রাজধানীর একটি সরকারি হাসপাতালে অতর্কিত পরিদর্শনে গিয়ে সেবার মান নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রী। ডেঙ্গু রোগীদের রক্ত পরীক্ষাসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পরীক্ষা হাসপাতালের ভেতরে না করিয়ে বাইরের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পাঠানোর অভিযোগ পেয়ে ক্ষোভ ঝাড়েন তিনি, আর এই অনিয়ম বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত নিজে ছাড় দেবেন না বলেও স্পষ্ট বার্তা দেন।
মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেবাগ্রহীতাদের ক্ষোভের খবর নজরে আসার পর সরেজমিনে পরিদর্শনে যান মন্ত্রী। সেখানে ডেঙ্গু ওয়ার্ডসহ বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে দেখেন এবং ভর্তি থাকা রোগীদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলে সেবার প্রকৃত চিত্র বোঝার চেষ্টা করেন। এ সময় বেশ কয়েকজন রোগীর চিকিৎসাসংক্রান্ত কাগজপত্র পর্যালোচনা করে তিনি দেখতে পান, প্রয়োজনীয় পরীক্ষাগুলোর একটি বড় অংশ হাসপাতালের নিজস্ব ব্যবস্থায় না হয়ে বাইরের কেন্দ্রে করানো হয়েছে। এই কাগজপত্রের প্রতিলিপিও সংগ্রহ করেন তিনি, পাশাপাশি সাম্প্রতিক একটি ভিডিওর সূত্র ধরে এই প্রক্রিয়ায় জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয়ও তাঁর কাছে রয়েছে বলে জানান।
মন্ত্রীর ভাষ্যে, এই অনিয়ম রাতারাতি পুরোপুরি দূর করা সম্ভব নয় বলে তিনি স্বীকার করেন, তবে যখনই কোনো অনিয়মের তথ্য তাঁর নজরে আসবে, তখনই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে অঙ্গীকার করেন। আগামী একদিনের মধ্যে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও তিনি ইঙ্গিত দেন।
বক্তব্যে মন্ত্রী নির্দিষ্ট কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করে অভিযোগ করেন, তারা ফেরিওয়ালার মতো করে হাসপাতাল থেকে রোগীদের রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে নিয়ে যায় এবং এর বিনিময়ে রোগীদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করা হয়। তাঁর মতে, সরকার এমনিতেই আগের প্রশাসনের রেখে যাওয়া প্রায় শূন্য আর্থিক কাঠামো নিয়ে দায়িত্ব নিয়েছে, তারপরও জনগণের করের টাকায় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে রোগীদের নিজের পকেট থেকে বাড়তি খরচ করতে হচ্ছে, যা এই খাতে বিদ্যমান অব্যবস্থাপনার একটি স্পষ্ট প্রতিফলন বলে মনে করেন তিনি।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে এই অনিয়মে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দায় আছে কি না জানতে চাইলে মন্ত্রী স্পষ্টভাবে জানান, দিনের বেলায় প্রকাশ্যে বাইরের লোক এসে রোগীদের রক্ত সংগ্রহ করে নিয়ে গেলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তার দায় এড়াতে পারে না। এই অনিয়ম হাসপাতাল প্রশাসনের নজরদারির ঘাটতিরই প্রমাণ বলে তিনি মন্তব্য করেন।
মশারি ব্যবহারে অবহেলা নিয়েও উষ্মা: পরিদর্শনকালে আরেকটি বিষয় মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে—ডেঙ্গু ওয়ার্ডে রোগীদের মশারি ব্যবহারের ক্ষেত্রে অবহেলা। তিনি জানান, দেশের অন্যান্য অনেক স্থানে ডেঙ্গু রোগীদের মশারির নিচে রাখা হলেও এই হাসপাতালে তেমন ব্যবস্থা তাঁর চোখে পড়েনি, অথচ সংক্রমণ ছড়ানো ঠেকাতে এটি বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। রোগীরা অনেক সময় নিজেরাই মশারি ব্যবহারে অনাগ্রহ দেখান বলে জানিয়ে তিনি নির্দেশ দেন, প্রয়োজনে বাধ্য করেই হলেও আজ থেকে মশারি ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে, কারণ অন্যথায় সুস্থ রোগীরাও সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বেন।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন মন্ত্রী। তাঁর ভাষায়, প্রায় তিন মাস আগে থেকেই সরকারপ্রধানের নির্দেশনায় চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া শুরু হয়েছে। দেশের প্রতিটি সিটি করপোরেশন ও পৌরসভায় জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে সিভিল সার্জন ও চিকিৎসকদের সমন্বয়ে পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালিত হচ্ছে।
এই প্রসঙ্গে তিনি দক্ষিণাঞ্চলের একটি জেলার উদাহরণ দেন, যেখানে পুরোনো সুপারি গাছ কাটার পর মাটির কাছাকাছি অবশিষ্ট অংশে পানি জমে মশার লার্ভা জন্মানোর মতো পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছিল। স্থানীয় একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তার প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তীতে ওই এলাকার সব অবশিষ্ট গাছের গোড়া অপসারণ করা হয় বলে তিনি জানান।
তবে দেশের সামগ্রিক অবকাঠামোগত সমস্যার কথাও স্বীকার করেন মন্ত্রী। রাস্তাঘাটে থাকা খানাখন্দে জমে থাকা পানি মশার লার্ভা জন্মানোর অন্যতম প্রধান কারণ বলে উল্লেখ করে তিনি জানান, এসব লার্ভা ধ্বংসে নিয়মিত ওষুধ প্রয়োগের পাশাপাশি সিটি করপোরেশনগুলো টানা তিন মাস ধরে মশক নিধনে স্প্রে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। তাঁর মতে, এসব উদ্যোগের কারণেই এ বছর মশার প্রকোপ কিছুটা দেরিতে শুরু হয়েছে।
সামগ্রিকভাবে দেখা যায়, সরকারি হাসপাতালে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অনুপ্রবেশ ও রোগীদের কাছ থেকে বাড়তি অর্থ আদায়ের অভিযোগ দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের একটি সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে। মন্ত্রীর এই আকস্মিক পরিদর্শন ও কঠোর প্রতিক্রিয়া স্বল্পমেয়াদে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে সতর্কতা তৈরি করতে পারলেও, দীর্ঘমেয়াদে এই ধরনের অনিয়ম বন্ধে প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারি ব্যবস্থা জোরদার করা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই মূল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের পর্যবেক্ষণ। একইসঙ্গে ডেঙ্গু মোকাবিলায় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা যতটা জোরদার করা হচ্ছে, হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ সেবার মান তার সমান্তরালে না বাড়লে সামগ্রিক সাফল্য অসম্পূর্ণ থেকে যাবে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

