দেশে ডেঙ্গু প্রতিরোধে ইউনিয়নের ওয়ার্ড থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত ৪৮ হাজারের বেশি কমিটি গঠনের কথা থাকলেও মাঠপর্যায়ে তার বড় অংশেরই কার্যকর অস্তিত্ব নেই। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় আন্তরিক ও উদ্যোগী না হলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এর মধ্যেই সংক্রমণ ও মৃত্যু দুটিই বাড়ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল মঙ্গলবার সারা দেশে ডেঙ্গুতে আরও ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর আগের দিন মারা গিয়েছিলেন ৯ জন। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা দাঁড়াল ২৮১। সোমবার সকাল আটটা থেকে মঙ্গলবার সকাল আটটা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৯৯৬ জন। চলতি বছর মোট ৯০ হাজার ৩৫৬ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। গতকাল দেশের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন ৫ হাজার ৭৭৬ জন। বিশেষজ্ঞরা আরও মৃত্যুর আশঙ্কা করছেন।
ডেঙ্গু এখন দেশের সব জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে। এই রোগের বাহক এডিস মশা নিয়ন্ত্রণের মূল দায়িত্ব স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের। কিন্তু বছরের পর বছর এই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালিত হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০১৯ সালে স্থানীয় সরকার বিভাগ ‘ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত অন্যান্য রোগ প্রতিরোধ জাতীয় নির্দেশিকা’ প্রকাশ করে। এতে ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন ও জাতীয় পর্যায়ে কমিটি গঠনের নির্দেশ আছে। কোন স্তরে কত সদস্যের কমিটি হবে, কারা থাকবেন এবং কমিটির কাজ কী, তা-ও বিস্তারিত বলা হয়েছে। কিন্তু জাতীয় কমিটি ও সিটি করপোরেশনের কমিটি ছাড়া বাকি কমিটিগুলো কার্যত নিষ্ক্রিয়। জেলা, উপজেলা বা ইউনিয়ন পর্যায়ের কমিটি নিয়ে আলোচনাও তেমন শোনা যায় না।
কাগজে-কলমে কমিটির কাঠামো বিশাল। সবচেয়ে নিচের স্তরে ইউনিয়নের প্রতিটি ওয়ার্ডে ১১ সদস্যের একটি কমিটি থাকার কথা, যার সভাপতি হবেন ওয়ার্ড সদস্য। দেশে ইউনিয়ন ৪ হাজার ৫৯৯টি। প্রতি ইউনিয়নে নয়টি ওয়ার্ড ধরলে মোট ওয়ার্ড দাঁড়ায় ৪১ হাজার ৩৯১টি। এর কোনো ওয়ার্ডে ডেঙ্গু বা মশা প্রতিরোধে কমিটি আছে বলে জানা যায়নি। এর ওপরে ইউনিয়ন পর্যায়ের কমিটির সভাপতি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান।
ইউনিয়নের ওপরের স্তরে আছে ৩৩০টি পৌরসভা ও ৫০৩টি উপজেলার কমিটি। পৌরসভা কমিটির সভাপতি মেয়র এবং উপজেলা কমিটির সভাপতি উপজেলা চেয়ারম্যান। এরপর ৬৪টি জেলায় একটি করে জেলা কমিটি এবং ১৩টি সিটি করপোরেশনে একটি করে কমিটি থাকার কথা। সিটি করপোরেশনগুলোর ৬৬৮টি ওয়ার্ড এবং পৌরসভাগুলোর কমপক্ষে ৯৯০টি ওয়ার্ডেও আলাদা কমিটির নির্দেশনা আছে। সবার ওপরে রয়েছে ২৪ সদস্যের জাতীয় কমিটি। এতে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের মেয়র, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রতিনিধি, ১৪টি মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং আরও পাঁচজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি থাকার কথা। সব মিলিয়ে ইউনিয়নের ওয়ার্ড থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত কমিটির সংখ্যা দাঁড়ায় ৪৮ হাজার ৫৫৯।
