দেশে হামে শিশুমৃত্যুর সংখ্যা আজ বুধবার হাজারের ঘর অতিক্রম করেছে—যা দেশের ইতিহাসে এই রোগে সর্বোচ্চ প্রাণহানির রেকর্ড। বিস্ময়কর বিষয় হলো, গত প্রায় আট বছরে দেশে হাম সংক্রমণের সংখ্যা কখনোই চারশ ছাড়ায়নি, এবং ২০২৫ সালের মধ্যে হাম দূরীকরণ ও চলতি বছরে নির্মূল সনদ পাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারিত ছিল। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র—একসময় বিস্মৃত হয়ে যাওয়া এই রোগই এখন হাজারের বেশি শিশুর প্রাণ কেড়ে নিয়েছে।
জনস্বাস্থ্যবিদদের মতে, ২০২৫ সালে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় হামের টিকাদান কার্যক্রমে চরম অবহেলাই এই সংকটের প্রধান কারণ। চলতি বছরের শুরু থেকেই হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলেও তাতে যথাযথ নজর দেওয়া হয়নি। মার্চ মাস থেকে সংক্রমণ ব্যাপকভাবে বাড়তে শুরু করলেও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এপ্রিল-মে মাসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে একটি গণটিকাদান কর্মসূচি চালানো হলেও সেই সময়ও প্রায় চল্লিশ লাখ শিশু এর আওতার বাইরে থেকে যায়।
রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের একজন সাবেক পরিচালক গত সোমবার, যখন মৃত্যুর সংখ্যা হাজারের কাছাকাছি পৌঁছেছিল, তখন মন্তব্য করেছিলেন যে দেশে এর আগে হামে এত মৃত্যু বা এত ব্যাপক সংক্রমণের ঘটনা কখনো ঘটেনি। তাঁর ভাষায়, এই পরিস্থিতি দেশের জন্য একটি দুর্ভাগ্যজনক অধ্যায়, যার শিকার হয়েছে শিশুরা।
সর্বশেষ চব্বিশ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে আরও তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যার ফলে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এক হাজার দুইজনে। এর মধ্যে উপসর্গে মৃত্যু হয়েছে নয়শ দুইজনের এবং নিশ্চিত হামে মৃত্যু হয়েছে একশ জনের। একই সময়ে নতুন করে উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে এক হাজার একশ উনিশ শিশু এবং নিশ্চিত হাম রোগী পাওয়া গেছে ঊনসত্তর জন। এখন পর্যন্ত মোট উপসর্গ ও নিশ্চিত মিলিয়ে হাম রোগীর সংখ্যা পৌঁছেছে এক লাখ সাতাশি হাজার চারশ চুরাশিতে।
তুলনামূলক চিত্রে দেখা যায়, আগের বছরগুলোতে পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন—২০২৫ সালে রোগী শনাক্ত হয়েছিল মাত্র একশ বত্রিশ জন, ২০২৪ সালে দুইশ সাতচল্লিশ, ২০২৩ সালে দুইশ বিরাশি এবং ২০২২ সালে তিনশ এগারো জন। একজন জনস্বাস্থ্যবিদ এই পরিস্থিতিকে নজিরবিহীন বলে বর্ণনা করে জানান, এই বছর বিশ্বের যেকোনো দেশের তুলনায় সবচেয়ে বেশি হাম সংক্রমণ ঘটেছে বাংলাদেশে, যা আগে কখনো রেকর্ড হয়নি।
সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে টিকাদান কর্মসূচিতে বাংলাদেশের সাফল্য একসময় আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হতো। নিয়মিত টিকাদান ও জাতীয় ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে হামের মতো রোগের বড় প্রাদুর্ভাব এড়ানো সম্ভব হয়েছিল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, অতীতের একাধিক জাতীয় টিকাদান কর্মসূচিতে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা শতভাগ বা তার বেশি অর্জিত হয়েছিল।
তবে ২০২০-২১ সালের পর দেশে আর কোনো বিশেষ ক্যাম্পেইন পরিচালিত হয়নি, এবং এই সময়ে নিয়মিত টিকাদানের হারও ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে। ২০২৫ সালে এই হার নেমে আসে ঊনষাট শতাংশে, এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে টিকার সরবরাহেও ঘাটতি দেখা যায়।
জাতিসংঘ শিশু সংস্থার বাংলাদেশ কার্যালয়ের একজন ভারপ্রাপ্ত প্রতিনিধি এ বছরের মে মাসে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, ২০২৫ সালে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার টিকা সংগ্রহের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত নিলে সংস্থাটি এ নিয়ে একাধিকবার উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল—তাদের আশঙ্কা ছিল, এই পরিবর্তনের ফলে টিকা সরবরাহে দীর্ঘ বিলম্ব ও রোগের প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি তৈরি হবে।
সংক্রমণ শুরুর পর চলতি বছরের এপ্রিলে বর্তমান সরকার ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের জন্য একটি বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন চালু করে। তবে এই কর্মসূচিতেও ছেচল্লিশ লাখ শিশু বাদ পড়ে গেছে বলে জানা গেছে। এর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এই বয়সসীমার শিশুদের জন্য নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল প্রায় এক কোটি আশি লাখের কিছু বেশি, কিন্তু একই বয়সসীমার প্রায় দুই কোটি ছাব্বিশ লাখ শিশুকে গত জুনে ভিটামিন এ ক্যাম্পেইনের আওতায় আনা হয়েছিল—এই ব্যবধানই বাদ পড়া শিশুর সংখ্যার একটি বড় কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।
একজন জনস্বাস্থ্যবিদ মন্তব্য করেন, টিকাদান কর্মসূচি সত্ত্বেও এত বিপুল সংখ্যক সংক্রমণ সত্যিই নজিরবিহীন একটি ঘটনা, যাতে বিপুল সংখ্যক শিশু গুরুতর ঝুঁকির মুখে পড়েছে। তাঁর মতে, এখন অবিলম্বে ছয় মাস থেকে পনেরো বছর বয়সী সব শিশুর জন্য বিস্তৃত টিকাদানের ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
বিশ্লেষকদের ভাষ্য, এই সংকট শুধু একটি রোগের প্রাদুর্ভাব নয়, বরং দেশের জনস্বাস্থ্য অবকাঠামো ও টিকাদান ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি অবহেলার একটি বড় প্রতিফলন। ভবিষ্যতে এ ধরনের সংকট এড়াতে টিকা সংগ্রহ প্রক্রিয়ায় স্থিতিশীলতা এবং নিয়মিত ক্যাম্পেইন পরিচালনার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

