পূর্বের তুলনায় বাংলাদেশে ক্যান্সার চিকিৎসার অবকাঠামো দ্রুত উন্নত হলেও বিশেষজ্ঞ জনবলের ঘাটতি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। আধুনিক যন্ত্রপাতি যুক্ত হলেও দক্ষ চিকিৎসক, মেডিকেল ফিজিসিস্ট, অনকোলজি নার্স ও প্রযুক্তিবিদের অভাবে অনেক ক্ষেত্রেই সেই সক্ষমতার পুরোটা কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্যান্সার চিকিৎসাকে আরও কার্যকর করতে প্রযুক্তির পাশাপাশি দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার ওপর সমান গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
যন্ত্র নয়, দক্ষ জনবলই ক্যান্সার চিকিৎসার মূল শক্তি:
বাংলাদেশে ক্যান্সার চিকিৎসার প্রসঙ্গ উঠলেই সাধারণত আলোচনায় আসে অত্যাধুনিক রেডিওথেরাপি মেশিন, PET-CT, MRI, রোবোটিক সার্জারি কিংবা নতুন প্রজন্মের ক্যান্সারবিরোধী ওষুধ। এসব প্রযুক্তি চিকিৎসার মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও কেবল আধুনিক যন্ত্র থাকলেই একটি কার্যকর ক্যান্সারসেবা ব্যবস্থা গড়ে ওঠে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি লিনিয়ার অ্যাক্সিলারেটর বা উন্নত প্রযুক্তির যন্ত্র কেনা সম্ভব হলেও তা দক্ষভাবে পরিচালনার জন্য প্রয়োজন দীর্ঘদিনের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট, মেডিকেল ফিজিসিস্ট, রেডিওথেরাপি টেকনোলজিস্ট, অনকোলজি নার্সসহ বিভিন্ন পেশার বিশেষজ্ঞ। এই জনবল তৈরি করতে বছরের পর বছর শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও বাস্তব অভিজ্ঞতা প্রয়োজন।
এ কারণেই আন্তর্জাতিক পরিসরে এখন ক্যান্সার চিকিৎসার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে ‘অনকোলজি ওয়ার্কফোর্স’ বা ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল।
একজন চিকিৎসক নন, সমন্বিত দলই পরিচালনা করে ক্যান্সারের চিকিৎসা:
অনেকের ধারণা, একজন ক্যান্সার বিশেষজ্ঞই পুরো চিকিৎসা পরিচালনা করেন। বাস্তবে ক্যান্সার চিকিৎসা একটি বহুমাত্রিক ও সমন্বিত প্রক্রিয়া। একজন রোগীর চিকিৎসায় সাধারণত সার্জন, মেডিকেল অনকোলজিস্ট, রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট, প্যাথলজিস্ট, রেডিওলজিস্ট, মেডিকেল ফিজিসিস্ট, অনকোলজি নার্স, রেডিওথেরাপি টেকনোলজিস্ট, পুষ্টিবিদ, মনোবিজ্ঞানী এবং প্যালিয়েটিভ কেয়ার বিশেষজ্ঞসহ বিভিন্ন পেশাজীবী একসঙ্গে কাজ করেন। এই সমন্বিত ব্যবস্থার কোনো একটি অংশ দুর্বল হলে পুরো চিকিৎসা প্রক্রিয়াই ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
গত কয়েক বছরে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে দেশে বেশ কয়েকটি আধুনিক ক্যান্সার সেন্টার গড়ে উঠেছে। উন্নত রেডিওথেরাপি, আধুনিক কেমোথেরাপি, টার্গেটেড থেরাপি এবং ইমিউনোথেরাপির সুযোগও আগের তুলনায় বিস্তৃত হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অবকাঠামোগত অগ্রগতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দক্ষ জনবল তৈরি হয়নি।
দেশের অনেক হাসপাতালে একজন অনকোলজিস্টকে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগী দেখতে হয়। কোথাও পর্যাপ্ত মেডিকেল ফিজিসিস্ট নেই, কোথাও প্রশিক্ষিত অনকোলজি নার্সের সংকট রয়েছে, আবার অনেক প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় সংখ্যক রেডিওথেরাপি টেকনোলজিস্টও পাওয়া যায় না। ফলে উন্নত যন্ত্রপাতি থাকলেও সেগুলোর সর্বোচ্চ সক্ষমতা কাজে লাগানো কঠিন হয়ে পড়ে।
রোগীর ওপর কী প্রভাব পড়ে?
