দেশে চলতি বছরের মধ্যে ডেঙ্গুতে একদিনে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু ও রোগী শনাক্তের রেকর্ড হয়েছে গতকাল মঙ্গলবার। গত চব্বিশ ঘণ্টায় এই রোগে নয়জনের মৃত্যু হয়েছে, যার ফলে চলতি বছরে মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৩০ জনে। একই সময়ে দেশজুড়ে নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এক হাজার পাঁচশ একাত্তর জন রোগী। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
এর আগে গত ৬ সেপ্টেম্বর একদিনে সর্বোচ্চ এক হাজার পাঁচশ আটান্ন জন রোগী ভর্তি হওয়ার রেকর্ড হয়েছিল, যা মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে নতুন রেকর্ডে পরিণত হলো। এই নতুন রোগীদের নিয়ে বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত মোট ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা পৌঁছেছে পঁয়তাল্লিশ হাজার চারশ পঁচাত্তর জনে।
মৃত্যু হওয়া নয়জনের মধ্যে বরিশাল বিভাগে একজন, ঢাকা বিভাগে একজন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় তিনজন, খুলনা বিভাগে দুজন এবং ময়মনসিংহ বিভাগে একজন রয়েছেন। এই তথ্য থেকে স্পষ্ট, রোগের বিস্তার এখন কেবল রাজধানীকেন্দ্রিক নেই, বরং দেশের বিভিন্ন প্রান্তে একযোগে ছড়িয়ে পড়েছে।
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের একজন অধ্যাপক ও চিকিৎসা কীটতত্ত্ববিদ জানিয়েছেন, মাঝেমধ্যে বৃষ্টিপাত এবং এডিস মশার বংশবিস্তারের উপযোগী তাপমাত্রার কারণে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসজুড়ে পরিস্থিতি আরও গুরুতর হতে পারে। তিনি বলেন, ডেঙ্গু এখন আর কেবল রাজধানীর সমস্যা নয়—এডিস মশা জেলা, উপজেলা, এমনকি গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছে, যার ফলে ঢাকার বাইরেও আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জ্বর দেখা দেওয়ার পরপরই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন। তাঁর পরামর্শ, জ্বর শুরুর প্রথম চব্বিশ থেকে আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যে চিকিৎসা শুরু করলে মৃত্যুঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। প্রয়োজনে এনএস১ পরীক্ষার মাধ্যমে দ্রুত রোগ নিশ্চিত করে চিকিৎসা শুরুর পরামর্শও দেন তিনি।
তিনি সতর্ক করে বলেন, জ্বর বা অন্যান্য উপসর্গ দেখা দেওয়ার পর এক সপ্তাহ বা তার বেশি সময় চিকিৎসা ছাড়া থাকলে রোগীর অবস্থা গুরুতর জটিলতার দিকে গড়াতে পারে, এমনকি রোগী শক অবস্থায়ও চলে যেতে পারেন। তাঁর মতে, শুধু সরকারি উদ্যোগের ওপর নির্ভর করলে চলবে না—ব্যক্তিগত ও সামাজিক পর্যায়েও সমান সক্রিয়তা প্রয়োজন। যেহেতু এডিস মশা সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করা বাস্তবে সম্ভব নয়, তাই বাসাবাড়ি ও কর্মস্থলের আশপাশে জমে থাকা পানি নিয়মিত সরিয়ে ফেলা, পাত্র উপুড় করে রাখা এবং সম্ভাব্য প্রজননস্থল পরিষ্কার রাখার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের কার্যক্রমকে একটি ব্যাপক সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেওয়ার আহ্বানও জানান তিনি, উল্লেখ করে যে সমন্বিত প্রচেষ্টা ছাড়া সংক্রমণের গতি কমানো কঠিন হবে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার আগামী শনিবার থেকে তিন মাসব্যাপী একটি বিশেষ পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি শুরু করতে যাচ্ছে। সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত সংশ্লিষ্ট বৈঠকে সরকারপ্রধান আসন্ন তিন মাসকে ডেঙ্গুর উচ্চঝুঁকির সময় হিসেবে চিহ্নিত করে দেশবাসীকে এই কর্মসূচিতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানান। পাশাপাশি কর্মসূচিটি যথাযথভাবে বাস্তবায়নের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে।
বিশ্লেষকদের মতে, রোগী ও মৃত্যুর সংখ্যা যেভাবে ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে, তাতে বর্ষা-পরবর্তী সময়েও এডিস মশার বিস্তার ঠেকাতে দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ ছাড়া পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসাগ্রহণ ও নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখাই বর্তমানে মৃত্যুহার কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

