বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন, চিকিৎসকের সংকট এবং অকার্যকর রোগ নির্ণয় সুবিধার কারণে রোগীরা কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছেন না। ৫০ শয্যার এই হাসপাতালে ২০২১ সাল থেকে অস্ত্রোপচার বন্ধ। নতুন একটি এক্স-রে মেশিন প্রায় এক বছর ধরে মোড়কেই পড়ে আছে। ফলে ছোটখাটো সমস্যাতেও রোগীদের ছুটতে হচ্ছে জেলা সদর বা খুলনায়।
হাসপাতালের জরুরি বিভাগ, প্যাথলজি ল্যাবরেটরি, এক্স-রে ও ইসিজি সেবা, যক্ষ্মা চিকিৎসাকেন্দ্র এবং প্রশাসনিক কার্যালয় চলছে পুরোনো ভবনে। গত বছর স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে। ভবনের দেয়াল ও ছাদে গভীর ফাটল দেখা দিয়েছে। খসে পড়ছে পলেস্তারা, বেরিয়ে এসেছে রড। দূরে থাকার সতর্কবার্তা টাঙানো থাকলেও রোগী ও কর্মীরা বাধ্য হয়েই সেখানে যাতায়াত করছেন।

জনবলের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও এর অধীন বিভিন্ন কেন্দ্র মিলিয়ে চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ ৪০টি। এর বিপরীতে কর্মরত দেখানো হয়েছে ১৪ জনকে। তবে নিয়মিত সেবা দেন মাত্র আটজন বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে। অনুপস্থিতদের মধ্যে একজন জেলা সদর হাসপাতালে সংযুক্ত, আর একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক কর্মরত খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। আরও দুই বিশেষজ্ঞ নিয়মিত হাজির হন না। বাকি দুই চিকিৎসক যথাক্রমে চার ও ১৪ বছর ধরে বিদেশে আছেন।
রোগ নির্ণয়ের সক্ষমতাও সীমিত। প্যাথলজি বিভাগের তিনটি অনুমোদিত পদের সবগুলোই শূন্য। একই অবস্থা ল্যাবরেটরি সহকারী ও দুটি অ্যাটেনডেন্টের পদেও। পরিচ্ছন্নতাকর্মীর পাঁচটি পদের মধ্যে পূরণ হয়েছে একটি।
অথচ চাপ কম নয়। গত মাসে বহির্বিভাগে অন্তত ৫ হাজার ৫০০ রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। চিকিৎসকের কক্ষের সামনে দীর্ঘ সারি থাকে। কিন্তু চিকিৎসক কম থাকায় অনেককে বাধ্য হয়ে অন্যত্র যেতে হচ্ছে।
কচুয়ার টেংরাখালী এলাকার বাসিন্দা ফয়জুল ইসলাম বলেন, এখানে বেশির ভাগ রোগের চিকিৎসা মেলে না। তাই সামান্য সমস্যাতেও বাগেরহাট বা খুলনায় যেতে হয়। আরেক বাসিন্দা দুলাল শেখ জানান, নারকেলগাছ থেকে পড়ে তাঁর ভাই রুস্তমের হাড় ভাঙার সন্দেহ দেখা দেয়। প্রাথমিক চিকিৎসার পর স্থানীয় এক্স-রে ইউনিট অচল থাকায় তাঁকে বাগেরহাট জেলা সদর হাসপাতালে নিতে হয়।
এক্স-রে মেশিনের বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত আবাসিক মেডিক্যাল কর্মকর্তা মনি শংকর পাইক জানান, বর্তমান পল্লী বিদ্যুতের সংযোগ দিয়ে নতুন মেশিন চালানো সম্ভব নয়। এর জন্য আলাদা সাবস্টেশন দরকার। ফলে প্রায় এক বছর ধরে মেশিনটি খোলাই হয়নি।
হাসপাতালটি ১৯৭৬ সালে ৩১ শয্যা নিয়ে যাত্রা শুরু করে। ২০০৫ সালে শয্যা বাড়িয়ে ৫০ করা হয়। পুরোনো ভবনের একটি অংশ ২০০৮ সালেই পরিত্যক্ত ঘোষণা করেছিল স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হাসান মাহমুদ জানান, নতুন ভবন নির্মাণ করে ৫০ শয্যার হাসপাতালকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করার পরিকল্পনা চলছে। তবে দোতলা ভবনের ওপর নির্মিত অতিরিক্ত টিনের ছাউনির একটি তলা এখনো হস্তান্তর হয়নি। সমস্যাগুলো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে বলেও তিনি জানান। এক্স-রে মেশিনের জন্য আলাদা কক্ষ ও বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা করার চেষ্টা চলছে।
এই চিত্র দেখায়, সমস্যা একটি নয়, কয়েকটি একসঙ্গে জড়িয়ে আছে। ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় সেবা চালানো কঠিন। চিকিৎসক ও কর্মী না থাকায় যন্ত্র থাকলেও সেবা মিলছে না। আবার বিদ্যুৎ অবকাঠামো না থাকায় নতুন যন্ত্রও কাজে লাগানো যাচ্ছে না। ফলে একটি সমস্যার সমাধান হলেও অন্যগুলো থেকে যাচ্ছে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ ঝুঁকিপূর্ণ ভবনটি ঘিরে। জরুরি বিভাগ ও রোগ নির্ণয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবা এখানে চলায় রোগী ও কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। পরিত্যক্ত ঘোষণার পরও দীর্ঘদিন ভবন ব্যবহার করার কারণ কী, বিকল্প ব্যবস্থা কেন হয়নি, প্রকাশিত তথ্যে তার ব্যাখ্যা নেই।
নতুন ভবন কবে নির্মাণ হবে, কত ব্যয়ে হবে এবং কবে নাগাদ অস্ত্রোপচার চালু করা যাবে, সে বিষয়েও কোনো সময়সীমা জানানো হয়নি। শূন্য পদে নিয়োগ এবং অনুপস্থিত চিকিৎসকদের বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সেটিও পরিষ্কার নয়। এসব প্রশ্নের উত্তর মিললেই বোঝা যাবে, এলাকার মানুষ কবে নাগাদ নিজ উপজেলায় পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা পাবেন।

