আজ ১৫ অক্টোবর বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘আমাদের হাত, আমাদের ভবিষ্যৎ’। দিবসটির উদ্দেশ্য, সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার মাধ্যমে রোগের বিস্তার ঠেকাতে মানুষকে সচেতন করা। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে, এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনো অনেক পিছিয়ে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, হাত ধোয়ার চর্চায় দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয় সর্বনিম্ন।
করোনা মহামারির সময় বাধ্য হয়ে মানুষ হাত ধোয়ার ব্যবস্থা করেছিল। তখন চর্চা বাড়লেও সেটি ধরে রাখা যায়নি। সুরক্ষার ব্যবস্থা হওয়ার পর আগের উদাসীনতাই আবার সর্বত্র দেখা যাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২২ সালের তথ্য বলছে, দেশের ৩৮ শতাংশ পরিবারে এখনো হাত ধোয়ার ব্যবস্থাই নেই। এ ক্ষেত্রে ভারত, নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা বেশ এগিয়ে আছে।
জাতীয় পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের প্রায় অর্ধেক পরিবার নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেনি। ২০১৮ সালের জাতীয় হাইজিন সার্ভে বলছে, ২৫ শতাংশ মানুষের হাত ধোয়ার অভ্যাসই নেই। ইউনিসেফের সর্বশেষ এমআইসিএস ২০২৫ ও একাধিক জাতীয় গবেষণার তথ্য আরও উদ্বেগজনক। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর মা বা যত্নকারীদের মধ্যে মাত্র এক-চতুর্থাংশ গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সঠিকভাবে সাবান দিয়ে হাত ধোন। শিশুকে খাওয়ানোর আগে এবং শিশুকে পরিষ্কার করার পর এই হার আরও কম।
গ্রামাঞ্চলে বেশির ভাগ মানুষ দুই হাত সাবান দিয়ে ধোন না। কেবল পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলাই সেখানে বেশি প্রচলিত। গবেষকদের ভাষ্য, হাত ধোয়ার অভ্যাস আছে, চ্যালেঞ্জ হলো তাতে সাবান যুক্ত করা। চমকপ্রদ তথ্য হলো, দেশের সবচেয়ে ধনী পরিবারগুলোর মধ্যেও ২৫ দশমিক ৮ শতাংশের হাত ধোয়ার স্থানে সাবান পাওয়া যায়নি। যেসব পরিবার টয়লেট ভাগাভাগি করে ব্যবহার করে, সেখানে ঝুঁকি আরও বেশি।
ভৌগোলিক বৈষম্যও স্পষ্ট। উত্তরাঞ্চলে হাত ধোয়ার হার তুলনামূলক বেশি, আর মধ্যাঞ্চলে তা প্রায় ৫০ শতাংশের আশপাশে। দরিদ্র পরিবার, পরিবারপ্রধানের কম শিক্ষা এবং উন্নত পানির উৎস না থাকা, এই তিনটি বিষয় হাত না ধোয়ার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের চিত্র স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের যৌথ পর্যবেক্ষণ কর্মসূচির (জেএমপি) সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৬৩ শতাংশ হাসপাতালে হাত ধোয়া বা জীবাণুমুক্ত করার কোনো ব্যবস্থা নেই। স্থানীয় সরকার বিভাগ সর্বজনীন হাত ধোয়ার চর্চা নিশ্চিত করতে একটি কৌশলপত্র তৈরি করেছে। এতে বলা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে এ লক্ষ্য অর্জনে অবকাঠামোসহ নানা সুবিধা দরকার। কিন্তু সেগুলো এখনো নিশ্চিত করা যায়নি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, পানি-স্যানিটেশন এবং রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি একে অপরের পরিপূরক। তাই অফিস-আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বিশেষ করে হাসপাতালে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা থাকা জরুরি। তাঁর মতে, হাসপাতালে এ সুবিধা না থাকায় সংক্রমণ ও মৃত্যু বাড়ছে, ভর্তি রোগীরাও দেরিতে সুস্থ হচ্ছেন। তাই চিকিৎসক, নার্স, রোগী ও রোগীর স্বজন, সবার জন্য যথেষ্ট ব্যবস্থা থাকা দরকার। সেটি ওয়ার্ডের ভেতরে, করিডোরে ও হাসপাতালের বাইরেও থাকা উচিত।
প্রিভেন্টিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, হাতে লেগে থাকা ময়লা খাবারের সঙ্গে মুখ দিয়ে এবং চোখ, ত্বক ও নাক দিয়েও শরীরে ঢুকতে পারে। যে দেশে অনেকে শৌচকাজে হাত ব্যবহার করেন, সেখানে মলের জীবাণু হাতে ও চোখে চলে আসার ঝুঁকি থাকে। ধুলাদূষণ বেশি হলে যেকোনো জায়গা থেকেই হাতে ময়লা লাগতে পারে। তিনি জানান, গবেষণায় দেখা গেছে, হাত ধোয়ার মাধ্যমে নিউমোনিয়া রোগীর সংখ্যা ৬০ শতাংশ কমানো সম্ভব হয়েছিল।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, সমস্যাটি কেবল সচেতনতার নয়, অবকাঠামোরও। ধনী পরিবারেও সাবান না থাকার তথ্য বলছে, অভ্যাস ও অগ্রাধিকারের বিষয়টিও বড়। আবার দরিদ্র পরিবার ও উন্নত পানির উৎসহীন এলাকায় সুবিধার অভাবই মূল বাধা। তাই শুধু দিবস পালন বা প্রচারে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। হাসপাতাল ও স্কুলে হাত ধোয়ার স্থান নিশ্চিত করা, গ্রামাঞ্চলে সাবান ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তোলা এবং শিশুর যত্নকারীদের লক্ষ্য করে আলাদা কর্মসূচি নেওয়া জরুরি।
তবে প্রকাশিত তথ্যে কিছু বিষয় স্পষ্ট নয়। বিভিন্ন সূত্রের তথ্য ভিন্ন ভিন্ন বছরের, ফলে বর্তমান প্রকৃত চিত্র আরও আলাদা হতে পারে। কৌশলপত্র বাস্তবায়নে কত বরাদ্দ লাগবে বা কোন সময়ে কোন কাজ হবে, তারও বিস্তারিত উল্লেখ নেই। আগামী মহামারি থেকে বাঁচতে বিশেষজ্ঞরা হাত ধোয়ার প্রবণতা বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছেন।

