দেশে ডেঙ্গু রোগীর প্রকৃত সংখ্যা প্রকাশ্যে যা দেখানো হচ্ছে, তার চেয়ে বাস্তবে অনেক বেশি বলে উঠে এসেছে সরাসরি হাসপাতাল ঘুরে করা এক অনুসন্ধানে। রাজধানীর চারটি বড় হাসপাতালের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পাঠানো সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে প্রকৃত রোগীর তুলনায় প্রায় তিনের দুই ভাগ কম দেখানো হয়েছে।
গণমাধ্যমের দুজন প্রতিনিধি সরাসরি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা যাচাই করেন। প্রতিটি হাসপাতালেই দেখা যায়, প্রকৃত ভর্তি রোগীর সংখ্যা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখিত সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এই কেন্দ্র নিয়মিতভাবে রাজধানীর ৭৭টি সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল এবং দেশের ৬৪ জেলার সরকারি ও কিছু বেসরকারি হাসপাতালের ডেঙ্গু-সংক্রান্ত পরিসংখ্যান প্রকাশ করে। এই তথ্যই গণমাধ্যমে সংবাদ হিসেবে প্রকাশিত হয় এবং একই তথ্য ব্যবহার করে দাতা সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও সরকারের নীতিনির্ধারকেরা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত এক কর্মকর্তা জানান, হাসপাতাল থেকে যে তথ্য পাঠানো হয়, তারা কেবল সেটিই প্রকাশ করেন, ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল তথ্য প্রকাশের কোনো সুযোগ নেই।
তবে বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, শিশু, পুরুষ ও নারী ওয়ার্ড মিলিয়ে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা দুইশর বেশি, যা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নিজস্ব হিসাবের সঙ্গেও মিলে যায়। কিন্তু সরকারি কেন্দ্রের বিজ্ঞপ্তিতে এই হাসপাতালে রোগী দেখানো হয়েছে মাত্র ৪৯ জন—যা হাসপাতালের নিজস্ব হিসাবের চেয়ে প্রায় ১৭৪ জন কম। বছরের শুরু থেকে হিসাব করলে এই ব্যবধান আরও বড়, প্রায় আড়াই হাজার রোগীর গরমিল দেখা যায়।
একই ধরনের চিত্র ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও। হাসপাতালের নতুন ভবনের তিনটি ওয়ার্ডে সরাসরি গণনা করে পাওয়া রোগীর সংখ্যা ওয়ার্ড কর্তৃপক্ষের দেওয়া সংখ্যার সঙ্গে মিললেও, হাসপাতাল পরিচালকের দপ্তরের সার্বিক হিসাবে মোট ভর্তি রোগী দেখানো হয়েছে দুইশর বেশি। অথচ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কেন্দ্র জানিয়েছে, এই হাসপাতালে রোগী ভর্তি ছিল মাত্র ১০৫ জন—প্রায় ৯৫ জনের ফারাক। বছরের শুরু থেকে হিসাব করলে এই পার্থক্য আরও বাড়ে।
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটেও একই ধরনের গরমিল লক্ষ্য করা গেছে। শিশু হাসপাতালের ক্ষেত্রে পার্থক্য সবচেয়ে বেশি—হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যেখানে দেড়শর বেশি রোগী ভর্তি থাকার কথা বলছে, সরকারি কেন্দ্র সেখানে দেখাচ্ছে মাত্র ৮ জন।
সব মিলিয়ে চারটি হাসপাতালে প্রকৃত ভর্তি রোগীর সংখ্যা আটশর বেশি হলেও, সরকারি কেন্দ্রের হিসাবে তা দেখানো হয়েছে মাত্র তিনশর কিছু বেশি—অর্থাৎ প্রকৃত সংখ্যার তুলনায় প্রায় ৬১ শতাংশ কম।
এ বিষয়ে দেশের একজন প্রবীণ জনস্বাস্থ্যবিদ, যিনি সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বলেন, রোগীর তথ্যে এ ধরনের গরমিল ও কমিয়ে দেখানোর প্রবণতা অত্যন্ত দুঃখজনক ও বিপজ্জনক। তাঁর মতে, প্রকৃত চিত্র না জানা গেলে সমস্যার সঠিক মোকাবিলা সম্ভব নয়, বরং এতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। তিনি অবিলম্বে এই প্রবণতা বন্ধ করার আহ্বান জানান।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সীমাবদ্ধতাও এই সমস্যার একটি বড় কারণ। রাজধানীর সব বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিক এবং রাজধানীর বাইরের সব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তথ্য সংগ্রহের কোনো ব্যবস্থা এখনো তাদের নেই। এ ছাড়া বহু রোগী ব্যক্তিগত চিকিৎসকের চেম্বার থেকেও চিকিৎসা নেন, যাদের হিসাব কোথাও থাকে না। ফলে দেশের সামগ্রিক ডেঙ্গু পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র নির্ভরযোগ্যভাবে তুলে ধরা কঠিন হয়ে পড়ছে, আর যেসব হাসপাতাল থেকে তথ্য নেওয়া সম্ভব, সেখান থেকেও হালনাগাদ তথ্য যথাযথভাবে সংগ্রহ ও প্রকাশ না হওয়ায় নীতিনির্ধারকেরাও প্রকৃত পরিস্থিতি বুঝতে ব্যর্থ হচ্ছেন।
সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৬৫৫ জন ডেঙ্গু রোগী, আর মৃত্যু হয়েছে ছয়জনের। চলতি বছরে মোট আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৬৩ হাজারের বেশি মানুষ, আর ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যু হয়েছে ১৯০ জনের।

