ক্যান্সারের চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ হলো রেডিওথেরাপি। কিন্তু প্রয়োজনীয় মেশিনের সংকটের কারণে দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে এই চিকিৎসা পেতে হাজারো রোগীকে দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অনেক রোগীকে কয়েক মাস এমনকি এক বছরের বেশি সময় অপেক্ষার তালিকায় থাকতে হচ্ছে।
রাজধানীর জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সামনে প্রতিদিনই দেখা যায় অসংখ্য রোগীর ভিড়। সকাল থেকেই রোগীরা রেডিওথেরাপির সিরিয়ালের জন্য অপেক্ষা করেন। কিন্তু সীমিত সংখ্যক মেশিন দিয়ে বিপুল সংখ্যক রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে।
ফরিদপুরের আলফাডাঙা থেকে আসা ছয় বছরের শিশু আবু সুফিয়ানও এই দীর্ঘ অপেক্ষার একজন ভুক্তভোগী। হাড়ের ক্যান্সারে আক্রান্ত এই শিশুকে সাতবার কেমোথেরাপি এবং অস্ত্রোপচারের ধকল সামলাতে হয়েছে। রেডিওথেরাপির জন্য দুই মাস অপেক্ষার পর তার ৩০টি সেশনের মধ্যে মাত্র পাঁচটি সম্পন্ন হয়েছে।
সুফিয়ানের বাবা আবু তাহের বলেন, আরও আগে রেডিওথেরাপি শুরু করতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু হাসপাতালে রোগীর চাপ বেশি থাকায় দ্রুত সিরিয়াল পাওয়া যায়নি।
তিনি জানান, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার খরচ তুলনামূলক কম হওয়ায় সাধারণ মানুষের জন্য এটি বড় ভরসা। তবে মেশিনের সংখ্যা বাড়ানো গেলে অনেক রোগী উপকৃত হতেন।
জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় সাড়ে ৬ হাজার থেকে ৭ হাজার রোগী রেডিওথেরাপির অপেক্ষায় রয়েছেন। নতুন রোগী প্রতিদিন ২০০ থেকে ৩০০ জন আসছেন। অনেক রোগীর চিকিৎসা শুরু হতে এক থেকে দেড় বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
জরায়ুমুখের ক্যান্সারে আক্রান্ত সুনামগঞ্জের গুলজান বেগমও এমন অপেক্ষমাণ রোগীদের একজন। তিনি রেডিওথেরাপির জন্য প্রয়োজনীয় কাগজ জমা দিলেও সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসার তারিখ পাননি। তাকে ছয় সপ্তাহ পর আবার যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।
বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ১৩ থেকে ১৫ লাখ মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত। প্রতি বছর নতুন করে প্রায় ২ লাখ মানুষের শরীরে ক্যান্সার শনাক্ত হয় এবং বছরে প্রায় দেড় লাখ মানুষ এই রোগে মারা যান।
এই বিপুল সংখ্যক রোগীর তুলনায় দেশের রেডিওথেরাপি সুবিধা এখনো অত্যন্ত সীমিত।
জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক মোস্তফা আজিজ সুমন জানান, বর্তমানে হাসপাতালে কার্যকর রয়েছে মাত্র দুটি রেডিওথেরাপি মেশিন। অথচ রোগীর চাপ বিবেচনায় আরও অনেক বেশি মেশিন প্রয়োজন।
হাসপাতালে আগে তিনটি বাঙ্কারে মেশিন স্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে সেগুলোর সবগুলোই অকার্যকর অবস্থায় রয়েছে।
তিনি বলেন, সাত থেকে দশটি মেশিন চালু থাকলে রোগীদের দীর্ঘ অপেক্ষার সময় অনেক কমিয়ে আনা সম্ভব হতো।
বর্তমানে সকাল ৮টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত মেশিন চালিয়েও সীমিত সংখ্যক রোগীর চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। পুরোনো রোগীদের চিকিৎসা শেষ না হওয়া পর্যন্ত নতুন রোগীদের জন্য জায়গা তৈরি হচ্ছে না।
চিকিৎসকদের মতে, রেডিওথেরাপি দেরিতে শুরু হলে অনেক ক্ষেত্রে রোগের জটিলতা বাড়তে পারে। বিশেষ করে কিছু ধরনের ক্যান্সারের ক্ষেত্রে সময়মতো চিকিৎসা পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও একই ধরনের সংকট রয়েছে। সেখানে তিনটি বাঙ্কার থাকলেও কার্যকর মেশিন রয়েছে মাত্র একটি। এই একটি মেশিন দিয়ে সব ধরনের রেডিওথেরাপি দেওয়া সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়েও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। সেখানে প্রতিদিন ২০০ থেকে ৩০০ নতুন রোগী এলেও একটি মেশিন দিয়ে দৈনিক প্রায় ৭০ জন রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া যাচ্ছে। ফলে রোগীদের প্রায় ছয় মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
সরকার অবশ্য সংকট কমাতে নতুন মেশিন কেনার উদ্যোগ নিয়েছে। ২০২৫-২৬ ও ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে দুটি নতুন লিনিয়ার অ্যাক্সিলারেটর কেনার জন্য অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউটের জন্য একটি নতুন লিনাক মেশিন কেনা হয়েছে এবং সেটি স্থাপনের কাজ চলছে। আশা করা হচ্ছে, আগামী জানুয়ারির মধ্যে এটি চালু হতে পারে।
এ ছাড়া কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের জন্য আরও একটি রেডিওথেরাপি মেশিন কেনার প্রক্রিয়া চলছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, অতীতে সরকারি হাসপাতালের জন্য কেনা কিছু মেশিন যথাযথ ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে দীর্ঘদিন ব্যবহার করা যায়নি। ফলে চিকিৎসা সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি যন্ত্রপাতির সঠিক ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ।
ক্যান্সার চিকিৎসায় সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের খরচের পার্থক্যও অনেক বেশি। জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউটে একটি সম্পূর্ণ রেডিওথেরাপি কোর্সে খরচ প্রায় ১২ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা। অন্যদিকে বেসরকারি হাসপাতালে একই চিকিৎসার খরচ প্রায় ২ লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা বিবেচনায় সরকারি পর্যায়ে আরও বেশি রেডিওথেরাপি মেশিন স্থাপন, দক্ষ জনবল তৈরি এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ সময়মতো চিকিৎসা না পেলে রোগীর জীবন ঝুঁকি বাড়তে পারে এবং চিকিৎসার ফলাফলও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

