বাংলাদেশের ২৭৩টি নমুনার ১৪.৭ শতাংশে অনুমোদিত সীমার বেশি অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল পাওয়া গেছে। তবে ওষুধের উপস্থিতি মানেই মাংস বিষাক্ত নয়। গবেষণার সংখ্যাগুলো বরং প্রশ্ন তুলছে—আমরা কি মুরগিকে ভয় পাচ্ছি, নাকি নিয়ন্ত্রণহীন উৎপাদনব্যবস্থাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছি না?
বাংলাদেশের অধিকাংশ পরিবারের কাছে ফার্মের বা ব্রয়লার মুরগি এখন বিলাসী খাবার নয়; এটি দৈনন্দিন আমিষের অন্যতম প্রধান উৎস। গরু ও খাসির মাংসের তুলনায় কম দাম, সহজলভ্যতা এবং দ্রুত রান্নার সুবিধার কারণে বাজারে এর চাহিদা ব্যাপক।
কিন্তু জনপ্রিয়তার পাশাপাশি একটি প্রশ্নও দীর্ঘদিন ধরে ঘুরছে—ফার্মের মুরগি খাওয়া কি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্রয়লার মুরগিকে কখনো ‘বিষাক্ত’, কখনো ক্যানসার বা হরমোনজনিত রোগের কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়। বিপরীতে, শিল্পসংশ্লিষ্ট অনেকে একে পুরোপুরি নিরাপদ বলে দাবি করেন। গবেষণার ফল বলছে, দুই পক্ষের এই চরম অবস্থানের কোনোটিই সম্পূর্ণ সত্য নয়।
ব্রয়লার মুরগি নিজে বিষাক্ত কোনো খাবার নয়। কিন্তু খামারে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ধরন, ওষুধ দেওয়ার পর কত দ্রুত মুরগি বিক্রি করা হচ্ছে, খাদ্যের মান, জবাইয়ের পরিবেশ এবং সংরক্ষণব্যবস্থা—এসবের ওপর মাংসের নিরাপত্তা নির্ভর করে।
বাংলাদেশের প্রতি ১০০ নমুনার প্রায় ১৫টিতে অনিয়ম
২০২৬ সালের ৪ এপ্রিল npj Science of Food–এ প্রকাশিত এক আন্তর্জাতিক গবেষণায় বাংলাদেশ, ভারত ও ভিয়েতনাম থেকে সংগ্রহ করা ৫৫৮টি মুরগির বুকের মাংস পরীক্ষা করা হয়। গবেষকেরা প্রতিটি নমুনায় ৬৯ ধরনের পশুচিকিৎসায় ব্যবহৃত অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল খুঁজেছেন।
এর মধ্যে বাংলাদেশের নমুনা ছিল ২৭৩টি। সেগুলো ৯৯টি খামার এবং ৫০টি বাজার বা বিক্রয়কেন্দ্র থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল।
গবেষণায় বাংলাদেশের ৪০টি নমুনা, অর্থাৎ ১৪.৭ শতাংশে, অন্তত একটি অ্যান্টিমাইক্রোবিয়ালের পরিমাণ ইউরোপীয় ইউনিয়নের সর্বোচ্চ অবশিষ্টাংশ সীমা বা MRL অতিক্রম করেছে। নয়টি নমুনায় অন্তত একটি ওষুধের পরিমাণ নির্ধারিত সীমার ১০ গুণেরও বেশি ছিল।
তিন দেশ মিলিয়ে ৫৫৮টি নমুনার ১১.৬ শতাংশ মানসম্মত ছিল না। খামারে উৎপাদনের শেষ পর্যায় থেকে সংগ্রহ করা নমুনার ক্ষেত্রে এই হার ছিল ২০ শতাংশ। মুরগি বিক্রি বা জবাইয়ের স্থানে এসে তা কমে ৭.২ শতাংশে দাঁড়ায়। গবেষণাটিকে প্রকাশক এখনো সম্পাদনার আগের প্রাথমিক সংস্করণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, তবে এর নমুনার সংখ্যা ও পরীক্ষাপদ্ধতি দক্ষিণ এশিয়ার খাদ্যনিরাপত্তা আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ নতুন তথ্য যোগ করেছে।
