বিবেচনা করা হয়।
কলম্বোর বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন হাম ও রুবেলা নির্মূল কার্যক্রম যাচাইয়ের জাতীয় কমিটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান। তিনি জানান, সভায় উপস্থাপিত তথ্য জুন মাসের প্রথমার্ধ পর্যন্ত সংগ্রহ করা হয়েছিল। তাঁর ধারণা, জুনের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেড়ে গেলেও টিকা না পাওয়া শিশুদের হার প্রায় একই রয়ে গেছে।
সভায় উপস্থাপিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, হামে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২৬ শতাংশের বয়স ছিল ৯ মাসের কম। এছাড়া ৯ থেকে ১১ মাস বয়সী ছিল ১৪ শতাংশ, ১ থেকে ২ বছর বয়সী ১৩ শতাংশ, ২ থেকে ৫ বছর বয়সী ১৮ শতাংশ, ৫ থেকে ৯ বছর বয়সী ১৩ শতাংশ এবং ১০ থেকে ১৫ বছর বয়সী ৪ শতাংশ। অন্যদিকে ১৫ বছরের বেশি বয়সীদের হার ছিল ১২ শতাংশ। এই তথ্য ইঙ্গিত দেয় যে, শুধু শিশু নয়, বড় শিশু ও প্রাপ্তবয়স্করাও হামের ঝুঁকির বাইরে নন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ১৫ মার্চ থেকে ২৮ জুন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন ৯৮ হাজার ২৬৬ জন। এর মধ্যে পরীক্ষায় ১১ হাজার ৫৯৪ জনের শরীরে হাম নিশ্চিত হয়েছে। চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৭৮ হাজার ২৮৭ জন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হামের মতো অত্যন্ত সংক্রামক রোগ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় সময়মতো টিকাদান। একটি এলাকায় টিকাদানের হার কমে গেলে দ্রুত সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। বিশেষ করে যেসব শিশু এখনো টিকা নেওয়ার বয়সে পৌঁছায়নি, তাদের সুরক্ষার জন্য সমাজে সামগ্রিক টিকাদানের হার উচ্চ পর্যায়ে রাখা অত্যন্ত জরুরি।
চলতি বছরে বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, নেপাল, থাইল্যান্ড ও মালদ্বীপে হামের সংক্রমণ বেড়েছে। তবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে ডব্লিউএইচও বিশেষ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অধিকাংশ মৃত শিশু টিকার বাইরে থাকায় জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির আওতা আরও বিস্তৃত করার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
এই পরিস্থিতিতে ডব্লিউএইচও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে হাম নিয়ন্ত্রণে জরুরি ও লক্ষ্যভিত্তিক পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের পরিস্থিতি সরেজমিনে মূল্যায়নের জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল পাঠানোর সুপারিশও করা হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি আরও শক্তিশালী করা, বাদ পড়া শিশুদের দ্রুত শনাক্ত করে টিকার আওতায় আনা, মাঠপর্যায়ে নজরদারি বাড়ানো এবং অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি ছাড়া হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে। তাদের মতে, সময়মতো টিকা নিশ্চিত করা গেলে এই রোগে মৃত্যু ও জটিলতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব।