দক্ষ জনবলের অভাবের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে রোগীদের ওপর। বিশেষজ্ঞের স্বল্পতায় রোগ নির্ণয়ে বিলম্ব হতে পারে, চিকিৎসা শুরু করতে অপেক্ষা বাড়ে এবং চিকিৎসকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়। ক্যান্সারের ক্ষেত্রে সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় কয়েক সপ্তাহের দেরিও অনেক সময় চিকিৎসার ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই জনবল সংকটকে কেবল প্রশাসনিক বা ব্যবস্থাপনাগত সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি রোগীর চিকিৎসার মান ও সময়োপযোগিতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
আন্তর্জাতিকভাবে কোন পথে এগোচ্ছে বিশ্ব?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), আন্তর্জাতিক ক্যান্সার গবেষণা সংস্থা (IARC) এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অনকোলজি সংগঠন ক্যান্সার মোকাবিলায় দক্ষ জনবল গড়ে তোলাকে অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করছে।
অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলো ভবিষ্যৎ চাহিদা বিবেচনায় নিয়মিতভাবে মূল্যায়ন করে আগামী ১০ থেকে ২০ বছরে কতজন অনকোলজিস্ট, অনকোলজি নার্স, মেডিকেল ফিজিসিস্ট ও প্রযুক্তিবিদ প্রয়োজন হবে। এরপর সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রশিক্ষণ, নিয়োগ এবং স্বাস্থ্য অবকাঠামো সম্প্রসারণ করা হয় অর্থাৎ তারা শুধু নতুন হাসপাতাল নির্মাণে নয়, হাসপাতাল পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল তৈরিতেও সমান গুরুত্ব দেয়।
বাংলাদেশের জন্য কী প্রয়োজন?
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশেরও দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় অনকোলজি জনবল পরিকল্পনা প্রণয়ন করা প্রয়োজন। এই পরিকল্পনায় আগামী দুই দশকে কতজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, অনকোলজি নার্স, মেডিকেল ফিজিসিস্ট ও রেডিওথেরাপি টেকনোলজিস্ট প্রয়োজন হবে, তার বাস্তবসম্মত হিসাব থাকতে হবে।
এর পাশাপাশি প্রশিক্ষণের সুযোগ বৃদ্ধি, বিভাগীয় পর্যায়ে ক্যান্সারসেবা সম্প্রসারণ, গবেষণায় বিনিয়োগ এবং দক্ষ জনবল ধরে রাখতে উন্নত কর্মপরিবেশ ও পেশাগত বিকাশের সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি সমাধান?
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ইতোমধ্যে ক্যান্সার চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। রোগ শনাক্তকরণ, রেডিওথেরাপির পরিকল্পনা, মেডিকেল ইমেজ বিশ্লেষণ এবং রোগী ব্যবস্থাপনায় এ প্রযুক্তি চিকিৎসকদের সহায়তা করতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, AI কোনোভাবেই চিকিৎসকের বিকল্প নয়। বরং দক্ষ চিকিৎসক ও প্রযুক্তিবিদের হাতে AI একটি কার্যকর সহায়ক প্রযুক্তি হিসেবে সবচেয়ে ভালো ফল দিতে পারে।
দক্ষ জনবলে বিনিয়োগ কেন গুরুত্বপূর্ণ?
স্বাস্থ্যখাতে ব্যয়কে অনেক সময় কেবল খরচ হিসেবে দেখা হলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্যান্সার চিকিৎসায় দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার বিনিয়োগ দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতির জন্যও লাভজনক। কারণ দক্ষ জনবল দ্রুত রোগ শনাক্ত, সময়মতো চিকিৎসা, জটিলতা ও চিকিৎসা ব্যয় কমাতে সহায়তা করে। একই সঙ্গে কর্মক্ষম মানুষের উৎপাদনশীলতা ধরে রাখা এবং বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়ার প্রবণতা কমাতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে দেশে ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা এবং চিকিৎসার জটিলতা আরও বাড়বে। একই সঙ্গে চিকিৎসায় নতুন প্রযুক্তির ব্যবহারও বৃদ্ধি পাবে। এই বাস্তবতায় কেবল আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন যথেষ্ট নয়। প্রযুক্তির পাশাপাশি দক্ষ চিকিৎসক, নার্স, মেডিকেল ফিজিসিস্ট ও অন্যান্য বিশেষজ্ঞ তৈরি করতে না পারলে ক্যান্সারসেবার মান কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে উন্নীত করা কঠিন হবে।
তাদের মতে, এখন প্রয়োজন এমন একটি জাতীয় পরিকল্পনা, যেখানে অবকাঠামো ও প্রযুক্তির পাশাপাশি দক্ষ জনবল উন্নয়নকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হবে। কারণ একটি আধুনিক হাসপাতাল ভবন দিয়ে তৈরি হলেও একটি কার্যকর ও মানসম্মত ক্যান্সারসেবা ব্যবস্থা গড়ে ওঠে দক্ষ মানুষের হাতেই।