এই সংখ্যার সহজ অর্থ হলো—পরীক্ষা করা বাংলাদেশের প্রতি ১০০টি নমুনার প্রায় ১৫টি নির্ধারিত মান পূরণ করেনি। তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য বোঝা প্রয়োজন।
ওষুধের চিহ্ন পাওয়া আর মাংস অনিরাপদ হওয়া এক কথা নয়
কোনো নমুনায় অ্যান্টিবায়োটিক শনাক্ত হওয়া মানেই সেই মাংস বিষাক্ত বা খাওয়ার অযোগ্য—এমন সিদ্ধান্ত বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়।
সর্বোচ্চ অবশিষ্টাংশ সীমা বা MRL হলো খাদ্যে কোনো নির্দিষ্ট পশু-ওষুধের কতটুকু অবশিষ্টাংশ গ্রহণযোগ্য থাকবে, তার বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড। পরীক্ষায় ওষুধের পরিমাণ এই সীমার নিচে থাকলে তা সাধারণত গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু সীমা অতিক্রম করলে উৎপাদনব্যবস্থার কোথাও অনিয়মের আশঙ্কা তৈরি হয়।
এর একটি সম্ভাব্য কারণ হলো ‘উইথড্রয়াল পিরিয়ড’ না মানা। মুরগিকে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়ার পর শরীর থেকে ওষুধের পরিমাণ নিরাপদ স্তরে নেমে আসার জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় অপেক্ষা করতে হয়। সেই সময় শেষ হওয়ার আগেই মুরগি জবাই বা বাজারজাত করা হলে মাংসে মাত্রাতিরিক্ত অবশিষ্টাংশ থেকে যেতে পারে।
তাই সংবাদে শুধু ‘অ্যান্টিবায়োটিক পাওয়া গেছে’ বললে পুরো সত্য বলা হয় না। মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত—কোন ওষুধ পাওয়া গেছে, কত মাত্রায় পাওয়া গেছে এবং সেটি অনুমোদিত সীমা অতিক্রম করেছে কি না।
ময়মনসিংহের পরীক্ষায় ৩৫ শতাংশ মাংসে ওষুধের চিহ্ন
২০২৩ সালে প্রকাশিত আরেক গবেষণায় ময়মনসিংহ বিভাগের কয়েকটি এলাকা থেকে মাংস, ডিম, পোলট্রি খাদ্য ও মলের মোট ২৩০টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়।
প্রাথমিক পরীক্ষায় সব নমুনা মিলিয়ে ২৩.৫ শতাংশে বিভিন্ন অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশ পাওয়া যায়। ব্রয়লার মাংসের ক্ষেত্রে ৩৫ শতাংশ নমুনায় ওষুধের চিহ্ন শনাক্ত হয়েছিল। পোলট্রি খাদ্যের ১৫.৮ শতাংশ এবং ব্রয়লার মলের ৫০ শতাংশ নমুনাতেও অ্যান্টিবায়োটিক পাওয়া যায়।
তবে পরিমাণগত পরীক্ষায় দেখা যায়, মাংসের মাত্র ২.৫ শতাংশ নমুনায় অ্যান্টিবায়োটিকের পরিমাণ MRL অতিক্রম করেছিল। অর্থাৎ প্রাথমিক পরীক্ষায় ৩৫ শতাংশ নমুনায় ওষুধের উপস্থিতি পাওয়া গেলেও সবগুলো অনিরাপদ মাত্রায় ছিল না।
এই ফলাফল দেখায়, বড় একটি শতাংশ উদ্ধৃত করার আগে পরীক্ষার ধরন বুঝতে হয়। ‘ওষুধ শনাক্ত হয়েছে’ এবং ‘ওষুধ নিরাপদ সীমা ছাড়িয়েছে’—দুটি আলাদা ফল।
‘নিরাপদ’ বলা গবেষণাতেও সিসার প্রশ্ন রয়ে গেছে
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের গবেষকদের ২০২৩ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ঢাকা, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও বরিশালের বিভিন্ন খামার, কাঁচাবাজার এবং সুপারশপ থেকে ২৯৫টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়।