এসব কমিটির দায়িত্বও নির্দেশিকায় স্পষ্ট করা আছে। স্থানীয় সরকার বিভাগের কাজ হলো ডেঙ্গু প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, দপ্তর, বেসরকারি সংস্থা, গণমাধ্যম ও এনজিওসহ সব অংশীজনের দায়িত্ব ঠিক করা এবং তাঁদের কাজের সমন্বয় করা। বছরব্যাপী কার্যক্রমে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া ও কাজ তদারক করাও তাদের দায়িত্ব। জাতীয় কমিটির কাজ গৃহীত কার্যক্রম পর্যালোচনা, মূল্যায়ন ও সমন্বয় করা এবং গবেষণা, নীতি ও কর্মকৌশল হালনাগাদ করা। বছরে এই কমিটির অন্তত চারটি সভা হওয়ার কথা। সিটি করপোরেশনের কমিটির জন্য ৩৩টি করণীয় ঠিক করা আছে। জেলা, পৌরসভা ও উপজেলা কমিটিকে মাসে একবার সভা করতে বলা হয়েছে। এমনকি ওয়ার্ড পর্যায়ের কমিটিকেও মাসিক পর্যালোচনা সভার নির্দেশ আছে। পৌরসভার করণীয়ের মধ্যে আছে মশার লার্ভার উৎস নষ্ট করতে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা।
এই কাঠামো মাঠে কতটা কার্যকর, তা নিয়ে সরকারি ভাষ্য ও বাস্তব চিত্রের মধ্যে ফারাক দেখা যাচ্ছে। স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব মো. রবিউল ইসলাম গত সোমবার জানান, জাতীয় কমিটি ও ১৩টি সিটি করপোরেশনের কমিটি মশা নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে। ৩৩০টি পৌরসভার কমিটিও কাজ করছে বলে তিনি দাবি করেন। অন্য কমিটিগুলো সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য, নিশ্চয়ই সেগুলো সক্রিয় আছে। কিন্তু ডেঙ্গু বিষয়ে সরকারকে পরামর্শ দিচ্ছেন, এমন একজন গবেষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পৌরসভায় কমিটি আছে বা থাকার কথা। তবে ইউনিয়ন বা ওয়ার্ড পর্যায়ে কমিটি গঠনের কথা তাঁর জানা নেই। এমনকি বড় নীতিনির্ধারণী সভাতেও এ প্রসঙ্গ শোনা যায়নি।
চলতি বছরের ১১ মার্চ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে দেশবাসীকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযানে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান। তখনো স্থানীয় সরকার বিভাগের বড় কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়েনি। পরে ১২ সেপ্টেম্বর তিনি দেশব্যাপী পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। প্রতি শনিবার এই কর্মসূচি পালিত হচ্ছে, চলবে ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত। এই উদ্যোগের ফলে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও উপজেলা পর্যায়ে কিছু তৎপরতা শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে।
মাঠপর্যায়ের চিত্র অবশ্য এলাকাভেদে ভিন্ন। কুমিল্লা জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে। কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের ২৭টি ওয়ার্ডেও কমিটি আছে। ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন জানিয়েছে, তারা টাস্কফোর্স কমিটি করেছে। আগে কাউন্সিলরদের নিয়ে ওয়ার্ড কমিটি থাকলেও এখন তা কার্যকর নেই।
অন্য এলাকায় পরিস্থিতি আরও দুর্বল। পাবনার বেড়া উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা ও বেড়া পৌরসভার প্রশাসক রুনাল্ট চাকমা বলেন, কমিটি গঠনের বিষয়ে তাঁরা কোনো নির্দেশনা পাননি। তাই উপজেলায় কমিটি হয়নি, তবে প্রতিরোধের কাজ চলছে। ওই উপজেলার হাটুরিয়া-নাকালিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবদুল হামিদ জানান, উপজেলা পরিষদের মাসিক সভায় ডেঙ্গু প্রতিরোধে উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে। এরপর তাঁরা ইউপি সদস্য, গ্রাম পুলিশ ও এলাকাবাসীকে নিয়ে পরিচ্ছন্নতা, সচেতনতা ও প্রচারের কাজ শুরু করেছেন।
