দেশে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। এর মধ্যেই বর্ষা মৌসুমে দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে ডেঙ্গু সংক্রমণ। একদিকে প্রতিদিন শত শত হাম রোগীর চাপ, অন্যদিকে ডেঙ্গুর ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণ—এই দুই পরিস্থিতি একসঙ্গে সামাল দিতে গিয়ে হাসপাতালগুলোকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, এখনই কার্যকর প্রস্তুতি না নিলে আগামী জুলাই-আগস্টে স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর নজিরবিহীন চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, গত কয়েক বছরে ডেঙ্গুর সবচেয়ে বড় চাপ সামলানো রাজধানীর সরকারি হাসপাতালগুলো বর্তমানে হামের রোগীতে প্রায় পূর্ণ। ফলে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়তে শুরু করলে শয্যা, আইসিইউ, চিকিৎসক, নার্স ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হবে। এতে শুধু ডেঙ্গু বা হাম নয়, অন্যান্য রোগীর চিকিৎসাসেবাও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে রাজধানীর ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড-১৯ হাসপাতালের পরিবর্তিত ভূমিকা। গত মার্চের মাঝামাঝি থেকে হাসপাতালটিকে পুরোপুরি হাম চিকিৎসার জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে এটি আর ডেঙ্গু রোগী ভর্তি করছে না। অথচ গত বছর এই হাসপাতালই রাজধানীতে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা দিয়েছিল। ফলে এবার ডেঙ্গু রোগীদের চাপ অন্যান্য সরকারি হাসপাতালে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের জুন মাসেই ডেঙ্গু পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য অবনতি হয়েছে। বছরের প্রথম ছয় মাসে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া মোট ৬ হাজার ১০৪ ডেঙ্গু রোগীর মধ্যে ২ হাজার ৯০৭ জনই ভর্তি হয়েছেন শুধু জুন মাসে, যা মোট রোগীর প্রায় ৪৮ শতাংশ। একইভাবে এ বছর ডেঙ্গুতে এখন পর্যন্ত ১৮ জনের মৃত্যুর মধ্যে ১৩ জনই জুন মাসে মারা গেছেন। পরে আরও একজনের মৃত্যুর তথ্য যুক্ত হয়েছে এবং একদিনেই নতুন করে ১৬৩ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। অর্থাৎ বর্ষার শুরুতেই ডেঙ্গু সংক্রমণ দ্রুত বাড়ছে।
অন্যদিকে হামের প্রাদুর্ভাব এখনও বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে রয়েছে। গত ১৫ মার্চ থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত হাম অথবা হামের মতো উপসর্গ নিয়ে ৭১৮ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে এক লাখ ১৩ হাজারের বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, যাদের অধিকাংশই শিশু।
সরকারের জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচির আওতায় এপ্রিল ও মে মাসে প্রায় ১ কোটি ৮৪ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। এতে সংক্রমণের গতি কিছুটা কমলেও হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেনি।
জুন মাসে হাম বা হাম-সদৃশ উপসর্গে আক্রান্ত ৩৩ হাজার ৬৬ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে এক হাজার ১০২ জন নতুন রোগী পাওয়া গেছে। একই মাসে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২৭ হাজার ৭৪১ জন, যা দৈনিক গড়ে প্রায় ৯২৫ জন। মার্চের মাঝামাঝি থেকে জুনের শেষ পর্যন্ত মোট ৮৫ হাজার ৫০৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৮১ হাজার ৮৮২ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেও এখনো তিন হাজার ৬২৭ জন চিকিৎসাধীন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্ষাকাল এডিস মশার বংশবিস্তারের সবচেয়ে উপযোগী সময়। তাই জুলাই ও আগস্টে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে রাজধানীর বাইরে জেলা শহরগুলোতে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগস্ট মাসে ডেঙ্গুর বড় ধরনের বিস্তার দেখা যেতে পারে, বিশেষ করে বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন জেলায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু ও হাম একসঙ্গে ছড়িয়ে পড়লে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় অতিরিক্ত জটিলতা তৈরি হয়। হাম অত্যন্ত সংক্রামক হওয়ায় আক্রান্তদের আলাদা আইসোলেশনে রাখতে হয়। অন্যদিকে ডেঙ্গু রোগীদের নিবিড় পর্যবেক্ষণ, পর্যাপ্ত স্যালাইন, রক্তের উপাদান ও বিশেষায়িত চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। ফলে একই হাসপাতালে দুটি রোগের জন্য পৃথক চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড-১৯ হাসপাতাল ইতোমধ্যে ৯ হাজার ৫৮৪ জন হাম রোগীর চিকিৎসা দিয়েছে। বর্তমানে সেখানে শত শত রোগী ভর্তি রয়েছেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রতিটি তলায় হাম রোগী থাকায় সেখানে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি করা সম্ভব হচ্ছে না। কারণ একজন ডেঙ্গু রোগী যদি হামেও আক্রান্ত হন, তাহলে তার শারীরিক অবস্থা আরও জটিল হয়ে যেতে পারে।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটও বর্তমানে হাম আক্রান্ত শিশুদের অন্যতম প্রধান চিকিৎসাকেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে। হাসপাতালটি ইতোমধ্যে প্রায় দেড় হাজার হাম রোগীর চিকিৎসা দিয়েছে এবং এখনও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রোগী ভর্তি রয়েছে। তবে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সম্ভাব্য ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় একটি অস্থায়ী ওয়ার্ড প্রস্তুত করা হচ্ছে।
দেশের সবচেয়ে বড় সরকারি হাসপাতাল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও একই সঙ্গে হাম ও ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা চলছে। সেখানে ডেঙ্গুর জন্য নির্ধারিত ৫০ শয্যার ওয়ার্ড চালু রয়েছে। পাশাপাশি হাম রোগীদের জন্যও আলাদা ইউনিট রাখা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক প্রস্তুতি যথেষ্ট হবে না। ডেঙ্গুর প্রকোপ এখন ঢাকার বাইরেও দ্রুত বাড়ছে। তাই বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে অস্থায়ী ডেঙ্গু ইউনিট, অতিরিক্ত শয্যা, প্রয়োজনীয় ওষুধ, স্যালাইন এবং প্রশিক্ষিত জনবল নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে লার্ভা ধ্বংস, মশার প্রজননস্থল নির্মূল এবং জনসচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করাও জরুরি।
ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে জরুরি বৈঠক করেছে। বৈঠকে হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য আলাদা শয্যা, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও স্যালাইনের পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সিটি করপোরেশনগুলোকে মশক নিধন কার্যক্রম আরও জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হামের প্রাদুর্ভাব পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসার আগেই যদি ডেঙ্গু বড় আকার ধারণ করে, তাহলে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা একযোগে দুই বড় সংক্রামক রোগের চাপের মুখে পড়বে। তাই পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, হাসপাতালের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সমন্বিত জনস্বাস্থ্য উদ্যোগ বাস্তবায়ন এখন সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন।