এর মধ্যে ছিল বুকের মাংসের ৯৮টি, হাড়ের ৯৮টি এবং কলিজা, কিডনি ও গিজার্ডের সমন্বয়ে তৈরি ৯৯টি নমুনা। প্রতিটি নমুনা আবার চারটি মুরগির টিস্যু একত্র করে প্রস্তুত করা হয়েছিল।
গবেষণায় অধিকাংশ অ্যান্টিবায়োটিক, আর্সেনিক ও ক্রোমিয়ামের গড় মাত্রা নির্ধারিত সীমার নিচে পাওয়া যায়। এ কারণে গবেষকেরা সামগ্রিকভাবে ব্রয়লার মাংসকে খাওয়ার উপযোগী বলে মন্তব্য করেন।
কিন্তু একই গবেষণায় সিসা বা লেডের ফল অস্বস্তিকর ছিল। সামগ্রিক মাংসের নমুনায় গড়ে প্রতি কেজিতে ২৬৩.৮ মাইক্রোগ্রাম সিসা পাওয়া যায়, যেখানে গবেষণায় ব্যবহৃত সীমা ছিল প্রতি কেজিতে ১০০ মাইক্রোগ্রাম। গবেষণাপত্রে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, পরীক্ষিত অ্যান্টিবায়োটিক ও অধিকাংশ ভারী ধাতু সীমার নিচে থাকলেও সিসার পরিমাণ ছিল ব্যতিক্রম।
সুপারশপের নমুনায় খামার ও কাঁচাবাজারের তুলনায় অ্যান্টিবায়োটিক ও ভারী ধাতুর মাত্রা কম ছিল। কিন্তু সেখানেও হাড় ও ভোজ্য অঙ্গের যৌথ নমুনায় সিসার পরিমাণ সংশ্লিষ্ট সীমার ওপরে পাওয়া যায়।
এখানে প্রশ্ন ওঠে—একটি গবেষণায় অধিকাংশ ফল গ্রহণযোগ্য হলেও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ফল সীমার বাইরে থাকলে সেটিকে শুধু ‘মুরগি নিরাপদ’ শিরোনামে প্রকাশ করা কতটা যথাযথ?
গড় ফল স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু গড়ের আড়ালে থাকা ব্যতিক্রমই কখনো কখনো জনস্বাস্থ্যের বড় সতর্কসংকেত।
পুরোনো গবেষণাও একই সমস্যার ইঙ্গিত দিয়েছিল
২০১৮ সালের একটি গবেষণায় বাংলাদেশের বিভিন্ন খামার ও বাজার থেকে মুরগির বুকের মাংস, রান এবং কলিজার মোট ১৬০টি নমুনা সংগ্রহ করা হয়।
বুকের মাংসের ৩৯ শতাংশ নমুনায় সিপ্রোফ্লক্সাসিনের উপস্থিতি শনাক্ত হয়। ডক্সিসাইক্লিন পাওয়া যায় ২৬ শতাংশ, অ্যামোক্সিসিলিন ২৪ শতাংশ, অক্সিটেট্রাসাইক্লিন ২৩ শতাংশ এবং এনরোফ্লক্সাসিন ২১ শতাংশ নমুনায়।
কলিজার নমুনায় হার আরও বেশি ছিল। সিপ্রোফ্লক্সাসিন পাওয়া যায় ৫২ শতাংশ, অক্সিটেট্রাসাইক্লিন ৪৬ শতাংশ, ডক্সিসাইক্লিন ৪৩ শতাংশ, অ্যামোক্সিসিলিন ৪২ শতাংশ এবং এনরোফ্লক্সাসিন ৩৬ শতাংশ নমুনায়।
তবে গবেষণায় থিন লেয়ার ক্রোমাটোগ্রাফি বা TLC পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছিল। এই পদ্ধতি মূলত কোনো উপাদানের সম্ভাব্য উপস্থিতি শনাক্ত করে; সেটির পরিমাণ নিরাপদ সীমার নিচে না ওপরে, তা নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করে না।
ফলে ‘৫২ শতাংশ কলিজায় অ্যান্টিবায়োটিক পাওয়া গেছে’ তথ্যটি উদ্বেগজনক হলেও, শুধু এই সংখ্যা দিয়ে ৫২ শতাংশ কলিজাকে খাওয়ার অযোগ্য বলা যাবে না।
খামারে ওষুধ ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন কারা?
