দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ যেন থামছেই না। গত কয়েক বছরের তুলনামূলক পরিসংখ্যান বলছে, রোগটিতে মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেড়ে চলেছে, যা জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য এক গুরুতর চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সরকারি পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০০০ থেকে ২০১৮ সাল—এই দীর্ঘ আঠারো বছরে ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যু হয়েছিল ২৯৬ জনের, এবং আক্রান্তের সংখ্যা ছিল প্রায় ৫০ হাজার। কিন্তু এর পরের মাত্র সাত বছর নয় মাসেই এই চিত্র সম্পূর্ণ বদলে যায়—এ সময়ে মৃত্যু হয় সাড়ে তিন হাজারের বেশি মানুষের, আর আক্রান্তের সংখ্যা পৌঁছায় প্রায় সাত লাখ ছিয়াশি হাজারে। সহজ হিসাবে বলতে গেলে, আগের সময়ের তুলনায় মৃত্যুর হার বেড়েছে প্রায় বারো গুণ এবং আক্রান্তের হার বেড়েছে প্রায় ষোলো গুণ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্যে দেখা যায়, গত চব্বিশ ঘণ্টায় দেশে ডেঙ্গুতে অন্তত ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে, নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন প্রায় দুই হাজার রোগী। এতে চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মোট মৃতের সংখ্যা দুইশ ছাড়িয়ে গেছে, এবং আক্রান্তের সংখ্যা পৌঁছেছে সাতষট্টি হাজারের কাছাকাছি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতির পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। প্রথমত, এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা এখনও বড় সমস্যা। বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যায়, এই মশা এখন প্রায় সব ধরনের পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছে—এমনকি সামান্য পরিমাণ জমে থাকা পানি বা ফেলে দেওয়া ছোট পাত্রেও এর বংশবিস্তার ঘটতে পারে। শুধু শহর নয়, এই বিস্তার এখন গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ছে বলে জানিয়েছেন একজন বিশেষজ্ঞ।
দ্বিতীয়ত, প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন একজন কীটতত্ত্ববিদ। তার ব্যাখ্যায়, দেশে অসংখ্য হাসপাতাল ও ক্লিনিক থাকলেও এর মধ্যে সামান্য একটি অংশই নিয়মিতভাবে ডেঙ্গু রোগীর তথ্য জানায়, ফলে বাস্তব চিত্র অনেকটাই আড়ালে থেকে যায়। তিনি আরও বলেন, মৃত্যুহার হিসাবের ক্ষেত্রে এই কম-রিপোর্টিং একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কারণ হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের একটি বড় অংশ থাকেন গুরুতর অবস্থায়, এবং অনেক মৃত্যু ভর্তির প্রথম এক-দুই দিনের মধ্যেই ঘটে যায়।
তৃতীয় কারণ হিসেবে সামনে আসছে পুনঃসংক্রমণের বিষয়টি। দুই দশকের বেশি সময় ধরে ডেঙ্গু দেশে ছড়িয়ে থাকায় ক্রমেই বেশি মানুষ একাধিকবার এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন, এবং একজন ব্যক্তি দ্বিতীয় বা তৃতীয়বার আক্রান্ত হলে মৃত্যুর ঝুঁকি আরও বেড়ে যায় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ। তার পর্যবেক্ষণ, ২০১৯ সালের পর থেকে ডেঙ্গুর প্রকোপ আর আগের মতো নির্দিষ্ট বিরতিতে ওঠা-নামা করছে না, বরং প্রতি বছরই উচ্চ মৃত্যুহার লক্ষ করা যাচ্ছে।
একজন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের মতে, ডেঙ্গু মোকাবিলায় এককালীন বা মৌসুমি অভিযানের বদলে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি, কেন্দ্রীয়ভাবে সমন্বিত একটি মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি। তার পরামর্শ, যেসব এলাকায় আবর্জনা ও পানি জমে থাকার প্রবণতা বেশি এবং যেখানে মশার প্রজনন সবচেয়ে বেশি হয়, সেসব জায়গাকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করা উচিত। তার স্পষ্ট বক্তব্য, ডেঙ্গুকে এখন আর কেবল মৌসুমি রোগ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
চিকিৎসাব্যবস্থা সম্পর্কে তিনি তিন স্তরের একটি কাঠামো গড়ে তোলার সুপারিশ করেছেন। প্রথম স্তরে কমিউনিটি পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বিনামূল্যে বা স্বল্প খরচে ডেঙ্গু শনাক্তকরণ ও প্রাথমিক পরীক্ষার ব্যবস্থা রাখতে হবে। দ্বিতীয় স্তরে যাদের নিবিড় পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন, তাদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও জেলা হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা থাকা উচিত। আর তৃতীয় স্তরে গুরুতর রোগীদের জন্য মেডিকেল কলেজ ও বিশেষায়িত হাসপাতালে চিকিৎসার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। ঢাকার ক্ষেত্রে তিনি সিটি করপোরেশন, রেলওয়ে, ব্যাংক ও অন্যান্য স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হাসপাতালগুলোকে দ্বিতীয় স্তরের চিকিৎসাকেন্দ্র হিসেবে কাজে লাগানোর পরামর্শ দিয়েছেন, যাতে বিশেষায়িত হাসপাতালের ওপর চাপ কমে এবং গুরুতর রোগীরা যথাসময়ে সঠিক চিকিৎসা পান।
সামগ্রিকভাবে বিশেষজ্ঞদের মূল বার্তা স্পষ্ট—শুধু তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া নয়, বরং তথ্য সংগ্রহ পদ্ধতির উন্নয়ন, মশক নিয়ন্ত্রণে ধারাবাহিকতা এবং স্তরভিত্তিক চিকিৎসাব্যবস্থা একসঙ্গে কাজ না করলে আগামী দিনে ডেঙ্গুর এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা রোধ করা কঠিন হয়ে পড়বে।

