ধূমপান ছাড়ার চেষ্টা করা অনেকেই সিগারেটের বদলে ভেইপ বা ই-সিগারেট ধরছেন, এই ভেবে যে এটি তুলনামূলক নিরাপদ। বিভিন্ন গবেষণার তথ্য বলছে, প্রচলিত সিগারেট সাধারণত ভেইপের চেয়ে বেশি ক্ষতিকর। তবে এর মানে এই নয় যে ভেইপ নিরাপদ। ভেইপেও নিকোটিনসহ নানা ক্ষতিকর রাসায়নিকের সংস্পর্শ ঘটে, আর এর দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে গবেষণা এখনো চলছে।
সিগারেটকে কেন বেশি ক্ষতিকর ধরা হয়, তার মূল কারণ দহন প্রক্রিয়া। সিগারেটে তামাক পুড়িয়ে ধোঁয়া তৈরি হয়, আর এই পোড়ানোর সময়ই হাজার হাজার রাসায়নিক পদার্থ জন্ম নেয়। এর অনেকগুলো বিষাক্ত, কিছু আবার ক্যানসারসৃষ্টিকারী। ‘নেচার মেডিসিন’-এ প্রকাশিত একটি পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, দহনযোগ্য তামাকজাত পণ্য, যেমন প্রচলিত সিগারেট, তামাকজাত পণ্যের মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিকর। সিগারেটের ধোঁয়ায় প্রায় ৭ হাজার রাসায়নিক থাকে, যার মধ্যে প্রায় ৭০টি ক্যানসার সৃষ্টি করতে পারে।
ভেইপের ক্ষেত্রে তামাক পোড়ানো হয় না। এখানে তরল বা ই-লিকুইড গরম করে অ্যারোসল তৈরি করা হয়। ফলে সিগারেটের ধোঁয়ার তুলনায় অনেক ক্ষতিকর রাসায়নিকের মাত্রা সাধারণত কম থাকে।
তবে ভেইপের অ্যারোসল ক্ষতিমুক্ত নয়। যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) জানাচ্ছে, এতে নিকোটিন, ক্যানসারসৃষ্টিকারী রাসায়নিক এবং নিকেল, টিন ও সিসার মতো ভারী ধাতু থাকতে পারে। এ ছাড়া থাকতে পারে অতি ক্ষুদ্র কণা, যা ফুসফুসের গভীরে প্রবেশ করতে সক্ষম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, ভেইপের অ্যারোসলেও নিকোটিনসহ বিষাক্ত পদার্থ আছে। কিছু রাসায়নিক ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে এবং হৃদ্যন্ত্র ও ফুসফুসের সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
সিগারেট ও ভেইপের পার্থক্য নিয়ে একটি বড় গবেষণা প্রকাশিত হয়েছিল ২০১৮ সালে ‘জামা নেটওয়ার্ক ওপেন’-এ। সেখানে ৫ হাজারের বেশি মানুষের শরীরে তামাকজাত বিষাক্ত পদার্থের বায়োমার্কার পরীক্ষা করা হয়। ফলাফলে দেখা যায়, যাঁরা শুধু ভেইপ ব্যবহার করেন, তাঁদের শরীরে নিকোটিন ও বেশ কিছু বিষাক্ত পদার্থের মাত্রা সিগারেট ব্যবহারকারীদের চেয়ে কম। তবে ভেইপ ব্যবহারকারীদের শরীরেও এসব পদার্থের উপস্থিতি মিলেছে।
গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ফল হলো, যাঁরা একই সঙ্গে সিগারেট ও ভেইপ ব্যবহার করেন, অর্থাৎ ‘ডুয়াল ইউজার’, তাঁদের ক্ষেত্রে বিষাক্ত পদার্থের সংস্পর্শ আরও বেশি হতে পারে। অর্থাৎ সিগারেট কমিয়ে পাশাপাশি ভেইপ শুরু করলেই ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে, এমন ধারণা গবেষণায় সমর্থিত নয়।
ফুসফুসের ওপর প্রভাবের বিষয়ে ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি সিস্টেমেটিক রিভিউ ও মেটা-অ্যানালাইসিসে ১১৯টি গবেষণা পর্যালোচনা করা হয়। তাতে দেখা যায়, ধূমপান না করা কিন্তু ভেইপ ব্যবহার করেন, এমন মানুষের শ্বাসতন্ত্রের উপসর্গের ঝুঁকি ভেইপ না করা ব্যক্তিদের চেয়ে বেশি। একই গবেষণায় অবশ্য দেখা গেছে, শুধু ভেইপ ব্যবহারকারীদের কিছু শ্বাসতন্ত্রের ঝুঁকি ধূমপায়ীদের তুলনায় কম। সহজ কথায়, সিগারেটের তুলনায় ঝুঁকি কম হতে পারে, কিন্তু ভেইপ ফুসফুসের জন্য ঝুঁকিমুক্ত নয়।