মাংসে অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশ কেন থেকে যাচ্ছে, তার উত্তর খুঁজতে হলে খামারের ভেতরের চিত্র দেখতে হবে।
বাংলাদেশের ১৪০ জন বাণিজ্যিক পোলট্রি খামারির ওপর পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, ৪২.৯ শতাংশ খামারি রোগ হওয়ার আগেই প্রতিরোধমূলকভাবে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করতেন। একই শতাংশ খামারি আগের চিকিৎসার বেঁচে যাওয়া অ্যান্টিবায়োটিক আবার ব্যবহার করতেন।
অর্ধেক খামারি ওষুধ প্রয়োগের পর প্রয়োজনীয় উইথড্রয়াল পিরিয়ড মানতেন না। মাত্র ১৪.৩ শতাংশ এ বিরতি সম্পর্কে জানতেন এবং ৯৮.৬ শতাংশ খামারি অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স সম্পর্কে অবগত ছিলেন না। মাত্র ২৫.৭ শতাংশ খামারি পশুচিকিৎসকের পরামর্শে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করতেন।
২০২৫ সালে প্রকাশিত আরও বড় একটি গবেষণায় দেশের ৩৪০টি বাণিজ্যিক মুরগির খামার পর্যবেক্ষণ করা হয়। সেখানে ৩১৭টি খামার, অর্থাৎ ৯৩.২ শতাংশে, উৎপাদনচক্রের কোনো না কোনো সময়ে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ব্যবহারের তথ্য পাওয়া যায়। জরিপের আগের ১৪ দিনের মধ্যেই ৬৭ শতাংশ খামারে এসব ওষুধ ব্যবহার করা হয়েছিল।
এই তথ্যগুলো দেখায়, সমস্যাটি কেবল মাংসের ভেতরে থাকা কয়েক মাইক্রোগ্রাম রাসায়নিক নয়। বড় সমস্যা হলো এমন একটি উৎপাদনব্যবস্থা, যেখানে অনেক সময় পশুচিকিৎসকের বদলে খামারি, ওষুধ বিক্রেতা বা ফিড সরবরাহকারীর পরামর্শে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার হচ্ছে।
মাংসে ওষুধের পাশাপাশি জীবাণুর ঝুঁকিও আছে
ফার্মের মুরগি নিয়ে আলোচনায় অ্যান্টিবায়োটিক সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেলেও ভোক্তার জন্য তাৎক্ষণিক বিপদ অনেক সময় আসে জীবাণু থেকে।
ঢাকার চারটি কাঁচাবাজার ও তিনটি সুপারশপ থেকে সংগ্রহ করা ৫২টি মুরগির মাংসের নমুনা নিয়ে ২০২১ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় সাতটি নমুনায় সালমোনেলা পাওয়া যায়। অর্থাৎ সংক্রমণের হার ছিল ১৩.৪৬ শতাংশ।
ব্যাকটেরিয়ার মোট সংখ্যার মানদণ্ডে কাঁচাবাজারের মাত্র ৮.১৮ শতাংশ নমুনা গ্রহণযোগ্য সীমায় ছিল। সুপারশপের ক্ষেত্রে এ হার ছিল ৬০ শতাংশ। শনাক্ত সাতটি সালমোনেলা নমুনার প্রতিটিই একাধিক অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী ছিল।
নমুনার সংখ্যা তুলনামূলক কম হওয়ায় এই ফল দিয়ে বাংলাদেশের সব বাজার সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া যাবে না। তবে এটি স্পষ্ট করে যে অপরিচ্ছন্ন জবাই, দূষিত পানি, নোংরা ছুরি, কাটিং বোর্ড, কর্মীর হাত এবং যথাযথ ঠান্ডা সংরক্ষণের অভাব মাংসকে দ্রুত অনিরাপদ করে তুলতে পারে।
অ্যান্টিবায়োটিক অবশিষ্টাংশ একটি দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সমস্যা; কিন্তু সালমোনেলার মতো জীবাণু একই দিনেই খাদ্যবিষক্রিয়া ঘটাতে পারে।
ভালোভাবে রান্না করলেই কি সব ঝুঁকি শেষ?
