টানা দুই বছর প্রয়োজনীয় মাত্রায় হামের টিকাদান নিশ্চিত করতে না পারায় বাংলাদেশে হার্ড ইমিউনিটি বা সামষ্টিক রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের মতো অত্যন্ত সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে দুই ডোজ টিকার আওতায় আনা প্রয়োজন।
কিন্তু ২০২৫ ও ২০২৬—দুই বছরই সেই লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। ফলে লাখো শিশু সুরক্ষার বাইরে থেকে গেছে, যা শুধু বর্তমান নয়, আগামী কয়েক বছরও বড় ধরনের প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে নতুন করে ১০৬ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত হয়েছে আরও ৭৯৬ জন। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সংক্রমণ পরিস্থিতি কেবল সাময়িক নয়; এটি গত দুই বছরের টিকাদান ঘাটতিরও প্রতিফলন।
বাংলাদেশ একসময় দক্ষিণ এশিয়ায় হামের বিরুদ্ধে সফল লড়াইয়ের উদাহরণ হিসেবে পরিচিত ছিল। নিয়মিত সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি এবং নির্দিষ্ট সময় অন্তর জাতীয় গণটিকাদান কার্যক্রমের মাধ্যমে দেশে হামের সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছিল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্মূল কৌশলের অংশ হিসেবে ২০০৬, ২০১০ ও ২০১৪ সালে জাতীয় পর্যায়ে হামের টিকাদান কর্মসূচি পরিচালিত হয়। কোভিড-১৯ মহামারির সময়ও ২০২০-২১ সালে বিশেষ কর্মসূচি চালানো হয়েছিল। এসব উদ্যোগের ফলে দীর্ঘ সময় দেশের অধিকাংশ এলাকায় প্রয়োজনীয় হার্ড ইমিউনিটি বজায় ছিল।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেই ধারাবাহিকতায় বড় ধরনের ভাটা পড়েছে। ২০২৫ সালে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৫৯ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনা সম্ভব হয়। এরপর চলতি বছরে জাতীয় এমআর (হাম-রুবেলা) টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে কভারেজ প্রায় ৮১ শতাংশে উন্নীত হলেও প্রয়োজনীয় ৯৫ শতাংশের অনেক নিচে থেকে যায়। এর ফলে প্রায় ৩৯ লাখ শিশু এখনও টিকার বাইরে রয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হামের মতো রোগের ক্ষেত্রে ৮১ শতাংশ কভারেজ মোটেও নিরাপদ নয়। কারণ, একজন হাম আক্রান্ত ব্যক্তি গড়ে ১২ থেকে ১৮ জনকে সংক্রমিত করতে পারেন। এ কারণেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ৯৫ শতাংশ বা তার বেশি কভারেজকে হার্ড ইমিউনিটি অর্জনের ন্যূনতম শর্ত হিসেবে বিবেচনা করে। এই সীমা পূরণ না হলে অল্পসংখ্যক টিকাবঞ্চিত শিশুর মাধ্যমেও দ্রুত সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমানের মতে, হার্ড ইমিউনিটি একদিনে তৈরি হয় না, আবার একদিনে নষ্টও হয় না। কিন্তু টানা দুই বছর পর্যাপ্ত সংখ্যক শিশু টিকা না পেলে ধীরে ধীরে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থায় বড় ধরনের ফাঁক তৈরি হয়। এক বছরে টিকাদানে ঘাটতি থাকলে পরের বছর তা কিছুটা পূরণ করা সম্ভব হলেও পরপর দুই বছর একই পরিস্থিতি চললে টিকাবঞ্চিত শিশুর সংখ্যা জমতে থাকে এবং ভবিষ্যতের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, প্রতি বছর নতুন জন্ম নেওয়া শিশুরা টিকাদান কর্মসূচির ওপর নির্ভরশীল। যখন আগের বছরের টিকাবঞ্চিত শিশুদের সঙ্গে নতুন জন্ম নেওয়া শিশুরাও যুক্ত হয়, তখন অল্প সময়ের মধ্যেই বড় একটি অরক্ষিত জনগোষ্ঠী তৈরি হয়। ফলে একটি সংক্রমণ দ্রুত জাতীয় পর্যায়ে বিস্তার লাভ করতে পারে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রাদুর্ভাব শুরুর পর গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গে ৭৪২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৯০ হাজার ৫২২ জন। এছাড়া প্রায় ১৩ হাজার রোগীর হাম পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হয়েছে।