হৃদ্যন্ত্রের ঝুঁকির প্রশ্নেও একই চিত্র। ২০২৫ সালের একটি বৃহৎ পর্যালোচনায় ই-সিগারেট ব্যবহারের সঙ্গে হৃদ্স্পন্দন বৃদ্ধি, রক্তচাপের পরিবর্তন, রক্তনালির কার্যকারিতায় সমস্যা এবং অন্যান্য কার্ডিওভাসকুলার ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। আরেকটি ২০২৫ সালের পর্যালোচনায় ১১টি গবেষণা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ভেইপ, সিগারেট এবং দুটি একসঙ্গে ব্যবহারের সঙ্গে হৃদ্রোগসংক্রান্ত ঝুঁকির সম্পর্ক আছে। সেখানে ভেইপ ব্যবহারকারীদের তুলনায় সিগারেট ব্যবহারকারীদের সম্মিলিত হৃদ্রোগের ঝুঁকির পরিমাপ বেশি পাওয়া গেছে। তবে গবেষণাগুলো পর্যবেক্ষণভিত্তিক হওয়ায় সরাসরি কারণ ও ফলের সম্পর্ক নিশ্চিত করা যায় না।
ধূমপান ছাড়াতে ভেইপ সহায়ক কি না, সে প্রশ্নের উত্তর কিছুটা জটিল। ২০২৬ সালে হালনাগাদ করা কক্রেনের একটি লিভিং সিস্টেমেটিক রিভিউয়ে দেখা গেছে, নিকোটিনযুক্ত ই-সিগারেট অন্তত ছয় মাস ধূমপান বন্ধ রাখতে সহায়তা করতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে এটি নিকোটিন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপির চেয়ে বেশি কার্যকর হতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা বুঝতে আরও বড় ও দীর্ঘ সময়ের গবেষণা দরকার বলে পর্যালোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে। এর অর্থ, নিয়মিত সিগারেট-ধূমপায়ী যদি পুরোপুরি সিগারেট ছেড়ে ভেইপে চলে যান, তাহলে সিগারেট চালিয়ে যাওয়ার তুলনায় ক্ষতিকর পদার্থের সংস্পর্শ কমতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে দুটি চালিয়ে গেলে সেই সুবিধা অনেকটাই নষ্ট হয়।
তাহলে ভেইপ কি নিরাপদ? উত্তর, না। সিডিসির ভাষ্য, কোনো তামাকজাত পণ্যই নিরাপদ নয়। ভেইপের অ্যারোসলে সিগারেটের ধোঁয়ার চেয়ে কম ক্ষতিকর রাসায়নিক থাকলেও তা নিরাপদ হওয়ার সমার্থক নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও বলছে, ভেইপ ও প্রচলিত তামাকজাত পণ্য, দুটিই স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। সবচেয়ে নিরাপদ পথ হলো কোনোটিই ব্যবহার না করা।
বাংলাদেশেও ভেইপ নিয়ে নীতিগত অবস্থান কঠোর হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশ কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সংশোধিত তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশে ই-সিগারেট ও অন্যান্য উদীয়মান নিকোটিন পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একই সংস্কারে তামাকজাত পণ্যের বিজ্ঞাপন, প্রচার ও স্পনসরশিপের ওপরও নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে গবেষণার বর্তমান চিত্র স্পষ্ট। সিগারেটের দহনজনিত ধোঁয়া ভেইপের অ্যারোসলের চেয়ে বেশি ক্ষতিকর, এর প্রমাণের ভিত্তি শক্তিশালী। কিন্তু ভেইপকে নিরাপদ বিকল্প বলা যায় না। সিগারেটের পাশাপাশি ভেইপ ব্যবহার স্বাস্থ্যঝুঁকি দূর করে না, বরং ‘ডুয়াল ইউজ’-এর ক্ষেত্রে বিষাক্ত পদার্থের সংস্পর্শ বেশি পাওয়ার প্রমাণ আছে। তাই স্বাস্থ্যঝুঁকির দিক থেকে সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত হলো সিগারেট ও ভেইপ, দুটিই ছেড়ে দেওয়া। যাঁরা সিগারেট ছাড়তে পারছেন না, তাঁদের জন্য প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসা ও নিকোটিন-নির্ভরতা কমানোর পদ্ধতি নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।