মুরগি সম্পূর্ণ রান্না করলে সালমোনেলা, ক্যাম্পাইলোব্যাক্টর ও অন্যান্য খাদ্যবাহিত জীবাণুর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যায়। যুক্তরাষ্ট্রের রোগনিয়ন্ত্রণ সংস্থা সিডিসি মুরগির ভেতরের তাপমাত্রা কমপক্ষে ১৬৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা প্রায় ৭৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছানোর পরামর্শ দেয়।
কাঁচা মুরগি ধোয়া বাধ্যতামূলক নয়। বরং পানির ছিটায় জীবাণু সিংক, রান্নাঘরের টেবিল, ছুরি বা অন্য খাবারে ছড়িয়ে যেতে পারে। কাঁচা মুরগি ও প্রস্তুত খাবারের জন্য আলাদা কাটিং বোর্ড ব্যবহার করা এবং হাত ও ব্যবহৃত পাত্র ভালোভাবে পরিষ্কার করা জরুরি।
তবে রান্নাঘর দিয়ে খামারের সব অনিয়ম সংশোধন করা সম্ভব নয়। রান্না জীবাণুর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা, কিন্তু মুরগিকে অতিরিক্ত ওষুধ দেওয়া, সময়ের আগে জবাই করা বা খাদ্যশৃঙ্খলে ভারী ধাতু প্রবেশের সমাধান উৎপাদন পর্যায়েই করতে হবে।
তাহলে কি ফার্মের মুরগি খাওয়া বন্ধ করতে হবে?
বর্তমান গবেষণার ভিত্তিতে ফার্মের মুরগিকে এককথায় ‘বিষাক্ত’ বলা যাবে না। আবার বাজারের প্রতিটি মুরগি সমান নিরাপদ—এমন নিশ্চয়তাও দেওয়া যায় না।
অধিকাংশ গবেষণায় অ্যান্টিবায়োটিকের গড় মাত্রা অনুমোদিত সীমার নিচে পাওয়া গেছে। কিন্তু একই সঙ্গে এমন নমুনাও পাওয়া গেছে, যেখানে সীমা অতিক্রম করেছে; কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১০ গুণেরও বেশি।
তাই মুরগি সম্পূর্ণ বাদ দেওয়ার পরিবর্তে পরিচ্ছন্ন ও বিশ্বস্ত বিক্রেতার কাছ থেকে কেনা, যথাযথভাবে ঠান্ডায় সংরক্ষিত মাংস বেছে নেওয়া এবং সম্পূর্ণ রান্না করা বেশি বাস্তবসম্মত।
অস্বাভাবিক গন্ধ, অতিরিক্ত পিচ্ছিলভাব বা বিবর্ণ মাংস কেনা উচিত নয়। চামড়া বাদ দিয়ে কম তেল ও কম লবণে রান্না করলে অতিরিক্ত চর্বি ও ক্যালরি গ্রহণও কমানো যায়।
তবে নিরাপদ মুরগি বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে ভোক্তার ক্ষমতা সীমিত। মাংসের রং দেখে বোঝা যায় না মুরগিটিকে শেষ কবে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়েছিল কিংবা প্রয়োজনীয় বিরতি মানা হয়েছিল কি না।
ভোক্তা মুরগি দেখেন, কিন্তু তার ইতিহাস দেখতে পান না
একজন ক্রেতা বাজারে দাঁড়িয়ে মুরগির ওজন, রং ও দাম দেখতে পারেন। কিন্তু সেটি কোন খামার থেকে এসেছে, কী ওষুধ দেওয়া হয়েছিল, পশুচিকিৎসকের পরামর্শ ছিল কি না কিংবা কোন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে—এসব জানার সুযোগ তার নেই।