নেত্রকোনা পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা নূরুল আমিন জানান, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী প্রতি শনিবার ফগার মেশিনে মশা নিধন চলছে। তবে পৌরসভার নয়টি ওয়ার্ডের কোনোটিতেই কমিটি নেই। যশোরের কেশবপুর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন বলেন, কোনো কমিটির সভা এখনো হয়নি, তবে হবে। এখন প্রতিদিন একটি এলাকা বেছে পরিষ্কার করা হচ্ছে। একই উপজেলার মজিদপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হুমায়ুর কবির বলেন, তাঁর ইউনিয়নে কমিটির সভা হয়েছে এবং পরিচ্ছন্নতার কাজও চলছে। অথচ কেশবপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. আলাউদ্দিন জানান, কমিটির কোনো সভা হয়নি, শুধু বিক্ষিপ্তভাবে রাস্তার পাশের আবর্জনা পরিষ্কার করা হচ্ছে।
রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার কুর্শা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আফজালুল হক বলেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নির্দেশে বার্ষিক উন্নয়ন সহায়তা তহবিল থেকে মশার ওষুধ ও ফগার মেশিন কেনা হয়েছে। গ্রাম পুলিশের একজন সদস্যকে মেশিন চালানোর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তবে মশা নিধনে কোনো কমিটি এখনো গঠিত হয়নি। সিলেট সিটি করপোরেশন জানিয়েছে, সেখানে ডেঙ্গু প্রতিরোধে কোনো ওয়ার্ড কমিটি নেই। চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলা, পৌরসভা ও কোনো ইউনিয়নেও এ ধরনের কমিটি নেই।
এসব তথ্যে একটি বিষয় স্পষ্ট। কমিটি গঠনের নির্দেশনা সরকারি নির্দেশিকায় থাকলেও তা সব জায়গায় পৌঁছায়নি, আর যেখানে কমিটি হয়েছে সেখানেও নিয়মিত সভা ও কার্যক্রম হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত নয়। বেড়া উপজেলার কর্মকর্তার বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, কিছু জায়গায় নির্দেশনাই পৌঁছায়নি। আবার একই উপজেলার দুই ইউনিয়ন চেয়ারম্যানের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দেখায়, একই এলাকাতেও চিত্র এক নয়। যেখানে কমিটি নেই, সেখানেও পরিচ্ছন্নতা ও ফগিং চলছে। তবে তা অনেক ক্ষেত্রে বিক্ষিপ্ত বা প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচিনির্ভর। নিয়মিত পর্যালোচনা, দায়িত্ব বণ্টন ও জবাবদিহির যে কাঠামো নির্দেশিকায় কল্পনা করা হয়েছিল, তার অভাব এতে স্পষ্ট।
ডেঙ্গুর চরিত্র বদলে যাওয়াও এই দুর্বলতাকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। একসময় সমস্যাটি মূলত ঢাকা শহরকেন্দ্রিক ছিল, কিছুটা ছিল চট্টগ্রাম ও খুলনার মতো বড় শহরে। ফলে সরকারি মশা নিধন উদ্যোগও ছিল শহরমুখী। ২০১৯ সালে ডেঙ্গু প্রথমবারের মতো সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। এখন এটি গ্রামেরও সমস্যা, কিন্তু গ্রামাঞ্চলে মশা নিধনের বড় কোনো কার্যক্রম নেই। ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের কমিটি ঠিক সেই ফাঁক পূরণের জন্যই পরিকল্পিত ছিল। সেগুলো সচল না থাকায় গ্রামীণ জনপদ সবচেয়ে অরক্ষিত থেকে যাচ্ছে।
জনস্বাস্থ্যবিদ আবু জামিল ফয়সাল বলেন, এত কমিটির কথা অনেকের জানাই নেই। কমিটিগুলো সচল করা ও যেখানে নেই সেখানে গঠন করা এখন জরুরি। মাঠ থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত সব কমিটি সক্রিয় করা গেলে সাধারণ মানুষ যুক্ত হবে এবং ডেঙ্গু প্রতিরোধে বড় আন্দোলন গড়ে উঠবে বলে তিনি মনে করেন।
সামনে চ্যালেঞ্জ হলো, নির্দেশিকার কাঠামোকে কাগজ থেকে মাঠে নামানো। প্রধানমন্ত্রীর পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি ডিসেম্বর পর্যন্ত চলবে। কিন্তু একটি কর্মসূচির ওপর নির্ভর করে সারা বছরের মশা নিয়ন্ত্রণ চালানো যায় না। স্থানীয় সরকার বিভাগ নিচের স্তরে নির্দেশনা পৌঁছে দিয়ে কমিটিগুলো সক্রিয় করতে পারে কি না এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করতে পারে কি না, তার ওপরই নির্ভর করবে ডেঙ্গুর এই প্রকোপ কতটা ঠেকানো যাবে।