এবারের জাতীয় এমআর টিকাদান কর্মসূচিতে ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী ১ কোটি ৮৪ লাখ ৭৭ হাজার ৬১৬ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে একই বয়সী শিশুদের জন্য ২৮ জুন পরিচালিত ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইনে অংশ নেয় ২ কোটি ২৩ লাখেরও বেশি শিশু। এই দুই কর্মসূচির তুলনায় দেখা যাচ্ছে, প্রায় ৩৯ লাখ শিশু ভিটামিন ‘এ’ পেলেও হাম-রুবেলা টিকার আওতায় আসেনি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাও এই বড় ব্যবধানের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তাঁদের মতে, অতীতেও ভিটামিন ‘এ’ কর্মসূচি ও টিকাদানের মধ্যে কিছু পার্থক্য থাকলেও এবার ব্যবধান ছিল অনেক বেশি। কেন এত শিশু বাদ পড়ল, তা বিশ্লেষণ করে কারণ খুঁজে বের করার কাজ চলছে।
জনস্বাস্থ্যবিদ তাজুল ইসলাম এ বারীর মতে, প্রায় ৮১ শতাংশ কভারেজ অর্জিত হলেও হামের মতো সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে তা যথেষ্ট নয়। তাঁর ভাষায়, একই সময়ে যত শিশুর কাছে ভিটামিন ‘এ’ পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে, ততজনকে এমআর টিকার আওতায় আনা যায়নি। এটি কর্মসূচির পরিকল্পনা, প্রচার এবং বাস্তবায়নে বড় ধরনের সীমাবদ্ধতার ইঙ্গিত দেয়। তাঁর মতে, এত বিপুলসংখ্যক শিশু টিকার বাইরে থাকা শুধু তাদের জন্য নয়, পুরো সমাজের জন্যই উদ্বেগের বিষয়।
বাংলাদেশের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি দীর্ঘদিন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসিত হয়েছে। ১৯৭৯ সালে যাত্রা শুরু করা এই কর্মসূচির মাধ্যমে শিশুদের পূর্ণ টিকাদানের হার ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পায়। ২০০৬ সালের জাতীয় হাম টিকাদান কর্মসূচিতে কোটি কোটি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়। এরপর ২০১০ সালের ফলো-আপ কর্মসূচি এবং ২০১৪ সালের হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে ৫ কোটির বেশি শিশুকে সুরক্ষার আওতায় আনা হয়।
হাম-রুবেলার সম্মিলিত টিকা চালুর পর ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশে টিকাদানের হার সাধারণত ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশের মধ্যে ছিল। এর ফলে শুধু হাম নয়, রুবেলা নিয়ন্ত্রণেও উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করে বাংলাদেশ। অনেক এলাকায় দীর্ঘ সময় বড় ধরনের সংক্রমণ দেখা যায়নি, কারণ তখন প্রয়োজনীয় হার্ড ইমিউনিটি বিদ্যমান ছিল।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফসহ আন্তর্জাতিক অংশীদার সংস্থাগুলোর মতে, জরুরি এমআর টিকাদান কর্মসূচি সময়মতো শুরু হওয়ায় ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে। তবে এখনও যারা টিকার বাইরে রয়েছে, তাদের দ্রুত শনাক্ত করে টিকার আওতায় আনতে না পারলে বর্তমান ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হবে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো পরিপূরক টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা করা। এই ধরনের বিশেষ কর্মসূচির মাধ্যমে জাতীয় টিকাদানে বাদ পড়া শিশুদের দ্রুত সুরক্ষার আওতায় আনা সম্ভব।
অধ্যাপক মাহমুদুর রহমানের মতে, নতুন কর্মসূচি শুরুর আগে কোন কোন এলাকায় টিকাদানের হার সবচেয়ে কম ছিল এবং কোন বয়সী শিশুরা বেশি বাদ পড়েছে, সে বিষয়ে নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ করা জরুরি। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে টিকাদান পরিচালনা করা উচিত।
জনস্বাস্থ্যবিদ তাজুল ইসলাম এ বারী বলেন, শুধু টিকা দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। টিকাদানের কার্যকারিতা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, মাঠপর্যায়ে নিবিড় মনিটরিং এবং সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি প্রয়োজন হলে রক্ত পরীক্ষা করে টিকা নেওয়ার পর শিশুদের শরীরে যথাযথ রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছে কি না, তাও যাচাই করার উদ্যোগ নেওয়া উচিত বলে তিনি মত দেন।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের অভিমত, গত দুই বছরের টিকাদান ঘাটতি দ্রুত পূরণ করা না গেলে বাংলাদেশে হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনতে আরও বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হতে পারে। তাই নিয়মিত টিকাদানের পাশাপাশি বাদ পড়া প্রতিটি শিশুকে দ্রুত সুরক্ষার আওতায় আনাই এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার।