অর্থাৎ খাদ্যের নিরাপত্তা যাচাই করার দায়িত্ব আংশিকভাবে ভোক্তার ওপর থাকলেও প্রয়োজনীয় তথ্য তার হাতে দেওয়া হচ্ছে না।
এ কারণেই শুধু ‘বিশ্বস্ত দোকান থেকে কিনুন’ পরামর্শটি যথেষ্ট নয়। বিশ্বস্ততার ভিত্তি হওয়া উচিত পরীক্ষার ফল, খামারের রেকর্ড এবং সরবরাহব্যবস্থার স্বচ্ছতা—ব্যক্তিগত ধারণা নয়।
আশ্বাস নয়, নিয়মিত পরীক্ষার ফল প্রকাশ করতে হবে
নিরাপদ মুরগির বাজার গড়ে তুলতে হলে খামার, জবাইখানা ও বাজার থেকে নিয়মিত নমুনা পরীক্ষা করা প্রয়োজন। কত শতাংশ নমুনায় অ্যান্টিবায়োটিক পাওয়া গেল, কত শতাংশ MRL অতিক্রম করল এবং কোন অঞ্চলে অনিয়ম বেশি—এসব তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত।
প্রতিটি বাণিজ্যিক খামারে ব্যবহৃত ওষুধের লিখিত রেকর্ড, পশুচিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন এবং বাধ্যতামূলক উইথড্রয়াল পিরিয়ড নিশ্চিত করা দরকার। ব্যাচভিত্তিক শনাক্তকরণ ব্যবস্থা থাকলে অনিরাপদ মুরগির উৎসও দ্রুত চিহ্নিত করা সম্ভব হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সুস্থ প্রাণীর দ্রুত বৃদ্ধি বা নিয়মিত রোগ প্রতিরোধের জন্য অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার বন্ধ করার সুপারিশ করেছে। কারণ মানুষ, প্রাণী ও কৃষিতে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়ালের অপব্যবহার ও অতিরিক্ত ব্যবহার ওষুধ-প্রতিরোধী জীবাণু তৈরির প্রধান চালকগুলোর একটি।
২০১৯ সালে ব্যাকটেরিয়াজনিত অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বিশ্বে সরাসরি প্রায় ১২ লাখ ৭০ হাজার মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়েছিল এবং প্রায় ৪৯ লাখ ৫০ হাজার মৃত্যুর সঙ্গে এর সম্পর্ক ছিল। ফার্মের মুরগি একা এই বৈশ্বিক সংকটের জন্য দায়ী নয়। তবে প্রাণিসম্পদ খাতে অনিয়ন্ত্রিত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার সমস্যাটির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ফার্মের মুরগি নিয়ে তাই মূল প্রশ্নটি শুধু—“খাব কি খাব না”—এত সরল নয়।
আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো: কোন খামারের মুরগি নিরাপদ, কোন ব্যাচ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ এবং সেই তথ্য ভোক্তা জানতে পারবেন কীভাবে?
একটি খাদ্যকে নিরাপদ প্রমাণ করার দায়িত্ব বিজ্ঞাপনের নয়, পরীক্ষাগারের। আর পরীক্ষার ফল প্রকাশ না করে শুধু আশ্বাস দিলে সন্দেহ দূর হয় না—বরং আরও গভীর হয়।

